শূন্যরেখার শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুদের মানবেতর দিনযাপন
প্রকাশ : ০৭ নভেম্বর ২০১৭, ১৫:৩২
শূন্যরেখার শিবিরে রোহিঙ্গা শিশুদের মানবেতর দিনযাপন
আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুরা
আবুল বশর নয়ন, বান্দরবান
প্রিন্ট অ-অ+

চলছে মধ্যহেমন্ত। জেকে না বসলেও সর্বত্র শীতের পদধ্বনি। তবে দেশের পাহাড়ি এলাকায় রাতে নেমে আসে শীতের হিম বাতাস। প্রয়োজনীয় গরম কাপড় না থাকায় শীতে জবুথবু হয়ে যাচ্ছে আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুরা। ফলে প্রচণ্ড স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে এসব শিশু।


মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখার বাহির মাঠের পশ্চিমে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গা পরিবারের দেড় শতাধিক শিশু প্রচণ্ড শীত ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের নেই শীতবস্ত্র। রাতে শীত নিবারণের জন্য নেই কম্বল।


খালি গায়ে-খালি পায়ে পলিথিনের ছাউনিতে তাদের দিন কাটছে অত্যন্ত মানবেতরভাবে। দিনের শুরুতে রৌদ্র তাপে কিছুটা আরাম পেলেও পড়ন্ত বিকেলে পাহাড়ি উপত্যকার শৈত্য প্রবাহ রোহিঙ্গা পরিবারগুলোর জীবন যেন দুর্বিসহ করে তোলে।


সরেজমিনে গিয়ে রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা নির্যাতনে টিকতে না পেরে ২৫ আগস্ট ভোরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৪৯ নং পিলারের কাছাকাছি এই এলাকায় এসে আশ্রয় নেয় ৭৮টি রোহিঙ্গা পরিবার। সরকারি হিসেবে এই অস্থায়ী শিবিরের মোট জনসংখ্যা ৩৬২। গত শুক্রবার একজন কন্যা শিশু এবং একজন ছেলে শিশু জন্ম নেয়ায় জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬৪ জনে। যার মধ্যে পুরুষ ৯৩জন ও নারীর সংখ্যা ১০০। কন্যা শিশু ৭৭ এবং ছেলে শিশু ৯৪।


শিবিরের বাসিন্দারা জানান, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, সমন্বয়ের অভাব এবং অনিবন্ধিত শিবির হবার কারণে বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি ছাড়া অন্য কারো সাহায্য পৌঁছে না সেখানে। মিয়ানমারে মসজিদে ইমামতি করতেন সামশুল আলম। এখন তিনি ওই শিবিরের বাসিন্দা।


তিনি জানান, রেডক্রিসেন্টের পক্ষ থেকে শিবিরের বাসিন্দাদের চাল, ডাল, ভোজ্য তেল দেয়া হয়। কিন্তু এগুলো খেতে যে তরি-তরকারি লাগে, তার কথা তো কেউ ভাবে না। তিনি বলেন, আমাদের কাছে বার্মিজ টাকা আছে। কিন্তু এই টাকা বাংলাদেশে চলে না। তাই চাহিদা অনুযায়ী কিছুই কিনতে পারি না।


রবিবার ওই শিবির পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে, অসংখ্য শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছে এখানে- ওখানে। উদোম শরীর। আগুন্তক দেখলেই এসে জড়ো হচ্ছে কিছু পাবার আশায়। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল, ওপারেও ছিল না লেখাপড়ার কোনো অধিকার। এপারে এসেও শিক্ষার ছোঁয়া নেই ওদের জীবনে। সুযোগ নেই খেলাধুলা কিংবা লাফিয়ে-দাপিয়ে বেড়ানোরও। খাড়া পাহাড়ের ঢালে মাথার উপর পলিথিন, চারপাশে পলিথিনে ঘেরা ১২ বাই ১৭ ফুটের ঘরে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শংকা মাথায় নিয়ে কাটছে এই ১৭১ শিশু-কিশোরের।


এছাড়া পানি ও স্যানিটেশনের প্রকট সংকট বাহির মাঠ ক্যাম্পে। রেডক্রিসেন্টের বসানো একটি মাত্র নলকূপেও পানি ওঠে না। তাই পাহাড়ি ছড়ার মুখে মাটির বাঁধ দিয়ে তৈরি করা জলাধারই ওদের একমাত্র সম্বল।


নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সদর থেকে লেম্বুছড়ি- দোছড়ি হয়ে যেতে হয় বাহির মাঠে। রাস্তাটি দুর্গম হওয়ার কারণে এখানে বেসরকারি সাহায্য পৌঁছে না বললেই চলে।



দোছড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদেশি নাগরিক, দাতা সংস্থা বা মিশনারিদের প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় দাতা সংস্থাগুলো বাহির মাঠ পশ্চিম শিবির পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং দুর্গম সড়ক ব্যবস্থা হওয়ায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অপছন্দের তালিকায় এই ক্যাম্প।


তিনি আরো জানান, কয়েক মাস আগে এইচবিবি বিশিষ্ট নাইক্ষ্যংছড়ি-দোছড়ি সড়কের ইট তুলে খোয়া/কংকর দিয়ে সাব-বেজ নির্মাণের কাজ চলমান থাকায় এই সড়কে ছোট ছোট গাড়ি এবং মোটরসাইকেল চালানোও কষ্টকর। এই অবস্থায় স্থানীয় মানুষরাও বাহির মাঠ শিবিরে গিয়ে সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য দেয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে।


বিবার্তা/নয়ন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com