নানা অনিয়মে জর্জরিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৯, ১১:৫১
নানা অনিয়মে জর্জরিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
আকরাম হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+

সরকারি খাতে চিকিৎসা সেবার জন্য দেশের সবচেয়ে বড় নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল। তবে নানা অনিয়মের জালে জর্জরিত এই প্রতিষ্ঠানটি। দালাল ও বহিরাগতদের চক্রে অতিষ্ঠ এখানে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ। যার কারণে সেবা নিতে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা।


সিট না থাকায় হাসপাতালের ফ্লোরে অবস্থান করছে রোগীরা। ডাক্তার দেখানোর জন্য টিকেট সংগ্রহে করতে দাঁড়াতে হচ্ছে লম্বা লাইনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে টিকেট সংগ্রহ করতে। ওষুধ সরবরাহে রয়েছে নানা অনিয়ম। স্টাফ, নার্স ও আয়াদের আন্তরিকতা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।


দিনের পর দিন এমন অনিয়ম ও অভিযোগ নিয়েই চলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম। সেবার মান নিয়ে অধিকাংশ রোগীই সন্তুষ্ট না।


মুন্সিগঞ্জ থেকে বাবাকে চিকিৎসা করাতে এসেছেন আলামিন। তার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, আমি কখনো সরকারি হাসপাতালে আসি না। এবার আর্থিকভাবে একটু ঝামেলার মধ্যে ছিলাম। এ কারণে এখানে আসছি। এখানের চিকিৎসা আমার মোটেও ভালো লাগে না। ধরেন, আমার ক্ষুধা লাগছে আজ, আর খাবার দিলেন আগামীকাল। তাহলে তো এই খাবার আমার আর কাজে আসলো না। এখানের সেবাটাও এমন, যখন যেটা দরকার তখন সেটা পাওয়া যায় না। পরে পাওয়া যায়, যখন রোগীর দরকার কমে যায়।



তিনি বলেন, বেলা ২টায় আমার রিপোর্ট দেয়ার কথা। কিন্তু রিপোর্ট আজ নাও হতে পারতো। পরে একজনের সাথে কথা বলি। সে ২০০ টাকা নিয়ে রিপোর্ট এনে দিয়েছে।


আপনি টাকা দিলেন কেন জানতে চাইলে আলামিন বলেন, সাতদিন ধরে হাসপাতালে পড়ে আছি। আজ রিপোর্ট দিলে ডাক্তারকে দেখিয়ে বাড়ি চলে যেতে পারব। যদি রিপোর্টই না পাই তাহলে আজও বাড়ি যেতে পারবো না। কিছু টাকা বেশি লাগলেও কাজ তো হচ্ছে।


সেবার বিষয়ে এই ভুক্তভোগী রোগী বলেন, টাকা না দিলে রিপোর্ট পেতাম না। কখন যে পেতাম তারও কোন ঠিক নেই। তাহলে বোঝেন কি সেবা পেয়েছি। তবে এই হাসপাতালে পরিচিত ডাক্তার বা পরিচিত লোক থাকলে ভালো সেবা পাওয়া যায়। তারা বলে দিলে সবকিছু দ্রুত হয়ে যায়।


আজিমপুর থেকে দ্বিতীয়বারের মতো কোমরের ব্যথা নিয়ে ডাক্তার দেখাতে আসেন মালেকা। ডাক্তার দেখে ওষুধ লিখে দেন এবং বলে দেন যে, হাসপাতাল থেকে সব ওষুধ নিয়ে যেতে। কিন্তু এখানে ওষুধ নিতে আসলে বাধে ঝামেলা। মালেকাকে সব ওষুধ না দিয়ে কিছু দেন। পাশাপাশি তাকে জানানো হয় যে, এখন ওষুধ দেয়া বন্ধ হয়ে যাবে। বাকি ওষুধ নিতে চাইলে আগামীকাল আসতে হবে। এখন আর দেয়া যাবে না। তখন মালেকা বারবার অনুরোধ করে বলেন এখনো তো ওষুধ দেয়া বন্ধ করেননি। আমাকে যখন কিছু ওষুধ দিলেনই সেইসাথে বাকিটাও দিয়ে দেন। তখন কর্তব্যরত কর্মকর্তা তাকে জানান, আপনার ওষুধ আমাদের কাছে নেই। বাইরে থেকে কিনে নিন।



মালেকা বিবার্তাকে বলেন, একদিকে ডাক্তার বলে দিয়েছে এখান থেকে ওষুধ নিতে। আর এখানে আসলে বলে নাই। আসলে যেসব ওষুধের দাম কম সেই সব ওষুধ দেয়। আর বেশি দামের ওষুধ দেয় না। প্রথমবার যখন আসি তখনও একই কথা বলেছিল। এবারও তাই বলছে বলে মনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই রোগী।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন রোগী বিবার্তাকে বলেন, ডাক্তাররা মোটামুটি ঠিক আছেন। সময়মতো আসেন, রোগী দেখেন। পাশাপাশি তারা অনেক আন্তরিকও। কিন্তু ঝামেলা করেন এখানকার নার্স ও আয়ারা। তবে এটারও সিস্টেম আছে। নার্স ও আয়াদের কিছু টাকা দিলে তারাও মোটামুটি সেবা দেন।


রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে বসে আছেন জাকির হোসেন। তিনি বলেন, ডাক্তার দেখে আল্ট্রাসনো করতে বলেছে। আল্ট্রাসনো করাতে আসলে এখান থেকে জানানো হয় আজ হবে না। কারণ হিসেবে জানায় বেলা ২টা পর্যন্ত আল্ট্রাসনো করানো হয়। আজ ২টা পার হয়ে গেছে। আগামীকাল এসে আল্ট্রাসনো করাতে বলেন।


জাকির হোসেন মনের ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবার্তাকে বলেন, এ সময় এক আনসার সদস্য এসে আমার কাছে ৫০০ টাকা ঘুষ চান। পরীক্ষা করাতে হাসপাতালে ১১০ টাকা ফির সাথে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা দিতে বলেন। টাকা দিলে সে এখনোই করে দিতে পারবে। আর টাকা না দিলে কাল করাতে হবে।


মাদারীপুর থেকে আসা খোকন বলেন, সোমবার এখানে রিপোর্ট করাতে আসলে এক আনসার সদস্য আমার কাছে এসে বলেন ২০০ টাকা দেন, এক ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট করে দিচ্ছি। আমি এক ঘণ্টা পরে করেছি তবুও কাউকে টাকা দেইনি। আসলে আমরাই এদের খারাপ করি। অনেকে আবার দ্রুত কাজ করার জন্য নিজ থেকেও টাকা দেন।



অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে যশোর থেকে এসেছেন মোহাম্মদ রেজাউল। সিট না পেয়ে রয়েছেন হাসপাতালের ফ্লোরে। সিট না থাকার কারণে ভর্তি নেয়নি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে একদিন হয়ে গেলেও ভর্তি না থাকার কারণে রোগীকে ডাক্তার দেখেনি, আসেনি নার্সও। কখন রোগীর ভর্তি হবে বা কখন ডাক্তার এসে দেখবেন সেটা নিয়েও রয়েছেন তিনি দুশ্চিন্তায়।


ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বিবার্তাকে তাদের অসহায়ত্ব ও সীমাবদ্ধতার কথা জানান। পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে আশার কথাও জানান তিনি।


আনসার ও দালাল চক্রের ব্যাপার তিনি বিবার্তাকে বলেন, রিপোর্ট করাতে ধরেন একশত রোগী লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। সবারই তো অধিকার আছে সময় মতো রিপোর্ট পাওয়ার। কিন্তু কেউ যদি টাকা দিয়ে আগে নিতে চান তাহলে তো সেটা তার অপরাধ। ঘুষ নেয়া দেয়া দুইটা অপরাধ। তারপরও যদি রিপোর্ট করাতে যেয়ে কেউ টাকা চেয়েছে বলে আপনাদের কাছে অভিযোগ করেন, তাহলে তাকে প্রমাণসহ আমাদের কাছে দিতে বলেন। সাথে সাথে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।


তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে সবাই তো আর ভালো হয় না। কেউ কেউ হয়তো দ্রুত অনিয়মের সাথে জড়িয়ে পড়েন। আমাদের এখান থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় যাতে রোগীদের সাথে কোনো রকম অনিয়ম না হয়। এরপরেও কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সাথে কাউকে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার সাথে সাথেই আমরা ব্যবস্থা নেই এবং শাস্তি দেই। কোনো সময় নেয়া হয় না। অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার কারণে আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন আনসার সদস্যকে বরখাস্ত করেছি।



তবে হাসপাতালে সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করলেন ঢামেকের এ পরিচালক। তিনি বলেন, ধরেন আমার প্রতিষ্ঠান সমর্থন আছে দিনে ৫০০ লোকের সেবা দেয়ার। কিন্তু দিনে যদি কমপক্ষে ১ হাজার থেকে ১২ শত লোকের সেবা দিতে হয় তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে? আমরা কাউকে তো নিষেধ করতে পারি না। এ সুযোগটা অনেকে ব্যবহার করে। যার কারণে অনিয়মটা হচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি সকল ধরনের অনিয়ম বন্ধ করতে। আগামীতে আরো চেষ্টা করব এগুলো বন্ধ করার।


বিবার্তা/আকরাম/উজ্জ্বল/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com