‘ধনিক শ্রেণির আশ্চর্য স্বার্থপরতা ও রাষ্ট্রের বিস্ময়কর সমন্বয়হীনতা: দুর্ভাগা অসচেতন বাঙালি’
প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০২০, ১৬:৪০
‘ধনিক শ্রেণির আশ্চর্য স্বার্থপরতা ও রাষ্ট্রের বিস্ময়কর সমন্বয়হীনতা: দুর্ভাগা অসচেতন বাঙালি’
জাকিয়া সুলতানা মুক্তা
প্রিন্ট অ-অ+

জনগণ এবং জনগণের প্রতিনিধি ও জনগণের সেবকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত। যথাসময়ে প্রস্তুতি সম্পন্ন না করে রাখায় এবং অতিপ্রাকৃত শক্তির উপর ভরসা রাখার ব্যাপক প্রচারণায় সাধারণ জনগণ এখনও কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ বিস্তার ও বীভৎস স্বরূপ সম্পর্কে অনুমানই করতে পারছে না। হালকা মেজাজে আছে অধিকাংশই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটা গোটা পৃথিবীর মানব সমাজের জন্য ভয়াবহ আশনিসংকেত নিয়ে হাজির হয়েছে, যেন কেউ সেভাবে টেরও পাচ্ছে না।


প্রধানমন্ত্রী থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, কোন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যাপারে সচেতন নয়; যা খালি চোখে আমরা দেখতে পাচ্ছি সবাই। ছিন্নমূল মানুষেরা চিন্তিত তাদের খাওয়া পড়ার কী হবে তাই নিয়ে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক। কেউ তাদের দায়িত্বও নিচ্ছে না, এটা আরো অমানবিক। এত এত কলকারখানা, বাণিজ্যিক-স্বেচ্ছাসেবী-সমবায় প্রকল্প, সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন; কারোর পক্ষ থেকে সেই আকারে কোন বাস্তবিক ঘোষণা আসছে না ক্রান্তিকালে দেশের মানুষগুলোর জন্য কিছু করার। বড় বড় সব কোম্পানিগুলোর মালিকপক্ষ নিশ্চুপ! কারোর যেন কোন হেলদোল নাই। কেউ দায়িত্ব নিবে না এদেশের মানুষগুলোর। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা এদেশের মানুষগুলোর থেকে মেরে বিদেশে পাচার করছে, মহোৎসবে মাতছে নিজেদের ভোগ-বিলাসের আনন্দ আয়োজন করে; কিন্তু এই সংকটের মুহুর্তে সরকার, দেশ তথা দেশের মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর কোন ইচ্ছাই প্রকাশ করছে না।


এমনকি শান্তিতে নোবেল পুরুষ্কার বিজয়ী ড.ইউনুস থেকে থেকে শুরু করে হালের মোটিভেশনাল স্পীকার রুবানা হক পর্যন্ত স্পিকটি নট! উলটো গতকাল দেখলাম~ গার্মেন্টস মালিকদের পক্ষ থেকে কী ন্যক্কারজনক নগ্ন উচ্চারণে সরকারকে চাপে রাখতে উদ্যোগী এই বিজিএমইএ-র বর্তমান সভাপতি। উনি দেশের গরীব-অসহায় বারো লাখ পোশাক শ্রমিকদের কারখানায় এই দুর্যোগের মুহুর্তেও কাজ করতে বাধ্য করছে বা মালিকদের তা করাতে উদ্বুদ্ধ করছেন। শ্রমিকরা জিম্মি ওনাদের কাছে! কোথায় ছিন্নমূল মানুষেরা সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকবে, তা না...ওনারা, এই ধনী পোশাক খাতের মালিকরা নাকি আকূল হয়ে তাকিয়ে আছেন সরকারের দিকে! যদিও ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তাদের ব্যবসার অনুকূলে সিদ্ধান্ত এসে গেছে।


ওনারা এরপরেও শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভীতি সৃষ্টি করে, সরকারের কাছ থেকে কোন সুবিধা আদায়ের হিসাব-নিকাশে আছেন। কিন্তু কারোর কাছ থেকে এ পর্যন্ত গরীব-দু:খী মানুষগুলোর জন্য কোন অনুদানের ঘোষণা পেলাম না এখনও। কেউ না! যেন তারা কেউ কোনদিন লাভে কোন ব্যবসাপাতি করেন নাই, এতদিন যা যা আর্থিক অর্জন, তা সবই দিনে এনে দিনে খেয়ে শেষ হয়ে গেছে তাদের। শুধু তারা কেন? কোন বড় বড় কোম্পানির মালিকের বা কোন দাপুটে সংস্থা থেকেই না কোন অনুদানের ঘোষণা এসেছে না ধণিক শ্রেণীর কোন ব্যক্তি পর্যায় থেকে। না কোন শেয়ার ব্যবসায়ী হর্তাকর্তাদের কাছ থেকে। দেশী-বিদেশী কোন পক্ষ থেকেই না। আর এটাই হলো 'ধনীদের চরিত্র'! রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ার সব কয়টা! ভাগ্যিস এই দেশের জনগণ আবোল-তাবোল বুঝ দিলেই শান্ত হয়ে থাকে, নইলে এদের কী যে হতো!!


এদিকে সরকারের অবস্থা এই মুহুর্তে নাজেহাল। কান্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যের কারণেই হোক কী এই দেশ এখন সম্পূর্ণ আমলাদের প্রভাবেই পরিচালিত হয়ে থাক, গতকাল মন্ত্রী পরিষদ সচিবের কাছ থেকে এলো বাংলাদেশের ‘সাধারণ ছুটি' ঘোষণা! যদিও আসা উচিৎ ছিলো ‘লক ডাউন' এর ঘোষণা, নির্দেশনা দেয়ার দরকার ছিলো ‘আইসোলেশন'-এ থাকার। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি সঙ্গনিরোধ পরিস্থিতিতে আতঙ্কগ্রস্ত না হওয়ার জন্য বিশেষ ত্রাণ কার্যক্রম ঘোষণার পরিকল্পনার উপস্থাপনও জণসাধারণের কল্যাণে করা জরুরি ছিলো। তাতো হয়ইনি, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এলো একজন সচিবের মুখ থেকে; কোন জনগণের প্রতিনিধি রাজনৈতিক নেতার মুখ থেকে নয়।


যাক! এদেশে জনগণের জন্য কোন না কোন পক্ষ তো অন্তত কাজ করছে, এতেই জনগণ খুশি। কিন্তু না, এই বাস্তবতা কোন শুভ কিছুর ইঙ্গিত বহন করে না। এসব কথা নাইবা বলি, কিন্তু কথা হলো~ এই যে কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে মহামারীর সময়ে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা পিপিই(পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুয়েপমেন্টস) না পেয়ে হাহাকার করছেন, এই হাপিত্যেশের ঘটনা দুই-আড়াই মাস প্রস্তুতির সময় পাওয়া সত্ত্বেও কেন আয়োজন করা গেলো না? এই ব্যর্থতার দায়ভার কে নেবে? কে নেবে 'লক ডাউন', 'কোয়ারেন্টাইন', 'আইসোলেশন' শব্দগুলোর যথাযথ অনুধাবন জনসাধারণের মাঝে প্রতিষ্ঠিত না করতে পারার দায়-দায়িত্ব? কারা নেবে? কোন পক্ষ? আজকে যেখানে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরাই পিপিই পাচ্ছেন না, সেখানে অন্য যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে বের হচ্ছেন(পুলিশ প্রশাসন, ব্যাংক কর্মকর্তা, ফার্মেসীর লোকজন, কাঁচাবাজারের মানুষগুলো) তাদের কীভাবে পিপিই দিবেন? নাকি তাদের জন্য কোন পরিকল্পনাই নেই কারোর?


অথচ জনগণের চলাচল সীমিত করতে স্থানীয় প্রশাসনকে সাহায্য করতে দেশে সশস্ত্র বাহিনীকে নামানো হবে ঘোষণা এসেছে, তাদের কি পিপিই লাগবে না? এদেশে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই নেই, অন্য যারাই জনগণের সেবার জন্য এই মহাদুর্যোগে রাস্তায় নামছে; তাদের জন্যও কোন সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। কী আছে তাহলে এই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়? আর ত্রাণের ব্যাপারে তো আগেই উল্লেখ করেছি কী নিদারুণ নিশ্চুপ অবস্থা সব পক্ষ থেকে। তাই জনগণের আর কী? তারাও মহাপরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তার উপরে সব ছেড়ে বসে আছে। তাদের গালমন্দ করে আর কত? যেখানে নীতিনির্ধারকদেরই কোন হেলদোল নাই। আগ্রহ নাই এদেশের অগ্রসর ও সামর্থ্যবান কোন গোষ্ঠীর! বাস্তবতা এমন, যেন এই দেশের ক্ষমতা লাগবে তথাকথিত সবার; শুধু লাগবে না এই দেশের মানুষগুলোকে। কী দুর্ভাগ্য, কী বিস্ময়কর সমন্বয়হীনতা!


লেখক:সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ


বিবার্তা/আবদাল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com