প্রাচীন মানচিত্র তৈরির সাতকাহন
প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ১৪:৩৮
প্রাচীন মানচিত্র তৈরির সাতকাহন
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

মানচিত্র যার ইংরেজি নাম Map. এসেছে লাতিন Mappa থেকে। Mappa মানে রুমাল বা ওই ধরনের ছোট কাপড়। সম্ভবত এক সময় কাপড়ের ঊপর ছোট ছোট কিছু নকশা একে রাখা হত এই জন্য এরকম নাম করন।


মানচিত্র রচনার পরিভাষিক নাম Cartography. এই Cartography ঘেটে দেখা যায়্ মানচিত্রের উপর মানূষের নির্ভরশিলতা প্রাচীনকাল থেকে। আর একাজে সাহায্য নেয়া হত আকাশের তারার। লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা আছে পৃথিবীর এ যাবত উদ্বারকৃত প্রাচীনতম ম্যাপের একটি- মাটির তৈরি, পাওয়া গেছে ব্যাবিলনের ৩২০ কিমি উত্তরে ‘গা-সুর’ শহরে। এই মানচিত্রর বয়স আনুমানিক ৪৩০০ বছর। চারটি দিকের অবস্থান ছাড়াও এই মানচিত্রে আছে দুটি নদী এবং দু্টি পর্বতের মাঝে একটি শহর।


গ্রীসেও মানচিত্র রচনার চল ছিল। মিলেটাস দ্বীপের বাসিন্দা দার্শনিক অ্যানাকসিম্যান্ডের (খৃঃ পূঃ ৬১০-৫৪৬) যে মানচিত্র এঁকেছিলেন তাতে পৃথিবীকে গোল দেখান ও হয়েছে চারিদিকে সমুদ্র ঘেরা, মাঝে ঈজিয়ান সাগরের তীরে বর্তমানের তিনটি মহাদেশ এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের কিছু অংশ। আরো উন্নত মানচিত্র এঁকেছিলেন ইরাটোস্থেনিস (২৭৬-১৯৪ খৃঃ পূঃ) যাতে আলেকজান্দারের অভিযানের কিছু দেশের স্থান ছিল, এশিয়া অপেক্ষাকৃত বড় ও চওড়া। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এখানে অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংষ রেখার উল্লেখ আছে।


টলেমির (১৫০ খৃঃ পূঃ) আঁকা মানচিত্র দীর্ঘদিন ভবিষ্যৎ মান চিত্রকরদের অনুপ্রাণিত করেছে। তবে এই সব মানচিত্রের অনেক দোষত্রুটি ছিল। ক্ষেত্রসীমা বা নানা জায়গা ঘুরে জরিপ করে সঠিক মানচিত্র আঁকা কাজ শুরু হয়েছিল রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আমলে। রীতিমত প্রশিক্ষণ দিয়ে একদল লোক নিয়োগ করা হয়েছিল, যাদের বলা হত ‘এগ্রিমেন্সোর’। প্রায় ৩০ বছর যাবৎ এরা গোটা রোমান সাম্রাজ্য চষে বেরিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে শুরু করে মানচিত্র তৈরির কাজ। বিরাট বিরাট মানচিত্র তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে শাসন কাজের সুবিধার জন্য পাঠানো হতে থাকল। তত দিনে সিজার এবং তার ছেলে গত হয়েছেন, তাদের অসমাপ্ত কাজ শেষ করেন তার জামাই ভিস্পানিয়াস এগ্রিপ্পা। এগ্রিপ্পার মৃত্যুর এই কাজ ভাটা পড়ে। কিন্ত শ্বেতপাথরে খোদাই করে কিছু মানচিত্র রেখে দেয়া হল। কনরাড পুতিংগার নামে এক প্রত্নসংগ্রাহক ষোড়স শতকে এগুলো কিছু অংশ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেন যার নাম হয় পিউটিংগারের মানচিত্র।


মানচিত্র আঁকা সহজ কাজ নয়, কারণ পৃথিবীর আঁকার এমনই যে তাকে চৌকো কাগজে আঁকতে গেলে বিপত্তি অনিবার্য। একমাত্র যাকে বলে গ্লোব সেখানেই মোটামুটি নির্দিষ্টভাবে সাগর, মহাসাগর দ্বীপপুঞ্জ, দেশ নদীনালা অবস্থান আঁকা ঠিকভাবে সম্ভব। কাগজে আঁকতে গেলে স্থানিক দূরত্ব বা আকার আয়তনের ক্ষেত্রে গোলমাল থেকেই যাবে। এর মূল কারণ হল গোলকের ক্ষেত্রে Spherical Trigonometry র সাহায্য নেয়া সম্ভব। সেই জন্য দূরত্বের ব্যবহার বুঝানোর জন্য স্কেলের ব্যবহার চালু হয় জরিপ পদ্ধতির। যার সাহায্যে দূরত্ব উচ্চতা প্রভৃতির মান নির্ণয় করা যায়।


যে কোন মানচিত্রেই নির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক বিষয়ের উপর ছবি আঁকা হয় এবং দিকের নির্দিষ্ট মানের উপর ভিত্তি করে। প্রতীকী চিহ্ন দিয়ে বুঝানো হয় পাহাড়, পর্বত, নদীনালা, রাস্তাঘাট এই সব। চিহ্নগুলো সহজ করে আঁকা হয় যাতে সাধারণ মানুষ সহজ করে বুঝতে পারে। নানা রকম রঙ দিয়ে প্রতীক চিহ্ন আঁকা হয় যাতে আলাদা আলাদাভাবে বস্তু বোঝা যায়। অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ বুঝাতে সরলরেখার ব্যবহার করা হয়। যে কোন মানচিত্রে উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম ব্যবহার করা হয়, দূরত্বের মান আঁকা হয় স্কেলে। এই স্কেলের মান বিভিন্ন রকম কারণ মাত্র এক সেন্টিমিটার জায়গায় যদি পৃথিবীর এক কিলোমিটার জায়গার ছবি আঁকতে হয়, আবার আর একটা মানচিত্রে যদি ওই এক সেন্টিমিটার জায়গায় যদি একশো কিলোমিটার কোন জায়গার ছবি আঁকতে হয় তবে সঙ্গত কারণে দ্বিতীয় মানচিত্রের বিষয় বস্ত প্রথম মানচিত্রের একশো ভাগ ছোট করে আঁকতে হবে। অর্থ্যাৎ সহজভাবে বলতে গেলে বলা যায় মানচিত্র আঁকা হয় দুধরনের– বড় স্কেলের এবং ছোট স্কেলের। বড় স্কেলে দুজাতের মানচিত্র আঁকা হয়। একটার নাম মৌজা বা ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপ যার স্কেলের মাপ ১৬ইঞ্চি= ১ মাইল। এই ম্যাপে চাষের জমি বা বাস্তুজমির খতিয়ান নাম্বার সমেত সীমান আঁকা হয়। আর দ্বিতীয় জাতের মানচিত্র যার ইংরেজি নাম Ordnance Survey Sheet বা Topo Sheet. ব্রিটিশ আমলে এই সার্ভে দপ্তরের কাজ ছিল Topo Sheet তৈরি করা।


বিবার্তা/জিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com