‘খাওন পাই না আবার কোরমা-পোলাও’
প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ১২:৫২
‘খাওন পাই না আবার কোরমা-পোলাও’
ফরহাদ হোসেন, লক্ষ্মীপুর
প্রিন্ট অ-অ+

নদীতে মাছ ধরে যে টাকা পাই, তা দিয়া সংসারের খাওন (খাবার) জুটে না আবার নতুন জামা-কাপড়, কোরমা, পোলাও। এগুলা দিয়া কি অইবো, আমাগো ঈদ কাটে নদীতে মাছ ধরার মধ্য দিয়ে। আমাগো আনন্দ সংসারের খাওন জুটানো আর মহাজনের দেনা পরিশোধে।


বিবার্তার লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধিকে এমন করেই বললেন জেলার মজুচৌধুরীর হাট এলাকার মানতা (ভাসমান জেলে) পারভিন আক্তার। তিনি জন্মের পর থেকেই বাপের ও বিয়ের পর স্বামীর নৌকায় থাকছেন। বর্তমানে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জননী তিনি।


তিনি আরো বলেন, নদীতে এহন আর আগের মতো মাছ ধরা পড়ে না। তাই সংসারে অনেক অভাব। ঈদের দিনও মাংস দিয়ে দুই বেলা পেট ভইরা ভাত খাইতে হারি না, পোলাপানেরে নতুন জামা কাপড় লই দিতাম হারি না।


জানা যায়, পারভিনের মতোই চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতি পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার মেঘনা নদী এলাকায় রয়েছেন অন্তত ৩ হাজার মানতা। নদী থেকে নদীতে বয়ে চলে তাদের নৌকা। মানতাদের প্রধান পেশা হচ্ছে মাছ ধরা। তারা ঝড়-জলোচ্ছ্বাস আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে বছরের পর বছর লড়াই করে পানিতে ভাসমান জীবনযাপন করছে।



চারিদিকে ঈদ আনন্দ থাকলেও তা নেই মানতাদের। নদীতে মাছ ধরে যে টাকা পান সে টাকা মহাজনদের দেনা আর ডাল ভাত জোগাতেই শেষ হয়ে যায়। তাই পারছেন না ছেলেমেয়েদের ঈদে নতুন জামা কাপড় দিতে। পারছেন না সেমাই, ফিরনি, লুডুলস, বিরিয়ানীসহ নানা খাবার খেতে। তাদের ঈদ কাটে নদীতে মাছ ধরার মাধ্যমে।


সরেজমিনে সদর উপজেলার মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ছেলেমেয়ে আর পরিবার পরিজন নিয়ে নৌকায় বসে আছে মানতারা। কেউ জাল বুনছে, কেউ জাল থেকে মাছ নিচ্ছে, আবার কেউ রান্না করছে। তাদের চোখ মুখে চিন্তার ছাপ। মানতাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নদীর পাড়ে খেলা করছে, আবার কেউ মা-বাবাকে সাহায্য করছেন।


দুলাল হোসেন বলেন, আমাগো বাড়িঘর, জায়গা-জমি নাই, নৌকায় থাকি। ঈদে পোলাপানেরে জামা কাপড় কিনে দিতে পারি না। সরকার ও ধনাঢ্যদের সহযোগিতা পাই না। নদীতে মাছ পেলে খাবার জোটে, অন্যথায় না খেয়ে কাটে। আমাগো আবার কিসের ঈদ আনন্দ?


শমজান বিবি বলেন, সবাই নতুন জামা কাপড় পিনবে, পোলাপানরে লইয়া আনন্দ কইরবো। আর আমরা পুরান জামা হরি নদীতে মাছ ধরেই আনন্দ করমু। ডাল আর ভাত খেয়েই কাটবে ঈদের দিন।



টাকা নাই বলে, নতুন জামা-কাপড় কিনে দিতে পারেন না মা-বাবা। তাই পুরাতন জামা পরিধান করেই কাটে তাদের ঈদ। আর পারেন না ধনীদের মতো নামী-দামী খাবার খেতে। ঈদের আনন্দ বলতে এখানে আসা লোকদের নদীতে নৌকায় করে ঘুরানো, কিছু টাকা আয় করা। এমনটি জানায় শিশু সাকিব হোসেন।


হাসিনা আক্তার জানান, নদীতে মাছ ধরে যে টাকা আয় করি, বিভিন্ন খরচের পর অবশিষ্ট টাকা দিয়ে মাংস কেন হাঁড়ও পাওয়া যাবে না। তাই আফসোস করি না, ঈদের দিনকেও অন্য দিনের মতোই মনে করি। কারণ আল্লাহ আমাগো কপালে ঈদ আনন্দ দেয় নাই।


নদীর পাড়ে খেলা করছে ছোট শিশু আছমা, ইতি, বেলি ও শাহানাজ আক্তার। আলাপকালে তারা জানায়, ঈদ বলে নেই কোনো বিশেষ দিন তাদের। দেয়া হয় না তাদের নতুন জামা কাপড়। এমনকি ঈদের দিন তাদের নৌকার ছোট্ট ঘরটিতে হয় না পোলাও-মাংস রান্না।


এ ব্যাপারে লক্ষ্মীপুর চর রমনী মোহন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ ছৈয়াল বলেন, মজুচৌধুরীরহাট এলাকায় মেঘনা নদী তীরে প্রায় তিন শতাধিক ভাসমান জেলে পরিবার রয়েছে। কয়েকদিন পূর্বে সরকারি বরাদ্দের কিছু চাল কয়েকজন জেলেকে দেয়া হয়েছে। বরাদ্দ কম থাকায় তাদের সবাইকে সহযোগিতা করা যাচ্ছে না। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানরা এগিয়ে এলে ভাসমান এসব পরিবারের ঈদ কিছুটা আনন্দের সাথে কাটতো।


এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম মহিব উল্লাহ বলেন, অভিযানের সময় জেলেদের জন্য চাল দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব ভাসমান জেলেদের জন্য ঈদের সময় কোনো বরাদ্ধ আসে না।


বিবার্তা/ফরহাদ/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com