কুষ্টিয়া ৭১’র এই দিনে হানাদার থেকে মুক্তি পায়
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:৫৮
কুষ্টিয়া ৭১’র এই দিনে হানাদার থেকে মুক্তি পায়
শরীফুল ইসলাম, কুষ্টিয়া
প্রিন্ট অ-অ+

মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা বিজয়ের ৪৬ বছর পূর্তি হবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর। এ গৌরব অহংকারের অংশীদার কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাগণ। সেই সাথে যাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করে বিজয় পতাকা উড়াতে সহায়তা করেছেন তাঁরাও এ গৌরবের অংশীদার। ৮ডিসেম্বর দৌলতপুর হানাদারমুক্ত দিবস।


জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে এবং তাঁর নেতৃত্বে প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন করতে ও বিজয় পতাকা উড়াতে যে সকল বীর যোদ্ধা শহীদ হয়েছেন তাঁদের মধ্যে দৌলতপুরেও রয়েছেন ৩৫ জন বীর যোদ্ধা ও তাঁদের সহযোগী।


দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়। আর এ সংগ্রামে অংশ নিয়ে দৌলতপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ ১৬টি সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। এরমেধ্যে ১১ নভেম্বর ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে এ সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ধর্মদহ ব্যাংগাড়ীর মাঠে। এলাকাবাসীর কাছে এটা ব্যাংগাড়ীর মাঠের যুদ্ধক্ষেত্র নামে পরিচিত। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে ৩ শতাধিক পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নিহত হয়।


দৌলতপুর উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ ব্যাংগাড়ীর মাঠ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার শিকারপুর মুক্তিযুদ্ধ সাব-সেক্টর সদরের দূরত্ব ছিল মাত্র দেড় মাইল। এ সাব-সেক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নভেম্বর মাসের দিকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনী ওই এলাকায় এক প্রতিরক্ষা বেষ্টনী গড়ে তুলে। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই এ খবর পৌঁছে যায় পার্শ্ববর্তী পাক হানাদার ক্যাম্পে। আর এ খবর পাওয়ার পর ১১ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর উপর দু’দিক থেকে অতর্কিতে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করে পাক হানাদার বাহিনী। তবে রাত-দিন ধরে চলা এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারাই জয়ী হন। যুদ্ধে পাক বাহিনীর ৩ শতাধিক সদস্য নিহত হয়। তবে পাক বাহিনী ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা সোহরাব উদ্দিন, শহিদুল ইসলাম ও মসলেম উদ্দিন এবং মিত্র বাহিনীর ৩ সদস্যকে জীবিত ধরে নিয়ে যায়। মিত্র বাহিনীর ৩ সদস্যকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফেরত দিলেও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি।


অপরদিকে ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর দৌলতপুরের আরো একটি বড় গেরিলা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দৌলতপুর উপজেলার শেরপুর গ্রামের মঙ্গলপুর মাঠের এ যুদ্ধে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেদের সাঁড়াশি আক্রমনে প্রাণ হারায় অন্তত ৬০ জন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য। আর এ যুদ্ধে শহীদ হন মাত্র একজন মুক্তিযোদ্ধা। ২৫ মার্চের পর পাক বাহিনীর নির্বিচার আক্রমণ শুরু হলে দৌলতপুর উপজেলার শেরপুর গ্রামের বিপুল সংখ্যক মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।


এ কারণে ওই গ্রামের বাসিন্দাদের ওপর হানাদার বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতন নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ২৫ নভেম্বর রাতে একদল মুক্তিযোদ্ধা শেরপুর গ্রামে অবস্থান নেন। বিষয়টি আঁচ করতে পেরে মধ্য রাতে শেরপুরে আগুন ধরিয়ে বেপরোয়াভাবে গুলি বর্ষণ করে পাকবাহিনী। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সাগরখালী নদীর তীরে তাদের অবস্থান তড়িৎ সুদৃঢ় করেন। ২৬ নভেম্বর ভোর ৫টায় উভয় পক্ষ পরস্পর মুখোমুখি হয়ে প্রায় ৬ ঘণ্টাব্যাপী তুমুল যুদ্ধের পর পাকবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। এ যুদ্ধে ৬০ জনেরও বেশি পাক সৈন্য নিহত হয়। এই যুদ্ধে হাবিবুর রহমান নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আলমগীর মিয়া ওরফে হিরা, আজিজুল হক ও আব্দুর রহমানসহ ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন।
পরদিন ২৭ নভেম্বর রাজাকাররা মফিজ উদ্দিন, আমির আলীসহ ৩জন মুক্তিযোদ্ধাকে জীবিত ধরে হত্যা করে আড়িয়া ইউনিয়নের চকঘোগা গ্রামে গণকবর দেয়।


এছাড়াও ১৯৭১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাতে একদল মুক্তিযোদ্ধা উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের গোয়ালগ্রাম ফরাজী বাড়িতে অবস্থান নেয়। ফরাজী বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নিয়েছেন স্থানীয় রাজাকারদের এমন সংবাদের ভিত্তিতে রাত আনুমানিক ২টার দিকে পাকহানাদার বাহিনী ওই বাড়ি ঘিরে ফেলে অতর্কিত গুলি চালায়। গুলির শব্দে ঘুমন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ পালিয়ে আত্মরক্ষা করেন। আবার কেউ পাল্টা গুলি বর্ষণ করে শহীদ হন। পাকহানাদার বাহিনীর নির্মম গুলি বর্ষণে ফরাজী বাড়িতে অবস্থান নেয়া মুক্তিযোদ্ধাসহ ওই পরিবারে ১৭ জন শহীদ হন। পরে তাদের ওই বাড়ির পেছনে গণকবরে সমাহিত করা হয়।


পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোষররা গুলি করে গণহত্যা চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, সেদিন আগুন জ্বালিয়ে দেয় ওই গ্রামে। সেদিনের পাকহানাদার বাহিনীর বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৮ বছর বয়সী জইতুন নেছার বাম বাহুতে গুলি লাগে। সেদিন শিশু জইতুন নেছা প্রানে বাঁচলেও পরিবারের সবাইকে হারিয়ে আজও তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন দুঃসহ যন্ত্রনা।


তবে দৌলতপুর উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় জেলা প্রশাসন গণকবরস্থলে শহীদদের স্মরনে স্মৃতি ফলক নির্মাণ করেছেন। সেখানে প্রতিবছর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়ে থাকে।


অবশেষে দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর ৮ ডিসেম্বর দৌলতপুর হানাদার মুক্ত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে দৌলতপুরকে শত্রুমুক্ত করে থানা চত্বরে বিজয় পতাকা উড়ানোর মধ্য দিয়ে মুক্তিকামী বীর সূর্য সন্তানেরা দৌলতপুরকে হানাদার মুক্ত করেন। দৌলতপুরকে হানাদার মুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকসেনাদের সম্মুখ যুদ্ধসহ ছোট-বড় ১৬ টি যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এসকল যুদ্ধে ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েক’শ নারী-পুরুষ শহীদ হন। ৮ ডিসেম্বর সকালে আল্লারদর্গায় পাক সেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ সংঘঠিত হয়।


এ যুদ্ধে শহীদ হোন বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাক সেনারা। এরপর দৌলতপুরকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর নুরুন্নবী। দিবসটি পালনের লক্ষ্যে দৌলতপুর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও উপজেলা প্রশাসন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পন, শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।


বিবার্তা/শরিফুল/আমিরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com