তিনি এক জঙ্গির মা
প্রকাশ : ২৯ অক্টোবর ২০১৮, ১৭:৩৫
তিনি এক জঙ্গির মা
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

২০১৫ সালের কোনো এক শনিবার। ভোর পৌণে ৬টার দিকে সাবিনে লাপ্পে'র টেলিফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই শুনলেন ছেলের কণ্ঠস্বর, ‘‘মা, আমি এখন তুরস্কে। গাড়ি এলেই সিরিয়া রওনা হবো।''


২৭ বছর বয়সী ছেলে ক্রিস্টিয়ান মায়ের শেষ বারণটুকুও শুনলো না, জার্মানি থেকে স্ত্রী ইয়াসমিনাকে নিয়ে ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে পাড়ি জমালো সিরিয়া।


সেই থেকে বেশিরভাগ সময় ঘরেই থাকেন সাবিনে। খুব-একটা বের হন না। তিনি যে একজন জঙ্গির মা!


কেউ তাঁর ছেলের জন্য কাঁদে না, তবে তিনি কাঁদেন। বলেন, ‘‘আমি তাকে ভালোবাসি। তবে আমার ক্রিস্টিয়ান তো আর আগের মতো নেই।''


দ্রুত কথা বলেন এই দুঃখিনী মা। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে কিছুটা অস্বস্তিও বোধ করেন তিনি। তারপরও কয়েক ঘণ্টায় অনেক কথা হলো তাঁর সঙ্গে।


সাবিনে জানালেন, তাঁর ছেলে ক্রিস্টিয়ান ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিল। কিন্তু একা একা মানুষ করতে গিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাঁকে। ছেলে যখন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছিল, তখন পাশে দাঁড়িয়েছেন।


টিনএজ বয়সেই খুব অসুখে পড়ে ক্রিস্টিয়ান। ওজন কমতে থাকে। এক রাতে পেটের পীড়ায় এতটাই কাতর হয়ে পড়ে যে, মা সাবিনে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সে রাতেই অপারেশন করা হয়।


সাবিনে'র মনে পড়ে, ক্রিস্টিয়ানের যেদিন অ্যানেস্থেশিয়া'র ঘুম ভাঙ্গে, সেদিন সে মাকে বলে যে, তাকে দ্বিতীয় জীবন দেয়ায় ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে চায় সে।


তাঁরা ক্যাথলিক ধর্মের অনুসারী ছিলেন। সালাফিজম দূরে থাক, ইসলামের সঙ্গেই কোনো সম্পর্ক ছিল না তাদের।


সুস্থ হয়ে স্কুলে ফেরত যায় ক্রিস্টিয়ান। সেখান থেকে পাস করে মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়তে ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্কুলেই মরক্কো ও তুর্কি বংশোদ্ভুত কয়েকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় ক্রিস্টিয়ানের। ইসলামের প্রতি তাদের নিষ্ঠা মুগ্ধ করে ক্রিস্টিয়ানকে।


২০১২ সালে একদিন ঘরে ফিরে মা-কে কিছু কথা বলতে চায় ক্রিস্টিয়ান। সাবিনে'র ভাষায়, ‘‘ও হঠাৎ করে বাড়ি ফিরল এবং আমাকে বলল যে, সে ধর্মান্তরিত হতে চায়।''


সাবিনে'র জীবনসঙ্গী তখন মারা গেছেন। তিনিও জীবন নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে চাইছিলেন। ছয় মাস পর মা-ছেলে দু'জনই ইসলাম গ্রহণ করলেন।


মতবিরোধ শুরু


সাবিনে যখন ঘর থেকে বেরুতেন, হিজাব পরতেন, তবে নিকাব দিয়ে মুখ ঢাকতেন না। এমনকি বাজারে লোকজনের সঙ্গে আগের মতোই হ্যান্ডশেকও করতেন।


কিন্তু ক্রিস্টিয়ানের এগুলো ভালো লাগত না। সে মা-কে বকা দিয়ে বলত, ‘‘মা, এমন করো না, এগুলো হারাম।''


কিন্তু মা ভাবতেন, আমরা জার্মানিতে থাকি। এখানে এই বিষয়টা ঠিক যায় না।


এভাবে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিতে লাগল।


সে সময় আরো অনেক কিছু সাবিনে'র ভালো লাগত না। তিনি বলেন, ‘‘আমি দেখলাম, মেয়েরা সেসব কথাই বলে, যেসব তাদের স্বামীরা শিখিয়ে দিচ্ছে। আমি তাদের অনেক কথাতেই প্রশ্ন করতাম এবং বলতাম, নিজে কোরআন পড়ুন, শুধু অন্যের শেখানো বুলি আওড়াবেন না।''


আমার এ কথাগুলো পুরুষদের ভালো লাগত না। তারা ক্রিস্টিয়ানকে বলতেন, ‘‘তোমার মা'কে পথে আনো। সে আমাকে চুপ থাকতে বলত।''


ইয়াসমিনা'র সঙ্গে পরিচয়


২০১৪ সালে এক জার্মান মরোক্কান নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় ক্রিস্টিয়ানের। সাবিনে বলেন, ‘‘আসলে আমিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। একদিন জুম্মার নামাজের পর ১৭ বছরের ইয়াসমিনা সাবিনের কাছে এসে ক্রিস্টিয়ানের খোঁজ করে। কারণ হিসেবে বলে যে, ইসলামের একজন প্রকৃত অনুসারীকে বিয়ে করতে চায় সে।


তখন সাবিনে ঘূণাক্ষরেও ধারণা করতে পারেননি যে, ইয়াসমিনা আসলে এমন কাউকে বিয়ে করতে চাচ্ছে, যাকে নিয়ে সে সিরিয়া পালিয়ে গিয়ে আইএস-এ যোগ দিতে পারবে। এখন সাবিনে'র দৃঢ় বিশ্বাস যে, ক্রিস্টিয়ানের উগ্রপন্থার পথ বেছে নেয়ার কারণ ওই ইয়াসমিনা।


ছয় মাস পর ফ্রাঙ্কফুর্টের এক মসজিদে বিয়ে করে ক্রিস্টিয়ান ও ইয়াসমিনা। ২০১৫ সালের শুরুতেই ইয়াসমিনা সাবিনেকে জানায় যে, সে ও ক্রিস্টিয়ান ইসলামিক স্টেট-এ যোগ দেবে।


শুনেও কথাটাকে তখন অত গুরুত্ব দেননি সাবিনে। ভেবেছেন, ''এইটুকু মেয়ে, সে যাবে আইএস-এ!''


কিন্তু ততদিনে ইয়াসমিনা ও ক্রিস্টিয়ান অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে তারা সত্যিই সিরিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়।


ইসলামিক স্টেটের উদ্দেশে যাত্রা


ক্রিস্টিয়ান ও ইয়াসমিনা চলে যাবার পর ক্রিস্টিয়ান প্রায়ই হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ পাঠাত বা কল করতো।


ঠিক এক বছর পর একটি ভিডিও দেখে ধাক্কা খান সাবিনে। আইএসের সঙ্গে জড়িত অনলাইন প্লাটফর্ম ফুরাত মিডিয়াতে প্রকাশিত ভিডিওটিতে দেখা যায়, ক্রিস্টিয়ান (যার নাম তখন আবু ইসা আল-আলামনি হয়ে গেছে) ইউরোপে হামলার আহ্বান জানাচ্ছে।


ভিডিওতে এরপর কুঠার দিয়ে এক ব্যক্তির হাত কেটে ফেলার দৃশ্য দেখানো হয়। বুঝা যাচ্ছিল না যে, কাজটি ক্রিস্টিয়ানই করেছে কি না। তবে ভিডিওতে তাকে আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তির কপালে চুমু দিতে দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখে নিজের ছেলেকে পুরোপুরি অচেনা ঠেকে মা সাবিনে'র।


পরে টেলিফোনে কথা বলার সময় বিষয়টি নিয়ে চিৎকার করলে মা'কে উল্টো ‘অবিশ্বাসী' বলে গাল দেয় ক্রিস্টিয়ান। ওই কথোপকথনের পর সাবিনের শেষ আশাটুকুও মরে যায়। তাঁর মনে ক্ষীণ আশা ছিল যে, একদিন হয়তো পুত্র ভুল বুঝে ফিরে আসবে। তখন হয়তো ওর ১০ থেকে ১৫ বছরের সাজা হবে। তাতে কী? অন্তত দেখা তো হবে!


একদিন হোয়াটসঅ্যাপে দু'টি ছবি আসে সাবিনের মোবাইল ফোনে। সেখানে একটি কালাশনিকভ রাইফেলের সঙ্গে প্রেগনেন্সি টেস্ট পজিটিভ হওয়ার ছবি এবং অন্য ছবিতে ছেলে ও বোরখা পরা ছেলের বৌ।


মরুভূমিতে মৃত্যু


২০১৭ সালের ১ আগস্ট ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা বলেন মা। তখন ছেলে জানায় যে সে যুদ্ধে যাচ্ছে। যদি মারা যায়, তাহলে এক ইরাকি যোদ্ধাকে বিয়ে করবে ইয়াসমিনা। সব ব্যবস্থা করা আছে।


১৯ সেপ্টেম্বর ছেলের স্ত্রী ইয়াসমিনা কল করে। সে সগর্বে বলে, আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে তার স্বামী ‘শহীদ' হয়েছে।


কিন্তু সাবিনে মনে করেন এবং বলেন, ‘‘না, ক্রিস্টিয়ান আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করতে যায়নি। সে আইএস নেতা আল বাগদাদি ও তার অপরাধী সঙ্গীগুলোর জন্য যুদ্ধ করতে গিয়েছিল।''


ছেলেকে হারিয়ে সাবিনে এখন একজন একাকী মানুষ। তাঁর পরিচয় জানার পর মানুষজন তাঁর সঙ্গে খুব-একটা কথা বলতে চায় না। কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করে, ‘‘আপনি ক্রিস্টিয়ান লাপ্পের মা?''


সাধারণত তিনি উত্তর দেন, ‘‘হ্যাঁ, আমি ওর মা, কিন্তু আমি ভয়ঙ্কর নই। আমার হিজাবের নিচে কালাশনিকভ রাখা নেই এবং আমি কারো হাত কাটি না।'' সূত্র : ডয়চে ভেলে


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com