রাতের আঁধারে ওরা কারা?
প্রকাশ : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৫৫
রাতের আঁধারে ওরা কারা?
খলিলুর রহমান
প্রিন্ট অ-অ+

প্রত্যেকেই বোরকা পরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘোরাফেরা করছেন। আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। সুযোগ বুঝে কারো সঙ্গে আলাপ করছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ টার্গেটকৃত ব্যক্তিকে বিভিন্ন ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে নিজেদের আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কারো বাসায় ফেরার কোনো তাড়া নেই। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা যায়। তবে রাত যত গভীর হয় তারাও তত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেন। সম্প্রতি বিবার্তার অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।


খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ফার্মগেট, সংসদ ভবন, বিজয় স্মরণী, বনানী, বিমানবন্দর, কারওয়ান বাজারের পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় পতিতারা প্রকাশ্যে ঘোরা-ফেরা করেন। সুযোগ বুঝে খদ্দের নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান তারা। শুধু তাই নয়, খদ্দেরদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। এমনকি অনেক সময় পতিতাদের হাতে অনেকেই লাঞ্ছিতও হয়ে থাকেন। কিন্তু নিজের নিরাপত্তা ও লজ্জার কারণে কাউকে কিছু না বলেই বা আইনের আশ্রয় না নিয়েই বাসায় ফেরেন লাঞ্ছিতরা।



অনুসন্ধানে জানা গেছে, বোরকা পরা নারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা উঠতি বয়সী যুবক ও তরুণকে টার্গেট করে থাকেন।এক পর্যায়ে তাদের ফাঁদে ফেলে কখনো রিকশায়, আবার কখনো সিএনজিতে লিফট দেয়ার কথা বলে আটকে টাকা পয়সা আদায় করে থাকেন। এছাড়াও কখনো রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও ফুটওভার ব্রিজের নির্জন এলাকায় নিয়ে যান। আবার কখনো পার্কে ও রাস্তার পাশে নিরাপদ কোনো স্থানে নিয়ে ফাঁদে ফেলা হয় এসব যুবকদের। এ সময় পতিতা নামধারী ওই নারীরা তাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেন টাকা, পায়সা ও মোবাইলসহ মূলবান জিনিসপত্র। এ অবস্থা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই।


রাজধানীর ফার্মগেট এলাকাবাসী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর ফার্মগেট বাস স্ট্যান্ড এলাকায় পতিতাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সুযোগ বুঝে বাস যাত্রী ও সাধারণ মানুষকে তারা জিম্মি করে হাতিয়ে নেন টাকা ও মোবাইল। তবে ইজ্জতের ভয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে হয় ভুক্তভোগীদের।


শুধু তাই নয়, প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করা পতিতারা অফিস ফেরত যুবকদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ কথা বলেন। আবার কেউ কেউ কথা না বলে তাদের এড়িয়ে যান। তবে কথা না বলেও কেউ কেউ বিপদে পড়তে হয়। আর বললে তাদের পাতানো ফাঁদে পা দিতে হয়।



ফার্মগেটে এমন অন্তত ২৫ নারীর একটি চক্র রয়েছে। তাদের পাতানো ফাঁদে প্রতিদিনই পা দিচ্ছেন অসংখ্য যুবক। মাঝে মধ্যে পুলিশ এসব নারীদের ধরপাকড় চালালেও ঘুরেফিরে আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠেন তারা।


শুধু ফার্মগেট নয়, একই চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর সংসদ ভবন, বিমানবন্দর, বনানী ও পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায়। সংসদ ভবনের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, খদ্দেরের জন্য বোরকা পরা নারীরা বসে আছেন। আবার কেউ কেউ দাঁড়িয়ে নিজেরা নিজের মধ্যে আলোচনা করছেন।


গত এক সপ্তাহ ধরে রাত ১২টার দিকে ফার্মগেট, বিজয় স্মরণী ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, খদ্দেরের খোঁজে বোরকা পরে এখানে-সেখানে অপেক্ষা করছেন পতিতারা। তাদের পাশেই সারি-সারি সিএনজি দাঁড়িয়ে আছে। খদ্দের এসে প্রথমে দামাদামি করেন। এরপর চূড়ান্ত হলে নিয়ে যান সিএনজিতে করে। তাদের মধ্যে অনেকেই সাধারণ মানুষকেও বিরক্ত করেন। নিবি, লাগবে বলে বিভিন্ন ইশারা দেন তারা। এতে অনেক পথচারীও বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েন।


রাজধানীর কারওয়ান বাজারস্থ পান্থকুঞ্জ পার্ক এলাকায় রাত ১০টার পর থেকেই শুরু হয় পতিতাদের আনাগোনা। গভীর রাত পর্যন্ত তারা বাংলামটর টু কারওয়ান বাজারের ফুটপাতে অবস্থান নেন। সুযোগ বুঝে খদ্দেরকে নিয়ে তারা পার্কের ভেতরে যান। সেখানে নিয়ে টাকা ও মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র রেখে খদ্দেরদের বিদায় করে দেন তারা। তবে কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে সব পতিতা এক হয়ে ওই খদ্দেরকে মারধর করেনও বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।


পান্থপথের বাসিন্দা নাইমুর রহমান (ছদ্মনাম) নামের এক যুবক বিবার্তাকে জানান, দীর্ঘদিন আগে ফার্মগেট এলাকায় জরুরি কাজে গিয়েছিলেন তিনি। এ সময় বোরকা পরা এক নারীর ফাঁদে পড়তে হয় তাকে। এক পর্যায়ে সিএনজিতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিজয় স্মরণী এলাকায় একটি আবাসিক হোটেলে। সেখানে নিয়ে তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ও দামি একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়। তবে বেশি কথা বললে তাকে পুলিশে দিয়ে দেয়া হবে বলেও হুমকি দেয়া হয়। পরে ভয়ে আবুল হোসেন নিঃস্ব হয়ে বাসায় ফেরেন।


আব্দুর রহিম নামের পথচারি বিবার্তাকে বলেন, ওরা সুযোগ বুঝে ইশারা দেন, নানান রকম অশ্লীল কথাও বলে।



তাদের এমন অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে এই প্রতিবেদকের কথা হয় আখি নামের এক পতিতার সঙ্গে। তিনি বিবার্তাকে জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই পেশায় জড়িত রয়েছেন। তবে তার পরিবারের সদস্যরা এসব কিছুই জানেন না।


তবে কিভাবে বাসা থেকে রাস্তায় আসেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটি বেসরকারী কোম্পানিতে চাকরি করি এই কথা বলে বাসা থেকে বের হই। পরে সকাল আটটার দিকে বাসায় ফিরে যাই।


এদিকে, তাদের প্রতারণা শিকার অনেকেই লজ্জা ও বাসায় ফেরার তাগিদে কেউ হয়তো পুলিশে খবর দেন না। তাছাড়া কতিপয় পুলিশ সদস্য এ প্রতারণার খবর জানলেও অজ্ঞাত কারণে ওই নারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না। তাছাড়া স্থানীয় পাতি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা থাকায় প্রতারক নারী চক্রটি প্রতিনিয়তই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে।


তবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফার্মগেট, বিজয় স্মরণী এলাকার দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তা এসআই আশরাফুল ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, এমন অভিযোগ অনেক আগেই জানা গেছে। তবে কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ দেয় না। তবে পতিতাদের গ্রেফতারে মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অভিযান শেষে আবারো চলে আসে তারা।


বিবার্তা/খলিল/উজ্জ্বল/জাই

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com