হুমকির মুখে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী আগর শিল্প
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৮, ০৩:০৭
হুমকির মুখে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী আগর শিল্প
তানভীর আঞ্জুম আরিফ
প্রিন্ট অ-অ+

পাহাড়-টিলা অধ্যুষিত সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বেশি চা-বাগান অবস্থিত মৌলভীবাজার জেলায়।এখানকার চা শিল্পের পাশাপাশি আরেকটি বিশেষ শিল্পের খ্যাতি দেশজুড়ে। জেলার বড়লেখা উপজেলারসুজানগরকে বলা হয় আগরের রাজধানী।


এ খ্যাতি সেই মোঘল আমল থেকে। এখান থেকে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার আগর-আতর রপ্তানি করাহয় মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এখানে আগর শিল্পের অপার সম্ভাবনা থাকলেও রয়েছে অনেক সমস্যা।


ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, এ অঞ্চলে আগর শিল্প সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে গ্যাস সংযোগ নিয়ে।শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহ না থাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হচ্ছে অনেককে।ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ।


এমতাবস্থায় অনেকে ব্যবসা থেকে ঝরে পড়েছেন। পর্যাপ্ত মূলধনের অভাব ও সরকারি পৃষ্টপোষকতা নাথাকায় যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আতর উৎপাদনে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।


এছাড়া আগর রপ্তানির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো সাইটিস (কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডইন এনডেঞ্জারড অব ওয়াইল্ড ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা) ও এনওসি (নো অবজেকশন সার্টিফিকেট ) সনদপাওয়া। নানা শর্তের মধ্যে অনেক আতর ব্যবসায়ী আটকা পড়ছেন। ফলে অনেকে বাধ্য হচ্ছেন চোরাইপথে আতর রপ্তানি করতে।



ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫'শ শতাব্দীর শেষের দিকে মোঘল আমল থেকেই উপজেলার সুজানগরইউনিয়নের সালদিঘা, রফিনগর, হাসিমপুর, চিন্তাপুর, বড়থল গ্রামসহ আশপাশের গ্রামে এবং পাথারিয়াবনাঞ্চলের গভীর অরণ্যে প্রচুর আগর গাছ ছিল। যেখান থেকে আগর গাছ সংগ্রহ করে আতর তৈরি করাহতো। তবে ১৯৪৭ সালের দিকে আগর চাষের বিলুপ্তি ঘটে এ অঞ্চলে। পরবর্তীতে অতীত ঐতিহ্যেরধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে পুনরায় আগরের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। বর্তমানে এলাকাভিত্তিক ব্যক্তি উদ্যোগে বড়লেখার সুজানগরে এ দেশীয় শিল্প পারিবারিক সূত্রে টিকিয়েরেখেছেন স্থানীয়রা। তবে বিংশ শতকে এসে চাহিদা বাড়ায় শিল্পটির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছেনঅনেকে।


আগর শিল্প এখন সুজানগরের আশপাশেও ছড়িয়ে পড়েছে। আগরের সুঘ্রাণ জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাবড়লেখা থেকে খোদ জেলা শহরেও লেগেছিলো। গড়ে উঠেছিলো কারখানা। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবেতা আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে বড়লেখার সুজানগরেই কোনোমতে এ শিল্প ধরে রেখেছেন অভিজ্ঞব্যবসায়ীরা। সবশেষ ‘এক জেলা এক পণ্য’ কর্মসূচির আওতায় ২০১০ সালে মৌলভীবাজার জেলারইউনিক পণ্য হিসেবে আগর-আতরকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরপর চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল আগরআতরের শিল্প পার্ক নির্মাণের ঘোষণা দেয় শিল্পমন্ত্রণালয়।


ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বড়লেখার সুজানগর ও তার আশপাশে প্রায় তিন শতাধিকআগর-আতরের কারখানা রয়েছে।যার মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ধীন নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা ১১৯টি। এরবেশিরভাগই ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানা। প্রতি কারখানায় মাসে গড়ে দেড়শো থেকে দুশো তোলা(এক তোলায় ১১.৬৬ গ্রাম) আতর উৎপন্ন হয়। ভালো মানের প্রতি তোলা আতর বিক্রি হয় ১০ থেকে ১২হাজার টাকা দরে। তবে সময় বিশেষ দাম আরও বাড়ে। বিশেষ করে রমজান ও ঈদের সময়। এসময় এখানকার তৈরি আতরের চাহিদা বাড়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।


এছাড়া অন্য সময়ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আতর রপ্তানি হয়। তবে বেশি রপ্তানি হয় দুবাই,কাতার, সৌদি আরব, ভারত, সিঙ্গাপুর, ইতালি ও ফ্রান্সে। শুধু আগরের তরল কষ নয়, কাঠও দেশেরচাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হয়। মধ্যপ্রাচ্যে এসব কাঠ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জ্বালিয়ে সুগন্ধি তৈরি করে।


তবে স্থানীয়রা জানান, সম্প্রতি আগরের কষ থেকে ক্যানসারের ওষুধ তৈরির খবর পাওয়া গেছে। সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে দেশের রপ্তানি খাতে বড় অবদান রাখতে পারছে না আগর-আতরশিল্প। স্থানীয়ভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের নানারকম হয়রানি এই শিল্পের বিকাশেবাধার সৃষ্টি করছে। গাছ থেকে উৎপাদিত মূল্যবান এ সুগন্ধি রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাআয় করা সম্ভব।


কিন্তু রপ্তানির ক্ষেত্রে আইনি বিভিন্ন জটিলতার কারণে আগর-আতর উৎপাদনকারীরা ফ্রান্স, ভারত,মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে অবৈধপথে বছরের পর বছর ধরে আগর-আতর রপ্তানি করছে। বাজারজাতকরণে সরকারের সহযোগিতা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য নিয়ে দর কষাকষি করাসম্ভব হচ্ছে না।


অপরদিকে, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিক কৌশল সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, ই-মার্কেটিং, ই-বিজনেস সম্পর্কেধারণা না থাকার ফলে বিকল্প পথকেই সুবিধাজনক মনে করেন আগর ব্যবসায়ীরা। এতে সরকারওপ্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।


বিশ্ববাজারে আগর-আতরের ব্যাপক চাহিদা থাকায় মৌলভীবাজারের প্রায় সবকটি উপজেলায় ছোট বড়বাগানের পাশাপাশি বসতবাড়ির আঙ্গিনায় আগর চাষ করা হচ্ছে। এক সময় আগর গাছে প্রাকৃতিকভাবেসৃষ্ট ক্ষতের রেজিনযুক্ত কাঠ থেকে প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে আগর তেল বা সুগন্ধি তৈরি করা হত।তবে বর্তমানে কৃত্রিমভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে ১২-১৫ বছর বয়সের আগর গাছ থেকে মূল্যবান আগর সংগ্রহকরা সম্ভব হচ্ছে।


সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আগর থেকে আতর তৈরির প্রক্রিয়া আমাদের পরিবেশে সাধারনতগাছগাছালি রোপণের পর স্বাভাবিকভাবে তা বড় হলেও আগরের ক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্ন নিয়ম। এই গাছরোপণের পাঁচ বছরের মাথায় পুরো গাছে এক ইঞ্চি পরপর পেরেক মারা হয়। তখন গাছ থেকে একধরনেররস বের হয়। পেরেকের চারপাশে সেই রস জমে কালো রং ধারণ করে। সেই কালো রং-ই হলো আতরেরবড় উপাদান। তবে একসময় তা প্রচলিত ছিল না। প্রাকৃতিকভাবেই গাছে আগর তৈরি হতো। তবেঅনেকেই এখন দ্রুত সময়ে আতর পেতে এমন পদ্ধতির ব্যবহার করে থাকেন। এভাবেই তিন থেকে পাঁচবছর রাখার পর গাছ কাটা হয়। ছোট ফালি করে কাটার পর আগের সব পেরেক খোলা হয়। তখন গাছেরকালো ও সাদা অংশ আলাদা করা হয়। সেই কাঠ কারখানার পানিতে ভেজানো হয় এক থেকে দেড় মাসপর্যন্ত। তারপর সেগুলো স্টিলের ডেকচির মধ্যে দিয়ে অনবরত জ্বাল দেওয়া হয়। তখন পাতন পদ্ধতিতেফোঁটায় ফোঁটায় আতর নির্দিষ্ট পাত্রে জমা হয়। সেগুলো আবার প্রক্রিয়াজাত করে ভাগ করা হয় বিভিন্নকোয়ালিটিতে। তারপর বোতলবন্দি হয়ে সেই আতর চলে যায় দেশের বাইরে।


সনাতন পদ্ধতিতেই কয়েকদফা প্রক্রিয়াজাতকরণের পর সংগ্রহ করা হচ্ছে মূল্যবান আগরের সুগন্ধি নির্যাসবা কাঁচা আতর। সংগৃহীত এ নির্যাস অবৈধপথে চলে যায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ভারত থেকে আগরেরসেই নির্যাস যায় মধ্যপ্রাচ্যে। আবার যেখানে আগরের নির্যাসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দেশের বৈদেশিকমুদ্রা অর্জনের স্বার্থে স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ, উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিক কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ, আগররপ্তানিতে সাইটিস ও এনওসি সনদ বিড়ম্বনার নিরসন, গ্যাস সরবরাহ ও বন বিভাগের হয়রানি বন্ধ করারআহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।তবে উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বন বিভাগ আগর-আতর রপ্তানিতে অনাকাক্ষিতভাবে সাইটিস সনদ প্রদানেজটিলতা সৃষ্টি করায় শিল্পটি আজ হুমকির মুখে পড়েছে।


স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোগল আমলে দেশ-বিদেশের সম্রাটদের দূতেরআগমন ঘটত মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সুজানগরে। কয়েকশ’ বছর ধরেই সেখানকারলোকজন আগর-আতর ব্যবসায় জড়িত আছেন। তারা একে ‘তরল সোনা’ বলেন। গত কয়েক বছরেবিশ্ববাজারে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এই শিল্পটির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছেন অনেকে।


আতর শিল্পের সাথে জড়িতদের হিসাব মতে, বড়লেখার সুজানগর ইউনিয়নের বাড়িতে বাড়িতে প্রায় তিনশতাধিক আগর কারখানা রয়েছে। তবে অধিকাংশই ছোট ও মাঝারি আকারের। শুধু বড়লেখায় বছরেআগরের নির্যাস (তেল) উৎপাদিত হয় প্রায় ২ হাজার লিটার। এক লিটার কাঁচা আতরের স্থানীয় বাজারমূল্য সাড়ে ৫ লাখ টাকার বেশি। এই ২ হাজার লিটার নির্যাস বিদেশে বিক্রি করে প্রায় ১১০ কোটি টাকাআয় করা হচ্ছে।



এ ছাড়া প্রচুর পরিমাণ আগর কাঠও রপ্তানি হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আগর কাঠ ধূপেরমতো জ্বালিয়ে সুগন্ধি তৈরি করে। এই শিল্পের সঙ্গে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক জড়িতরয়েছে বলে জানা গেছে। শতভাগ দেশীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পরও বর্তমানে আগর গাছেরঅভাবে আগর কারখানাগুলো বছরে ৬ থেকে ৭ মাসের বেশি উৎপাদন কার্যক্রম চালাতে পারছে না।


জুড়ি উপজেলার আগর চাষিরা জানান, সরকারি ব্যবস্থাপনায় আগর প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও অভাব রয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার। যদি আগর চাষিদের সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দেয়া হয় তাহেলে ব্যক্তি উদ্যোগেও বাড়বে আগরের চাষ। আগরের চাষাবাদ বৃদ্ধি ও আগর-আতর বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে সরকার। শুধু তাই নয় এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার মানুষও হতে পারে স্বাবলম্বী। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তারা।


পূর্ব-দক্ষিণ ভাগের এক চাষী জাহাঙ্গীর আলমের সাথে তিনি জানান, আগর গাছ চুরি কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। প্রতিনিয়ত গাছ চুরি হচ্ছে। ক্ষুদ প্রশাসন এ ব্যাপারে উদাসীন। পুরোদমে আগর সৃষ্টির আগে চুরি করে গাছ কাটায় আগর শিল্পের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। তার মতে, চুরি করা গাছ কেনা বন্ধ করা গেলে আর গাছ চুরি হবে না।


জাহাঙ্গীর আলম আরো জানান, আগর গাছ একটি ঔষধি গাছ। আগর চাষের জন্য বড়লেখার আবহাওয়াখুবই উপযোগী। ছোট ছোট গাছে প্রাকৃতিকভাবে আগর বাঁধতে শুরু করে। বিগত কয়েক বছর ধরে আগরগাছে পোকার আক্রমণে আগর তৈরি সহজ হচ্ছে।


আরেক আগর চাষী কয়েস মিয়া জানান, আগর গাছে এক ধরনের পোকা ঢুকে গর্তের সৃষ্টি করে। গর্তের এই ক্ষত থেকেই মূলত আগর তৈরি করা হয়ে থাকে। অনেকটা প্রাকৃতিক নিয়মে আগর সংগ্রহের উপযোগী হয়ে যায় বলে লোহা বা পেরেক মারতে হয় না। এ রকম গাছকে স্থানীয়রা সাদা গাছ বলে। তবে স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগ ও বিজিবি কোনোভাবেই এসব সাদা গাছে যে আগর হয় তা বুঝতে চায় না। যার কারণে বাড়ির আঙ্গিনার এসব গাছ কাটতে বাধাসহ নানারকম হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ ছাড়া কৃত্রিম পদ্ধতিতে গাছ লাগানোর পর ৬-৭ বছর বয়স হলেই পুরো গাছে লোহার পেরেক মারা হয়। পেরেকের পাশ দিয়ে এক ধরনের কস বের হয়। এই কস বের হওয়ার পর পেরেকের চারপাশে কস জমে কালো রং ধারণ করে। এভাবে ৪-৫ বছর রাখার পর গাছ কাটা হয়। পেরেক মারা গাছ কেটে ছোট ফালি করে পেরেক খোলার পর তার চারপাশের কালো অংশ কাঠ থেকে আলাদা করা হয়।


এই কালো কাঠগুলো এক থেকে দেড় মাস পানিতে ভেজানোর পর তা তুলে স্টিলের পাত্রে অনবরত জ্বাল দেয়া হয়। তখনই পাতন পদ্ধতিতে ফোঁটায় ফোঁটায় আতর নির্দিষ্ট পাত্রে জমা হয়। তবে সাদা অংশ দিয়েও একটু নিম্নমানের আতর হয়। আতর তৈরির প্রক্রিয়া শেষে কাঠের টুকরোগুলো প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে রপ্তানি করা হয়।


কয়েস মিয়া আরো জানান, আগর বের করার পর কাটের ডাস্টগুলো ফেলে দেয়া হয়। সেটা আমাদেরদেশে কোনো কাজে লাগে না। বর্তমানে এ ডাস্টগুলোকে প্রক্রিয়া করে প্রতি কেজি ৫৫/৬০ টাকা দরেমধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। আরবরা ডাস্টগুলোকে প্রক্রিয়া করে বহুর ও মসুচ তৈরি করেসুগন্ধির জন্য মজলিসে পোড়ায়। আগর রপ্তানির পাশাপাশি এই ডাস্টের চাহিদা ব্যাপক। তাই বছরে প্রায়১ হাজার টন ডাস্ট রপ্তানি করে কয়েক কোটি টাকা আয় হচ্ছে। তবে গাছ কাটা থেকে শুরু করে গ্যাসসংযোগ ও রপ্তানির জন্য মান নির্ণয়ে দেশে কোনো ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টিরপাশাপশি সঠিক দাম পান না ব্যবসায়ীরা। মান নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হলে রপ্তানিবাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা।


বড়লেখার গাংকুল গ্রামের আগর ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম জানান, বিশ্ববাজারে আগর-আতরের বাজার আরো বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। তবে আমলাতান্ত্রিক নানা জটিলতার কারণে এই শিল্পটি বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। নিজের বাড়ির একটি পরিপূর্ণ আগর গাছ কাটতে ভূমি অফিস থেকে হোম পারমিট, বন বিভাগ থেকে ট্রানজিট পাস সংগ্রহ করতে হয়রানির শিকার হতে হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের টাকা না দিলে কাজ হয় না। দ্রুত এসব সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তিনি।


সুজানগরের প্রবীণ আগর ব্যবসায়ী হাজী আছার উদ্দিন জানান, বড়লেখার সুজানগরের ঐতিহ্যবাহী আগর-আতর শিল্পের অস্তিত্ব বিলীন ও ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ ব্যবসাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই চক্র প্রশাসনকে অপব্যাখ্যা দিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের হয়রানি করাচ্ছে।


আগর ব্যবসায়ী সহিদ আহমদ এই প্রতিবেদককে জানান, আগর-আতর ব্যবসা এখন আর সাধারণ ব্যবসানয়, এটি আজ শিল্পের মর্যাদা পেয়েছে। এ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ এ ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল।সরকার আগর-আতরকে ক্ষুদ্র শিল্প ঘোষণা করে নানা সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু সমিতি নামধারীকতিপয় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এসব সুবিধা নিজেরা ভোগ করে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকেন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তারা চায় না কোনো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী উন্নতি করুক।


তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন বাহিনীকে ভুল বুঝিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ীকে যেভাবে হয়রানিও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন করছে , এতে ঐতিহ্যবাহী এ ব্যবসা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। তিনিআগর-আতর ব্যবসাকে ত্বরান্বিত ও সমৃদ্ধ করতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন। আগর ব্যবসার ক্ষেত্রে সাইটিস ও এনওসি সনদ বিড়ম্বনা ও গ্যাসের অভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে ‘তরল সোনা’খ্যাত সম্ভাবনাময় আগর-আতর শিল্প।


সূত্রে জানা যায় , ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী বড়লেখা ডিগ্রি কলেজ মাঠের জনসভায়আগর-আতরকে ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেন। আগর শিল্পের স্বার্থে গ্যাস সংযোগ দিতে হবে। প্রায়তিন শতাধিক কারখানার মধ্যে অর্ধেকের বেশি কারখানায় গ্যাস সংযোগ নেই। আর যেসব কারখানায়গ্যাস সংযোগ রয়েছে, সেগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় আগুনের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ঠিকমতো আতর উঠছে না। এতে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন আগর ব্যবসায়ীরা।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, রপ্তানির নতুন বাজার সৃষ্টি ও পণ্যেরবহুমুখীকরণ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো আমাদের যারাপ্রতিদ্বন্দ্বী আছে তাদের উৎপাদন ক্ষমতাটা আমাদের চেয়ে বেশি। তারা যেসব টেকনিক ব্যবহার করেসেগুলো করতে হবে।


সাইটিস ও এনওসি সনদের বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, সাইটিস ওএনওসি সনদ কেন্দ্রীয়ভাবেই দেয়া হয়ে থাকে। এটা একটি আন্তর্জাতিক সনদ। এই সনদ দেখেইআমদানিকারকরা আমাদের পণ্য ক্রয় করে। তাই এটা সিলেট, মৌলভীবাজার বা বড়লেখা বন বিভাগেরমাধ্যমে আপাতত দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।


এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেমৌলভীবাজার আগর আতরের ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল পার্কের ঘোষণা দিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। তবে আমাদের কাছেএখনো কোন নির্দেশনা আসেনি। এই ঘোষণার বাস্তবায়ন করা হলে আগর শিল্পের একটি বিপ্লব আসবে।আমরা একাধিকবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছি।তারপরও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তবে সরকারের ঘোষণা বাস্তবায়ন হলে তা আর থাকবে না।


রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিচালক আবদুর রউফ জানান, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৭ হাজার মার্কিনডলারের আগর কাঠ রপ্তানি হয়। একই সময়ে আতর রপ্তানি হয় মাত্র ৩৪৮ ডলারের। সর্বশেষ ২০১৪-১৫অর্থবছরে ১ লাখ ৬২ হাজার ডলারের আগর কাঠ রপ্তানি হয়। আগর রপ্তানি হয়েছে যৎসামান্য। যদিওপ্রবাসীদের মাধ্যমে প্রতিদিন মধ্যপ্রাচ্যে আতর যাচ্ছে বলে জানালেন সুজানগরের ব্যবসায়ীরা।


বিবার্তা/তানভীর/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com