নদীতে পাট পচানোয় পানি দূষণ, প্রশাসন নীরব!
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ১৭:০১
নদীতে পাট পচানোয় পানি দূষণ, প্রশাসন নীরব!
শরিফুল ইসলাম, নড়াইল
প্রিন্ট অ-অ+

নড়াইল জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত চিত্রা, নবগঙ্গা ও কাজলা নদীর দুই তীর দিয়ে কয়েক বছর ধরে মৌসুমে ব্যাপকভাবে পাট পচানি দেয়া হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন পানি পচে দুর্গন্ধ হচ্ছে সেই সাথে মাছ মরে যাচ্ছে। অন্যদিকে নদীর তীরবর্তী হাজার হাজার মানুষ এ পানি ব্যাবহার করে বিভিন্ন প্রকার পানিবাহীত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।


কৃষকরা পাটের রং ভালো করার জন্য এবং বেশি মূল্যে পাট বিক্রীর জন্য মৎস সম্পদ, পরিবেশের কথা না ভেবেই প্রতিবছর নদীতে পাট পচানি দিলেও প্রশাসনের নেই কোনো মাথা ব্যাথা!


নড়াইল সদর ও লোহাগড়া উপজেলার মিটাপুর, নলদী, সদরের হবখালী, শংকরপুর, রতডাঙ্গা, তুলারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর দু’তীরে পাট পচানি দেয়ার দৃশ্য। পুকুর, ডোবা, উন্মুক্ত জলাশয় ভরাট ও দখলের কারনে ৮ থেকে ১০ বছর ধরে নদীতে পাট পচানি দেয়া হচ্ছে। নদীতে পাট পচানির ফলে পাটের মান ভালো এবং মূল্য বেশি পাওয়ায় প্রতি বছর নদীতে পাট পচানোর প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।


খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, গত ৫ থেকে ৬ বছর যাবত জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত নবগংগা, চিত্রা ও কাজলা নদীর আনুমাণিক ৩০ কি. মি. নদীর তীর জুড়ে পাট জাগ দেয়া হচ্ছে। এর ফলে নদীগুলো প্রায় মৎস শূন্য হয়ে পড়েছে। শত শত মৎস পরিবার এ পেশা থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।


এ ছাড়া নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ যারা বছরের পর বছর ধরে নদীতে গোসল, কাপড়-চোপড় ধৌতসহ পারিবারিক বিভিন্ন কার্যাদি সম্পন্ন করত, পানি দূষিত হবার কারণে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ এ সব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।



সদরের চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের শংকরপুর গ্রামের মৎসজীবী বাবুল বিশ্বাস বলেন, নদীতে পাট জাগ দেয়ার ফলে পানি পচে নদীর রুই, কাতলা, পুটি, শিং, কৈ, মাগুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ মরে যাচ্ছে। গত দুমাস ধরে নিজের মাছ ধরার নৌকা ডাঙ্গায় ওঠানো রয়েছে। নৌকাও নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আরো দেড় মাস যাবৎ এ পাট পচানো চলবে বলে তিনি জানান।


একই গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, নদীতে পাট জাগ দেয়ায় পাটের রং ভালো হয় এবং দাম বেশি পাওয়া যায়। তবে এতে মাছের ক্ষতি হচ্ছে এবং এ পানি ব্যবহারের ফলে খোস পাচড়া, চুলকানি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন।


ময়েনখোলা গ্রামের সাইদ সিকদার, ইলিয়াস বিশ্বাস ও আবু তালেব মোল্যা বলেন, আমরা কৃষক আমাদের বাড়ি নদীর তিরবর্তী হওয়ায় নদীতে পাট পচানো ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই তাই বাধ্য হয়ে নদীতে পাট পচায়। আপনাদের কাছে জানলাম রিবোন রেটিং এর মাধ্যমে পাটের আঁশ ছাড়ানো যায়। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো পদ্ধতির সংবাদ আমরা পাইনি বলেও জানান এসব কৃষক।


নড়াইল নদী বাঁচাও আন্দোলনের নেতা কাজী হাফিজুর রহমান বলেন, কয়েক বছর ধরে নদীতে পাট পচানি দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কি না তা আমাদের নজরে আসেনি। পাট পচানির ফলে নদীর পানি পচে মৎস সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। নদীর তীরবর্তী মানুষ এই পানি ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগের মুখোমুখি হচ্ছে এবং সামগ্রিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।


নড়াইল সদর উপজেলা সাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার আসাদুজ্জামান মুন্সি বলেন, নদীতে পাট পচানোর কারণে পানি পচে নষ্ট হয়ে যায়। পানি দূষণের কারণে পানি বাহিত রোগসহ বিভিন্ন প্রকার রোগ হয়ে থাকে। এ সময়টা নদীর পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।


এ ব্যাপারে জেলা মৎস কর্মকর্তা হরিপদ মণ্ডল বলেন, পাট জাগ দেয়ার ফলে বড় মাছ নীচে চলে যাচ্ছে এবং ছোট মাছ মারা যাচ্ছে। ফলে নদীগুলো মৎসশূন্য হয়ে পড়েছে। নদীতে পাট পচানি বন্ধ করতে নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষদের উদ্বুদ্ধকরনের প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শেখ আমিনুল হক বলেন, তিনটি উপজেলায় এ বছর পাটের আবাদের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৩ হাজার ৬ শত ১৫ হেক্টর জমিতে। পাটের আবাদ হয়েছে ২৩ হাজার ৭ শত ২৫ হেক্টর জমিতে। লক্ষমাত্রার চেয়ে একশত ১০ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় পাটের আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ১শত ৭৫ হেক্টর জমিতে, লোহাগড়া উপজেলায় ১২ হাজার ৩ শত ৫০ হেক্টর এবং কালিয়া উপজেলায় ৩ হাজার ২ শত হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করা হয়েছে।


নদীতে পাট না পচানোর জন্য রিবোন রেটিং পদ্ধতিতে পাটের আঁশ ছাড়ানোর জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। জেলায় সাড়ে ৭’শ কৃষকের মাঝে রিবোন রেটিং বিতরণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।


জেলা প্রশাসক মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, নদীতে পাট না পচানোর জন্য জেলার সমন্বয় কমিটির সভায় সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।


বিবার্তা/শরিফুল/যুথি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com