টাঙ্গাইলে ঐতিহ্যবাহী ‘জামাইমেলার’ শেষ দিন
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:৪৩
টাঙ্গাইলে ঐতিহ্যবাহী ‘জামাইমেলার’ শেষ দিন
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

টাঙ্গাইলে তিন দিনব্যাপী জামাই মেলার শেষ দিন শনিবার। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে বাঙালির প্রাণ। তারই ধারাবাহিকতায় শত বছর ধরে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার রসুলপুর গ্রামে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ‘জামাইমেলা’। এ মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। এ মেলায় দূর দূরান্ত থেকে জামাইয়েরা আসেন। মেলাকে সামনে রেখে ছোট ছেলেমেয়েদের জন্য আয়োজন করা হয় নানা বিনোদন ব্যবস্থার। মেলায় থাকে ছোট-বড় প্রচুর স্টল, বিভিন্ন ধরনের খেলনা, কসমেটিকস, খাবারের দোকান। ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় ব্যবসা করতে দেশের বিভিন্নস্থান থেকে এসেছেন ব্যবসায়ীরা।


প্রতিবছর ১১, ১২ ও ১৩ বৈশাখ (সনাতন পঞ্জিকা অনুসারে) টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার রসুলপুর বাছিরন নেছা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজন করা হয় এই মেলার। তিনদিনে রসলপুরসহ আশেপাশের অন্তত ৩০টি গ্রামের লাখো মানুষের সমাগম ঘটে এই মেলায়। প্রশ্ন জাগতে পারে জামাইমেলা নাম হলো কেন? এর উত্তরে রসুলপুরের অনেকেই বলেন, এই মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার সব মেয়ের বর শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে আসেন, তারাই মেলার মূল আকর্ষণ এ কারণেই মেলাটি জামাইমেলা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।


সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন দোকানীরা তাদের জিনিসপত্র নিয়ে বসে আসে, অপরদিকে ক্রেতারা তা কিনছেন। এছাড়া মেলায় মিষ্টি জাতীয় দোকানের সংখ্যা বেশি লক্ষ করা গেছে। মেলায় বিভিন্ন রকমের জিনিসপত্র উঠেছে। মেলায় টাঙ্গাইল জেলায় বিভিন্ন জেলার লোকজনকে দেখা যায়। বড়দের পাশাপাশি ছোট ছেলে মেয়রা এই মেলা উপভোগ করছেন।


রসুলপুরের বাসিন্দা কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক রাশেদ রহমান বলেন, এই মেলার উৎপত্তি কবে সেটা কেউ জানে না। যুগ যুগ ধরে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই এলাকার মানুষের কাছে ঈদ আর পূজাপার্বণের থেকেও এই মেলা বেশি উৎসবের। মেলাটি বৈশাখী মেলা হিসেবে ব্রিটিশ আমলে শুরু হলেও এখন এটি জামাইমেলা হিসেবে পরিচিত। মেলাকে সামনে রেখে রসুলপুর ও এর আশেপাশের বিবাহিত মেয়েরা তাদের বরকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। আর মেয়ের জামাইকে মেলা উপলক্ষে বরণ করে নেয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়িরা বেশ আগে থেকেই নেন নানা প্রস্তুতি নেন। মেলার দিন জামাইয়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দেন শাশুড়িরা। আর সেই টাকার সাথে আরও টাকা যোগ করে জামাইরা মেলা থেকে চিড়া, মুড়ি, আঁকড়ি, মিষ্টি, জিলাপিসহ বিভিন্ন জিনিস কিনেন।’


মো. আজিজ নামে একজন বলেন, জন্মের পর থেকেই আমি এ মেলা দেখে আসছি। এটি জামাই মেলা হিসেবে অনেক পরিচিত। শ্বশুররা এ মেলা উপলক্ষে জামাইদের টাকা দেয়, আর জামাইয়ার এর সাথে কিছু টাকা যোগ করে মেলা থেকে বিভিন্ন কিছু কিনে। আমরা একটি মেয়ে রয়েছে, তাকে বিয়ে দিয়েছি। মেয়ের জামাইকে আমি দাওয়াত দেয়া হয়েছে। তিনি এখানে এসেছেন।


রসুলপুর গ্রামের হামিদ মিয়া নামে এক জামাই বলেন, আমি প্রতিবছরই এই মেলায় এসেছি। মেলায় এসে আমার খুব ভালো লাগছে। শ্বশুর বাড়ির লোকজন আমাদের দাওয়াত দেন। তখন আমরা আসি।


কথা হয় সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মানিক মিয়া নামের এক আঁকড়ি ব্যবসায়ীর সাথে। তিনি বলেন, আমি এই মেলায় প্রায় ১৫ বছর ধরে আসছি। এখানে বিক্রি করে আমি লাভবান হই। এই মেলাটি জামাই মেলা হিসেবে পরিচিত। এবার প্রায় ৫০ মন আঁকড়ি নিয়ে এসেছি। আমা আশা করছি লাভবান হবো। গতবছর মেলায় ১ লাখ টাকা মতো বিক্রি হয়েছিল। আর এতে প্রায় ২৫ হাজার টাকাও মতো লাভ হয়েছিল।


অজিত দাশ নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, আমি বিভিন্ন স্থানে মেলায় যাই। তবে বিগত ১২ বছর ধরে রসুলপুরের জামাইমেলায় আসছি। আসার সংসারের যাবতীয় খরচ এর উপর নির্ভর করে। মেলার কমিটির লোকজন আমাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।


রসুলপুরের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নবপ্রজন্ম সাহিত্য গোষ্ঠীর সভাপতি মারুফ রহমান ও সাধারণ সম্পাদক মোবাইদুল ইসলাম বলেন, আমাদের এই মেলা ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই মেলাকে কেন্দ্র করে দারুণ একটা প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করি। এ কাজ করে আমরা প্রচুর আনন্দ পাই।


এ ব্যাপারে মেলার আহ্বায়ক ফজলুল হক বলেন, আমাদের এ মেলায় প্রায় ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ শতাধিক দোকান বসেছে। এই মেলা টাঙ্গাইল জেলার মধ্য ঐতিহ্যবাহী মেলা। এই মেলায় শুরু হওয়ার আগেই গ্রামের জামাই এবং বউয়েরা আসেন। তারা বিভিন্নভাবে মেলা উপভোগ করে থাকেন। এটি জামাই মেলা হিসেবে পরিচিত।


বিবার্তা/তোফাজ্জল/আকবর

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com