অনেক জয়ের পরেও ভয়
প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৭, ১৯:৩২
অনেক জয়ের পরেও ভয়
রিমন রহমান, রাজশাহী ব্যুরো
প্রিন্ট অ-অ+

মেয়েটির বয়স এখন ১৮ বছর। ১৪ বছর বয়সে যখন সে দশম শ্রেণির ছাত্রী, তখন ধর্ষণের শিকার হয় সে। এর ফলে সে গর্ভধারণ করে। তার ছেলের বয়স এখন সাড়ে তিন বছর।


মেয়েটি তার ছেলেকে নিয়ে মহিলা সহায়তা কর্মসূচির আবাসন কেন্দ্রে থেকেছে তিন বছর। সেখান থেকেই পরীক্ষা দিয়েছে এসএসসি এবং এইচএসসি। পাস করেছে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে এখন পড়াশোনা করতে চায় নার্সিংয়ে। কিন্তু এতে ‘বাধা’ হয়ে উঠেছে তার সন্তান। কারণ, নার্সিং কলেজের নিয়ম অনুযায়ী, সন্তান তো দূরের কথা; কোনো বিবাহিত মেয়েই নার্সিং কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করতে পারে না। কেউ বিয়ে-সন্তানের কথা গোপন করে ভর্তি হলেও শারীরিক পরীক্ষার সময় সে ধরা পড়ে যায়। পরে তার ভর্তি বাতিল করা হয়।


অবিবাহিত এই মায়ের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বটতলী গ্রামে। প্রেমের ফাঁদে ফেলে ২০১৩ সালের ৬ জুন এক যুবক তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছিল। এতে মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়লে তার প্রেমিক তাকে অস্বীকার করে। এরপর সে তার প্রেমিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা করে। এ মামলায় গত ৩০ মে আদালত আসামি আরিফ হোসেনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন।


ভুক্তভোগী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসএসসিতে ৪টি বিষয়ের পরীক্ষার পর ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে তার সন্তানের জন্ম হয়। সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই সে দুটি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এরই মধ্যে তাকে বিয়ে করার জন্য মেয়েটির প্রেমিক আরিফকে গ্রামের লোকজন চাপ দিতে থাকে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে সালিশও বসে।


কিন্তু সেখানে আরিফ সবকিছুই অস্বীকার করে। মেয়েটি তখন রামেক হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) চিকিৎসাধীন। সালিশে প্রেমিক অস্বীকার করায় উল্টো দোষ পড়ে মেয়েটির ওপরেই। বাধ্য হয়ে মেয়েটি তখন ওসিসি থেকেই ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ আসামি আরিফকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আরিফ, ওই মেয়েটি এবং তার সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।


পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় আরিফই ওই শিশুর বাবা। পরে আদালতে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। এর আগে মামলা দায়েরের পরই আদালত ওই মেয়েটিকে মহিলা সহায়তা কর্মসূচির রাজশাহী বিভাগীয় আবাসন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এসএসসির বাকি লিখিত এবং ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলোতে ওই মেয়েটি আবাসন কেন্দ্র থেকেই অংশ নেয়। কৃতিত্বের সাথে পাসও করে।


মেয়েটির বাড়ি গেলে সে জানায়, প্রায় তিন বছর ছেলেকে নিয়ে আবাসন কেন্দ্রে থাকতে হয়েছে তাকে। সেখান থেকেই সে একটি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হয়। কিন্তু সে সরকারি হেফাজতে থাকায় কলেজে যেতে পারতো না। এ জন্য আবাসন কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা তাকে বই কিনে দেন। সেখানে বসেই পড়াশোনা চালিয়ে যায় সে।


তবে এতো প্রতিকূল পরিস্থিতির মাঝে এসএসসির মতো এইচএসসিতে তার বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করা হয়নি। ভর্তি হতে হয়েছিল মানবিক বিভাগে। এসএসসিতে সে পেয়েছিল জিপিএ-৪.১৯। কিন্তু ২০১৬ সালে এইচএসসিতে অংশ নিয়ে সে তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ে ফেল করে যায়। এরপরেও থেমে যায়নি মেয়েটি। পরের বছর সে আবার পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৩.১৭ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।


মেয়েটি বলে, সন্তান প্রসবের পর গ্রামের লোকজন তাদের পরিবারকে গ্রামছাড়া করতে চেয়েছিল। তার মা তখন গ্রামের লোকদের হাত-পা ধরে পড়ে যান। গ্রামের লোকজন শর্ত দেন- পরিবারটিকে গ্রামে থাকতে দেওয়া হবে, কিন্তু মেয়েটি তার সন্তান নিয়ে গ্রামে ফিরতে পারবে না। এ নিয়ে তারা একটি কাগজে তার বাবা-মায়ের স্বাক্ষরও নেয়। এ জন্য তিন বছরেরও বেশি সময় তাকে গ্রামের বাইরে থাকতে হয়েছিল।


মাস তিনেক আগে মেয়েটিকে আবাসন কেন্দ্র থেকে ছাড়া হয়। কিন্তু তখনও সন্তান নিয়ে গ্রামে ফেরার সাহস পায়নি সে । প্রায় একমাস তাকে থাকতে হয় আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বাড়িতে। পরে সে হাসপাতালের ওসিসি বিভাগকে বিষয়টি জানায়। সাহায্যে এগিয়ে আসেন আইনজীবী আশুরা খাতুন আশা এবং জাতীয় মহিলা আইনজীবী পরিষদের বিভাগীয় প্রধান দিল সেতারা চুনি। তারা মেয়েটিকে বাড়িতে রেখে আসেন।


অ্যাডভোকেট চুনি বলেন, ‘মেয়েটিকে নিয়ে যখন গ্রামে গেলাম, তখনও গ্রামের লোকজন তাকে মেনে নিতে চাইছিল না। আমরা তার আত্মীয়-স্বজনসহ গ্রামের লোকদের বুঝিয়েছিলাম। কথা বলেছিলাম মেয়েটির স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গেও। পরে তাকে বাড়িতে রেখে আসি।’


তবে মেয়েটি জানিয়েছে, এখনও গ্রামের কেউ কেউ তার সন্তানকে নিয়ে কটুক্তি করে। এসব শুনে তার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু গ্রামের লোকের কথায় সে থেমে যেতে চায় না। হতে চায় একজন নার্স। নার্সিং শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ছেলেকেও সে মানুষের মতো মানুষ করতে চায়। কিন্তু সন্তানের কারণে সে আদৌ নার্সিং কলেজে ভর্তি হতে পারবে কি না তা নিয়ে ভয়ে আছে সে।


মেয়েটি বলে, ‘মানসিক যন্ত্রণা ছিল অনেক। এতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও পড়াশোনা বন্ধ করিনি। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে নার্স হবার। কিন্তু এখন ভর্তির নিয়মকানুন জানতে গিয়ে শুনছি, সন্তানের মা নার্সিং কলেজে ভর্তি হতে পারবে না। এতোকিছু জয় করেও আমাকে কি এখানেই থেমে যেতে হবে?’ কোলের বাচ্চা দেখিয়ে মেয়েটি বলে, ‘এর জন্য হলেও আমাকে আমার লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’


রাজশাহী সরকারি নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ মনিজ্জা খাতুন জানান, নার্সিং কলেজে ভর্তির প্রথম শর্ত হলো- ছাত্রী বিবাহিত হতে পারবে না। বিষয়টি নিশ্চিত হতে সরকারি হাসপাতালে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ছাত্রীর বয়স, সে শারীরিক সম্পর্ক করেছে কি না, এমনকি তার সন্তান প্রসব হয়েছে কি না, সেসব বিষয় ধরা পড়ে। কারও এমন কিছু পাওয়া গেলে তার ভর্তি বাতিল করা হয়। এটা সরকারি-বেসরকারি সব নার্সিং কলেজেরই নিয়ম।


তবে মহিলা আইনজীবী পরিষদের বিভাগীয় প্রধান দিল সেতারা চুনি বলছেন, এই নিয়ম সবার জন্য হওয়া উচিৎ নয়। এটা অমানবিক। এই মেয়েটির মতো যারা ভিকটিম, তাদের বিশেষ বিবেচনায় নার্সিং কলেজে ভর্তির সুযোগ দেয়া দরকার। কারণ, এই পরিস্থিতির জন্য সে নিজে দায়ী না। তার সঙ্গে যা হয়েছে, তা অন্যায়। এটা আদালতেও প্রমাণ হয়েছে। তাই মেয়েটির পাশে সবার দাঁড়াতো উচিৎ।


মেয়েটি যখন মহিলা সহায়তা কর্মসূচির আবাসন কেন্দ্রে ছিল তখন সেখানকার সহকারি পরিচালক ছিলেন শবনম শিরীন।


তিনি বলেন, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের এই মেয়েটি মানসিকভাবে খুব শক্ত এবং সংগ্রামী। তার মাঝে প্রচণ্ড রকমের মাতৃত্ববোধও রয়েছে। সে নিজেই পড়াশোনা চালিয়েছে, মামলায় জিতেছে, সন্তানকেও লালন-পালন করেছে।


শবনম শিরীন জানান, একবার এক নিঃসন্তান দম্পতি মেয়েটির সন্তানকে নিয়ে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটি রাজি হয়নি। ওই সময় মেয়েটি বলেছিল- সে নার্সিংয়ে পড়াশোনা করবে। নার্স হয়ে সে তার বাচ্চাকে মানুষের মতো মানুষ করবে। কিন্তু তখন সে নার্সিংয়ে ভর্তির নিয়মকানুন জানতো না। শবনম শিরীন জানলেও তিনি সেদিন তাকে কিছু বলতে পারেননি।


বিবার্তা/রিমন/নাজিম

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com