সেই পঞ্চায়েতের সেকাল-একাল (পর্ব- ১)
প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৯, ০৯:৪৮
সেই পঞ্চায়েতের সেকাল-একাল (পর্ব- ১)
আদনান সৌখিন
প্রিন্ট অ-অ+

পুরান ঢাকার স্থানীয় মানুষের মধ্যযুগীয় বিচার ব্যবস্থার নাম পঞ্চায়েত। ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহল্লার সামাজিক-প্রশাসনিক প্রয়োজনে গড়ে ওঠে এই ব্যবস্থা। পঞ্চায়েত শব্দটির উৎপত্তি পঞ্চ বা পাঁচ থেকে। পাঁচজন সদস্য নিয়ে স্বনির্ভর গ্রামীণ পরিষদ গঠিত হত। এটাকেই বলা হত পঞ্চায়েত।


পঞ্চায়েতের এই পাঁচ ব্যক্তির প্রথমজনকে বলা হত মীরে মহল্লা বা সরদার। দ্বিতীয়জনকে নায়েব সরদার, আর বাকি তিনজনকে বলা হত লায়েক বেরাদার। এই পাঁচজনের হাতেই ছিল পঞ্চায়েতের বিচারিক সমস্ত ক্ষমতা। এই পাঁচজনের সঙ্গে অল্প বেতনে কাজ করতেন একজন গোরেদ বা সাকিদার, যার কাজ ছিল পঞ্চায়েত প্রদত্ত তথ্য বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেয়া।


সাধারণত তারাই পঞ্চায়েত সদস্য হতেন যাদের পারিবারিক কবরস্থান ও বাংলা ঘর (২০-২৫ জন মানুষ বসার মতো বড় জায়গা) ছিল।



ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, ঢাকার ঐতিহ্য পঞ্চায়েত প্রথা এখন বিলুপ্তির পথে। অর্থনীতির নতুন বিন্যাস, ১৯৪৭’এ স্বাধীনতার পর বিশাল পরিবর্তন সবকিছুই সাহায্য করেছিল ঢাকার পঞ্চায়েত প্রথার বিলুপ্তিতে।


তবে সম্প্রতি, ঢাকার দু’একটি মহল্লায় আবার নতুনভাবে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালুর প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে।


‘ঢাকাবাসী’ নামক সংগঠনের সভাপতি শুকুর সালেক বিবার্তাকে বলেন, পঞ্চায়েত প্রথা ঢাকাবাসীর ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। পঞ্চায়েতে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ সঠিক বিচার পেত। সবার মতামতের ভিত্তিতে সরদার রায় দিতেন। ঢাকা নগর যাদুঘরে এ বিষয়ক কিছু ছবি এবং তথ্য এখনো নথিভুক্ত রয়েছে।


ঢাকা মহানগর সমিতির সহসভাপতি হাজী আব্দুস সালাম বিবার্তাকে বলেন, পঞ্চায়েত প্রথা ছিল শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। পঞ্চায়েতের সরদার কখনো মিথ্যা বলতেন না। সবাই তাদের বিশ্বাস করতেন। কেউ পঞ্চায়েতের রায় না মানলে তাদের শাস্তি দেয়া হতো।



পঞ্চায়েত প্রথার সূত্রপাত মোঘল আমলে। তবে ইংরেজ আমলে ছিল পঞ্চায়েতের ভরা যৌবন। প্রথাটি বিশেষভাবে আইনি বৈধতা পায় ১৮৫৭ সালে। সিপাহী বিদ্রোহের ফলে যখন ঢাকার প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে তখন ইংরেজ প্রশাসন নবাব আবদুল গণিকে ঢাকাবাসীকে নিয়ন্ত্রণে আনার দায়িত্ব দেন। তিনি মহল্লার কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নবাববাড়িতে ডেকে এনে এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন। এরপর বিভিন্ন মহল্লার পঞ্চায়েত ও সরদার ঘোষণা করেন।


ঢাকায় দুই ধরনের পঞ্চায়েত প্রথা চালু ছিল, বাইশ পঞ্চায়েত এবং বারো পঞ্চায়েত। যারা ঢাকাই উর্দুভাষী ছিলেন তারা ছিলেন বাইশ পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত। আর ঢাকায় বাংলাভাষীরা ছিলেন বারো পঞ্চায়েতের অধীনে। তবে নওয়াব সলিমুল্লাহর আমলে বাইশ পঞ্চায়েত এবং বারো পঞ্চায়েতকে একসঙ্গে নিয়ে পঞ্চায়েত প্রথাকে আরো শক্তিশালী করা হয়।


১৮৮৩ সালে প্রকাশিত জেমস ওয়াইজের গ্রন্থে পঞ্চায়েত সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যায়। ঢাকা পঞ্চায়েতসমূহের তত্ত্বাবধায়ক খাজা আজম ‘দ্য পঞ্চায়েত সিস্টেম অব ঢাকা’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন ১৯০৭ সালে।



সেই বইয়ে বলা হয়, পেয়ার বখ্শ্ সরদার ছিলেন সূত্রাপুর-ফরাশগঞ্জের একজন আলোচিত মঞ্চশিল্পী। তার অভিনীত মঞ্চনাটক দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শক সমাগম ঘটত। পেয়ার বখ্শ্ সরদারসহ অনেকেই তখন নিজস্ব অর্থায়নে খোলা চত্বরে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে নাটক করতেন।


বিবার্তা/আদনান/উজ্জ্বল/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

বি-৮, ইউরেকা হোমস, ২/এফ/১, 

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com