থামছে না যশোর পুলিশের অপকর্ম
প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৭, ২৩:০১
থামছে না যশোর পুলিশের অপকর্ম
এইচ আর তুহিন, যশোর
প্রিন্ট অ-অ+

যশোরে পুলিশের অপকর্ম থামছে না। ফলে ভাবমুর্তি সঙ্কটে পড়েছে যশোরের পুলিশ বিভাগ। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও নিজেদের ভিতরের দ্বন্দ্বে প্রকাশ হয়ে পড়ছে আইনশৃঙ্খলা এ বাহিনীর মধ্যেকার বিশৃঙ্খলা। দায়ী কিছু পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েও এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না কর্মকর্তারা।


অসাধু পুলিশ সদস্যরা সাদা পোশাকে অপকর্ম করেই চলেছে। প্রায় বছর খানেক যশোর শহরে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের যে সন্তুষ্টি অর্জন করেছিল পুলিশ তা বিলীন হয়ে গেছে। ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা হারিয়ে গেলেও ভোগান্তি কমেনি সাধারণ মানুষের। কেন না পুলিশ নিজেই জড়িয়ে পড়েছে এসব অপকর্মে। পকেটে অথবা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে মাদক দ্রব্য ঢুকিয়ে দিয়ে হাজার হাজার, কখনও লক্ষাধিক টাকা আদায় করে নেয়া হচ্ছে।


তাদের চাঁদাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। আবার পুলিশ সদস্যদের এ অসৎ কর্মকাণ্ডে থানায় বা তাদের সংশ্লিষ্ট কোথাও গিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ নেই সাধারণ মানুষের। তাহলে প্রতিহিংসার শিকার হতে হয় পুলিশের। তাই একের পর এক ঘটছে জনরোষের ঘটনা। বিক্ষুব্ধ মানুষ এভাবে অসৎ পুলিশ সদস্যদের প্রতিরোধের চেষ্টা করছে।


এদিকে সাধারণ মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি হলেও অপরাধীদের সাথে যশোর পুলিশের সখ্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন মহল্লায়, বিপণিবিতান অথবা রেস্তোরাঁয় সাদা পোশাকে কোমরে অস্ত্র ঝুলিয়ে আড্ডা দিতে দেখা যায় পুলিশকে। শহরের মধ্যের অপরাধ প্রবণ এলাকার ফাঁড়িগুলোতে পুলিশের সাথে অপরাধীদের ওঠবসা বেশি।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার যশোর সদর উপজেলার সাতমাইল বাজারে এক মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে পকেটে ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টার সময় সিরাজুল ইসলাম নামে এক কনস্টেবল গণপিটুনির শিকার হন।


ফোন ব্যবসায়ী পিকুল অভিযোগ করেন, শনিবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে তিনি বাজারের সিকদার হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এসময় সাদা পোশাকের ওই কনস্টেবল কথা আছে বলে তাকে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে গিয়ে তার পকেটে একটি পলিথিনের প্যাকেটে মোড়ানো ৩/৪ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।


তখন তিনি চিৎকার শুরু করলে আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়ে যায়। তখন লোকজন কনস্টেবল সিরাজের হাতে ইয়াবা ট্যাবলেট দেখতে পান। পিকুলের অভিযোগ শুনে উত্তেজিত জনগণ সে সময় তাকে বেশ কয়েকটি কিলঘুষি মারেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।


অবস্থা বেগতিক দেখে কনস্টেবল সিরাজ মোবাইল ফোনে কোতোয়ালি থানার এসআই মোকলেসুজ্জামানকে সংবাদ দেন। পরে এএসআই আবুল কালাম আজাদ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ লাইনে নিয়ে আসেন।


এ বিষয়ে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শহিদ আবু সরোয়ার জানিয়েছেন, সিরাজ হচ্ছে পুলিশ লাইনের সদস্য। কোনো অনুমতি ছাড়া কেন সে সেখানে গেলো তার জবাব চাওয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।


এদিকে গত ১০ জুন যশোর শহরের রেল রোডস্থ সোনালী ব্যাংক কর্পোরেট শাখার সামনে মাইকপট্টি এলাকার শরিফুল ইসলামের ছেলে শৈশব এবং তার সহযোগী একই এলাকার সুব্রতকে গাঁজা দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন কোতোয়ালি থানার এসআই মাহবুবুর রহমান।


তারা রাত পৌন ১০টার দিকে ওই এলাকায় মোটরসাইকেল নিয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশ যুবকের পকেটে মাদক দিতে না পেরে শৈশবের মোবাইল ফোনসেটটি ভেঙে দেয়। তারা চিৎকার চেঁচামেচি করে লোকজন যোগাড় করে পুলিশের উপর চড়াও হয়। পরে অন্য পুলিশের সহযোগিতায় এসআই মাহবুব ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়েন। ওই রাতেই পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের নির্দেশে তাকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়।


গত বৃহস্পতিবার কোতোয়ালি থানার আরেক এসআই শামীম আকতারকে ক্লোজ করা হয় একই অভিযাগের ভিত্তিতে। তিনি একদিন আগে এক কলেজ শিক্ষকের পকেটে সোর্স মারফত ইয়াবা ট্যাবলেট দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করেন। এরপরই পুলিশ সুপারের নির্দেশে তাকে পুলিশ লাইনে ক্লোজ করা হয়।


এর আগে চৌগাছায় দুটি ঘটনা ঘটে। পুলিশ মাদক দিয়ে এক চা দোকানি এবং এক ব্যবসায়ীকে ফাঁসানোর চেষ্টা করে। দুটি ঘটনার সাথে জড়িত ৪ অফিসারকে ক্লোজ হতে হয়েছে।


গত ১৮ মে প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলনে শার্শার অগ্রভুলট গ্রামের নাসিমা খাতুন অভিযোগ করেন- তার স্বামী হাতেম আলীকে বাড়ি থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। পরে হাতেম ফিরে আসলে আবারও তাকে তুলে নেয়া হয়।


গত ২৮ এপ্রিল প্রেসক্লাব যশোর মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে কেশবপুর উপজেলার মজিদপুর ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) মনোয়ারা বেগম অভিযোগ করেন, গত ১৯ এপ্রিল কেশবপুর থানার ওসি শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে তার ছেলে আশরাফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনে পঙ্গু করা হয়েছে। পরে পুলিশ প্রচার করে বন্দুকযুদ্ধে আশরাফুল আহত হয়েছেন। তিনটি মিথ্যা মামলায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে।



৪ জানুয়ারি কোতোয়ালি থানার মধ্যে এক যুবককে ঝুলিয়ে পেটানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে দাবিকৃত টাকা না দেয়ায় কোতোয়ালি থানার দুই অফিসার শেখহাটি এলাকার আবু সাঈদ নামে ওই যুবককে নির্যাতন করেন। এ ঘটনায় নিন্দার ঝড় ওঠে।


২০১৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর কেশবপুরের জাহানপুর বাজারে মুদি ব্যবসায়ী আবদুল লতিফকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসাতে গিয়ে জনরোষে পড়ে কেশবপুর থানার উপ-পরির্দশক মিজানুর রহমান ও দুই কনস্টেবল। পরে তাদেরকে ক্লোজ করা হয়।


এছাড়া যশোরে বাড়ি তল্লাশি ও ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে ৫ লক্ষাধিক টাকা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বাড়ি তল্লাশির নামে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা লুট করার পর যুবক আহসান হাবিব সুজনকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে আরও ১লাখ ৯০ হাজার টাকা আদায় করা হয়।


গত ৬ জুন রাতে যশোর সদর উপজেলার লেবুতলা ইউনিয়নের আজমতপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘছে। এ ঘটনার বিচার চেয়ে তিনি গত ১১জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুলিশ মহাপরিদর্শক, ডিআইজি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।


এসব বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) শহিদ আবু সরোয়ার বলেছেন, আমার জানা মতে যশোরে কোনো থানায় সাদা পোশাকের পুলিশ নেই। আর পুলিশ দয়িত্ব পালন না করে যদি অনৈতিকতার আশ্রয় নেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। ইতোমধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।


বিবার্তা/তুহিন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com