এক ভাগ্যাহত মানুষের কাহিনী
প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৭, ১৫:৫৬
এক ভাগ্যাহত মানুষের কাহিনী
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৮৩ সালে মোহাম্মদ মোস্তাফা রাশীদের বয়স যখন ২৫, তখন তিনি পাড়ি জমান সউদি আরবে। তখনো অবিবাহিত, উদ্দাম তরুণ রাশীদ। চোখে তাঁর সুখী আগামীর স্বপ্ন - এদেশে কাজ করে টাকা জমাবেন, দেশে ফিরে বিয়ে করবেন। গড়বেন সুখের সংসার।


কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। ভারতের কেরালা রাজ্যের কল্লাম এলাকার যুবক রাশীদ কখনো কি ভাবতে পেরেছিলেন তাঁর জীবনটা এমন হবে!


রাশীদ সউদি আরব এসে প্রথমে এসে প্রথম কাজ শুরু করেন ড্রাইভার হিসেবে। তারপর হন পানির কলের মিস্ত্রি। এরপর এক সউদি স্পন্সরের সহযোগিতায় শুরু করেন ব্যবসা। ব্যবসার মূলধন যোগাতে যত পরিচিত আছে সবার কাছ থেকে ধারকর্জ নেন।


রাশীদের তোড়জোড় দেখে ভাগ্য বোধহয় অলক্ষ্যে হেসেছিল। শুরু থেকেই তাঁর ব্যবসা ভালো যায় না। একের পর এক লোকসান দিতে থাকেন তিনি। তাও হয়তো সামাল দেয়া যেতো, কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে আরেক ঘটনা। রাশীদের সউদি স্পন্সর হঠাৎ ইন্তেকাল করেন। আর তারপরই তাঁর ওয়ারিশদের মধ্যে লেগে যায় ধুন্ধুমার। তাতে রাশীদ নামের এক বিদেশি যুবা বাঁচল কি মরলো, তা দেখার ফুরসত কই ওদের!


ব্যবসা হারিয়েছে, কিন্তু পাওনাদাররা তো আছে। আকণ্ঠ দেনায় নিমজ্জিত রাশীদ। স্পন্সরের মৃত্যুর রাশীদের ইকামা ও ট্র্যাভেল ডক্যুমেন্টও নবায়ন করা হয়নি। ফলে বৈধভাবে গিয়েও অবৈধ হয়ে পড়লেন রাশীদ। এ যেন মড়ার ওপর খাড়ার ঘা।


রাশীদ চলে এলেন জেদ্দার রাওদাহ এলাকায়। যখন যেখানে যে কাজ পান, সেটাই করেন আর তা দিয়ে একটু একটু করে দেনা শোধ করে চলেন। দেনা শোধ হতে থাকে, কিন্তু এই দীর্ঘ ৩৪ বছরে তিনি আর একটি কানাকড়িও দেশে পাঠাতে পারেন না।


এই করতে করতে এক সময় দেশে ফেরার আশাই ছেড়ে দেন রাশীদ। ভাবেন, এখানেই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো, এখানেই আমার কবর হবে।


কিন্তু রাশীদের স্বপ্নের সঙ্গে একমত হন না প্রখ্যাত সমাজকর্মী শিহাব কত্তুকাদ। ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ''প্রবাসী সম্মান পুরস্কার''প্রাপ্ত এই সমাজকর্মী বোঝান রাশীদকে, ''আপনি তো মারাই গেলেন। কিন্তু আপনাকে নিয়ে অন্যদের কী ভীষণ অসুবিধায় পড়তে হবে, বুঝতে পারছেন? আপনি অবৈধ কিনা!''


তিনি রাশীদকে আরো মনে করিয়ে দেন, ''আপনার মায়ের বয়স হয়ে গেছে। অসুস্থও। তিনি এই ৩৪ বছর একবারও আপনাকে দেখেননি। তিনি সবাইকে বলেন যে মরার আগে একবার অন্তত ছেলের মুখ দেখতে চান।'' রাশীদ কি মায়ের শেষ ইচ্ছাটাও পূরণ করবেন না!


রাশীদ আর ''না'' করতে পারেন না। এদিকে সউদি সরকারও অবৈধ অভিবাসীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছে। রাশীদ তার সুযগ নেয়ার কথা ভাবেন।


আব্দুল কারীম নামের আরেক সমাজকর্মী রাশীদকে প্রতিশ্রুতি দেন যে যদি রাশীদ ভারতে ফিরে যান তাহলে তিনি তাঁকে একটি পিকআপ ভ্যান কিনে দেবেন, যাতে সেটি চালিয়ে বা ভাড়া দিয়ে দিন গুজরান করতে পারেন রাশীদ।


এতোকিছুর পরেও সমস্যা কাটে না। রাশীদ তাঁর দীর্ঘ দুঃসময়ে হারিয়ে ফেলেছেন নিজের পাসপোর্টটিও। তাহলে তিনি যে ভারতীয়, তারই বা প্রমাণ কী? যাহোক, ভারতীয় দূতাবাস যোগাযোগ করে কেরালা রাজ্য সরকারের সঙ্গে। তারা খোঁজখবর নিয়ে জানায় যে, রাশীদ আসলেই কেরালাবাসী।


আর সমস্যা থাকে না। জেদ্দা সিটি ফ্লাওয়ার স্টোরসের আহমেদ কয়া বিমানের টিকিট কিনে দেন রাশীদকে। আরো অনেকেই আসেন, আনেন নানারকম উপহার, কাপড়চোপড়। কিন্তু রাশীদ ওসবের কিছুই নিতে রাজি হন না। বলেন, ''আমি খালি হাতে এসেছিলাম, খালি হাতেই দেশে ফিরতে চাই।''


ভারত থেকে আসা ২৫ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ মোস্তাফা রাশীদ টানা ৩৪ বছর সউদি আরবে কাটিয়ে ৫৯ বছর বয়সী প্রবীণ হিসেবে অবশেষে গত ১৪ জুন দেশে ফিরে গেছেন। সূত্র : সউদি গেজেট


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com