চেকের নামে যাত্রীদের সাথে প্রতারণা করছে বাস কোম্পানি
প্রকাশ : ২১ জুন ২০১৯, ০৮:৪১
চেকের নামে যাত্রীদের সাথে প্রতারণা করছে বাস কোম্পানি
আকরাম হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+

দেশের সড়কপথ মানুষের কাছে এখন এক আতঙ্কের নাম। অন্যদিকে, নিত্য নতুনভাবে এই সেক্টরে প্রতারণার শিকার হচ্ছে মানুষ। তার মধ্যে সর্বশেষ হচ্ছে ওয়েবিল বা চেকের নামে যাত্রীর সাথে প্রতারণা।


রাজধানীতে সিটিং সার্ভিস নামে চলাচল করা বাসগুলোতে কতজন যাত্রী রয়েছে তা নির্ধারিত স্থানে আসলে গণনা করে লিখে দেয় বাস কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। আর এতেই নির্ধারিত হচ্ছে বাস ভাড়া। আগে শুধু সিটিং সার্ভিস নামে চলাচল করা বাসে এই সিস্টেম চালু থাকলেও সম্প্রতি সময়ে এসে রাজধানীর অধিকাংশ বাসেই এই ওয়েবিল সিস্টেম চালু হয়েছে।



অনেক দিন ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে চেকের নামে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে বাস কোম্পানিগুলো। মূলত, বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার তোয়াক্কা না করে ওয়েবিলের মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে তারা। বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। এতে ঠকছে সাধারণ যাত্রীরা। বিশেষ করে স্বল্প দুরত্বে যাওয়া যাত্রীরা।


স্বল্প দুরুত্বে যাওয়া যাত্রীদের দিতে হচ্ছে সম্পূর্ণ পথের ভাড়া। যদি কারওয়ানবাজার থেকে কোনো যাত্রী বাসে উঠে বাংলামটর বা শাহাবাগ নামে তাহলেও যাত্রীকে দিতে হচ্ছে গুলিস্থান, মতিঝিল বা সদরঘাটের ভাড়া।


এদিকে, মহাখালী হয়ে আসা বাসগুলোর চেক বসানো হয়েছে সাতরাস্তার আগে। ফলে যেসব যাত্রীরা সাতরাস্তা বা মগবাজার যাবেন, তাদের ভাড়া দিতে হয় গুলিস্তানের। প্রায় একই অবস্থা রাজধানীর সবগুলো রুটে।


বিআরটিএ'র প্রশাসন শাখার অর্থ উপ-পরিচালক হাসান আল আমিন বিবার্তাকে বলেন, মূলত সিটিং সার্ভিস নামে বিআরটিএ কর্তৃক কোনো বাসের অনুমোদন নেই। ওয়েবিল বা চেকের নামে যাত্রীদের নিকট থেকে যে অতিরিক্ত ভাড়া নেয়া হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ বেআইনি। পরিবহনের রেগুলার ভাড়া যা নির্ধারিত আছে তার বাইরে ভাড়া নেয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। কেউ নিয়ে থাকলে এর বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আমাদের মোবাইল কোর্ট প্রতিদিনই বসছে। কোথাও অনিয়ম হলে সাথে সাথেই ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।


বিআরটিএ'র তথ্য মতে, প্রতি কিলোমিটারের জন্য বাস ভাড়া ১ টাকা ৭০ পয়সা। আর মিনি বাসের জন্য প্রতি কিলোমিটার ১ টাকা ৬০ পয়সা। তবে বিআরটিএ’র নির্ধারিত ভাড়া ধারের কাছেও যাচ্ছে না অধিকাংশ বাস কোম্পানিগুলো।



সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাসাবো থেকে কাঁটাবন বা সাইন্সল্যাব আসতে ৮ কি.মি পথের জন্য ওয়েবিলে ভাড়া নির্ধারিত হয়েছে ২৫ টাকা। বিআরসটিএ'র ভাড়া অনুযায়ী এই পথের ভাড়া ১৪ টাকা। যাত্রীদের বাধ্য হয়ে বেশি ভাড়া দিয়ে আসতে হচ্ছে।


মহাখালী হয়ে আজিমপুর আসা বিকাশ বাসে ভাড়া গুণতে হয় ২৫ টাকা। একই ভাড়া দিতে হয় মহাখালী থেকে ফার্মগেট, মানিক মিয়া এভিনিউ, ধানমন্ডি-২৭ বা শুক্রাবাদ আসতেও। অথচ মহাখালী থেকে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের দুরুত্ব ৪.৩ কিলোমিটার।


ধানমন্ডি-১৫ থেকে মৈন্ত্রী, এফটিসিএল, রজনীগন্ধা, সিটি-বাস, মিডলাইনসহ যে কোনোবাসে উঠে মৎসভবন, প্রেসক্লাবে যেতে হলে দিতে হয় ২০ টাকা। কারণ এর মাঝে রয়েছে দুইটি চেকপোস্ট। একটি চেকপোস্টে ১০ টাকা করে ধরে ২০ টাকা নেয়া হচ্ছে। অথচ ধানমন্ডি-১৫ নাম্বার থেকে প্রেসক্লাবের দুরুত্ব মাত্র ৪.৬ কি.মি। সেই হিসেবে এ পথের ভাড়া আসে ৮ টাকা।


রজনীগন্ধা বাসে ঝিগাতলা থেকে সাইনবোর্ড ভাড়া নেয় ৪৫ টাকা। এই পথের দূরত্ব মাত্র ১৪.৭ কি.মি। প্রতি কিলোমিটার ১.৭০ টাকা হিসাবে ভাড়া আসে ২৫ টাকা। একই অবস্থা প্রায় রাজধানীর প্রতিটি রুটে। এইভাবে যাত্রীদের পকেট কাটছে বাস কোম্পানিগুলো।


নর্দান ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী কাওছার আহম্মদে নিলয় বির্বাতাকে বলেন, মিডলাইন বাসে শাহাবাগ থেকে খিলগাঁও যেতে ভাড়া নেয় ২৫ টাকা। যদি কমলাপুর পর্যন্ত যাই তাহলেও ২৫ টাকা ভাড়া দিতে হয়। আবার মুগদা গেলেও একই ভাড়া দিতে হয়।


রায়হান নামের এক যাত্রী বিবার্তাকে বলেন, খিলক্ষেত থেকে টঙ্গী ২৫ টাকা ভাড়া চাইলে আমি তাদের কাছে ভাড়ার তালিকা দেখতে চাই। কিন্তু তারা তালিকা না দেখিয়ে একজন চেকারকে বাসে উঠায়। তারপর ওই চেকার বাসে উঠে ওয়েবিল দেখে বলে এখানে নামলে ১৫ টাকা আর সামনে নামলে ১৫ টাকা। অথচ দূরত্ব মাত্র ২০০ গজ।



এ ব্যাপারে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাপরিচালক মোজাম্মেল হক চৌধুরী বির্বাতাকে বলেন, বাংলাদেশী সিটিং সার্ভিস নামে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বৈধতা দেয়া হয়নি। সেখানে ওয়েবিলের তো কোনো প্রশ্নই আসে না। এইগুলো প্রতারণামূলক সার্ভিস। এটার মাধ্যমে বাস কোম্পানিগুলো জনগণের সাথে তামাশা করছে, প্রতারণা করছে। সরকার এইগুলো দেখেও না দেখা ভান করছে। যে কারণে যাত্রীরা প্রতিনিয়ত প্রতারণা শিকার হচ্ছে। এইগুলো বাস মালিক পক্ষ চালু করে থাকলেও বন্ধ করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সরকার যদি এটাকে বন্ধ না করে, তাহলে এই ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে রাষ্ট্র বৈধতা দিচ্ছে বলে আমরা মনে করি।


সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ্ বিবার্তাকে বলেন, ওয়েবিলের সাথে ভাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। এটা শুধু সিরিয়াল মেনটেন বা যাত্রীর সংখ্যা গণনা করার জন্য। পাশাপাশি সিটিং সার্ভিস নামেও কোনো কোম্পানির অনুমোদন নেই। কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে সিটিং সার্ভিস এর কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ আসলে সে ক্ষেত্রে আমরা ব্যবস্থা নেই। একই সাথে বিআরটিএ অভিযান পরিচালনা করে থাকে। কোনো অনিয়ম পেলে তারও ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।


বিবার্তা/আকরাম/উজ্জ্বল/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com