জৌলুস হারাচ্ছে টিকাটুলির ‘রোজ গার্ডেন’
প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:০৯
জৌলুস  হারাচ্ছে টিকাটুলির ‘রোজ গার্ডেন’
আদনান সৌখিন
প্রিন্ট অ-অ+

রাজনীতি বা সংস্কৃতি সব দিক দিয়েই সমৃদ্ধ রাজধানীর পুরান ঢাকা। শত শত বছরের ইতিহাস লুকিয়ে রেখেছে এর অলিগলির ভাজে ভাজে। তেমনই একটি দুইতলা ভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে টিকাটুলিস্থ কে এম দাস লেনে। স্থানীয়রা একে জমিদার বাড়ি বললেও এর আসল নাম ‘রোজ গার্ডেন’।


মুসলিম লীগ, যুক্তফ্রন্ট, আওয়ামী লীগ এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ বাংলার বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের নিয়মিত আড্ডা দেয়ার জায়গা ছিল এই রোজ গার্ডেন। কালের বিবর্তনে জৌলুস হারাচ্ছে ভবনটি, নিয়মিত তদারকি ও প্রচারের অভাবে লোক চক্ষুর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে এই কালজয়ী স্থাপনা।



প্রবেশ পথে ভেনিস মূর্তি


রোজ গার্ডেন পুরান ঢাকার টিকাটুলির কে এম দাস লেনের প্রান্তে ২২ বিঘা জমির উপর অবস্থিত। তৎকালীন নব্য জমিদার ঋষিকেশ দাস বিশ শতকের তৃতীয় দশকে (সম্ভবত ১৯৩০ সালে) গড়ে তোলেন এ গার্ডেন। উনিশ শতকের শেষের দিকে বলধার জমিদারের বাগানবাড়ি হিসেবে গড়ে উঠে এবং পরে উচ্চবিত্তদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।


বলধার জমিদার নিজে নাট্যকার ছিলেন এবং তার বাড়িতে নিয়মিত গান বাজনার আসর বসতো। ঢাকার একজন ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে হৃষিকেশ দাস একদিন বলধার এক জলসায় গেলে সেখানে নিম্ন বর্ণের হওয়ায় তাকে অপমান করা হয়। এরই ফলে একই রকম বাগান ও বাড়ি নির্মাণ করে এর প্রতিশোধ নিতে তিনি দৃঢপ্রতিজ্ঞ হন বলে কাহিনী প্রচলিত আছে। এভাবেই নির্মিত হয় রোজ গার্ডেন।


সমগ্র ভারতে অদ্বিতীয় গোলাপ বাগান সমৃদ্ধ বাড়ি হওয়ার কারণেই এর নাম হয় ‘রোজ গার্ডেন’। বেশীর ভাগ উপাত্ত থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে ১৯৩০ সালের দিকেই হৃষিকেশ এ বাগান নির্মাণ শুরু করেন। এই বাগানের জন্য তিনি চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মাটিসহ গোলাপের চারা এনে লাগিয়েছিলেন। হৃষিকেশ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুর্লভ সব গোলাপ গাছে সুশোভিত করেছিলেন এ বাগান। পুরো এলাকা সাজিয়েছিলেন ইউরোপীয় ঢঙে। ভবনটির অবাক করা নির্মাণশৈলী আর মুগ্ধ করা নকশা সবার মন কাড়ে। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন হিন্দু সমাজের উচ্চবিত্ত ও জমিদারদের আড্ডা জমতে থাকে রোজ গার্ডেনকে ঘিরে। সে সময় সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে ঋষিকেশ ও রোজ গার্ডেনের নাম। তখন বহু উৎসুক জনতা রোজ গার্ডেন দেখতে আসতেন।



রোজ গার্ডেনের নাম ফলক


কিন্তু ঋণের দায়ে তিনি তার সন্মানের প্রতীক এই জৌলুসপূর্ণ বাগানবাড়িটি মাত্র ৫ বছর পরে ১৯৩৬ সালে খান বাহাদুর মৌলভী কাজী আবদুর রশীদের কাছে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। সত্তর সালের দিকে ‘রোজ গার্ডেন’ লীজ দেয়া হয় ‘বেঙ্গল স্টুডিও’কে। ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ‘রোজ গার্ডেন’কে সংরক্ষিত ভবন বলে ঘোষণা করে। এরপর প্রথম হাত বদল হয় ১৯৩৭ সালে।


১৯৬৬ সালে আবদুর রশীদের বড় ভাই কাজী হুমায়ুন বশীর এই রোজ গার্ডেনের মালিকানা লাভ করেন। এ সময় তার নামেই রোজ গার্ডেন হুমায়ুন সাহেবের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। কাজী হুমায়ুন ১৯৭০ সালে তৎকালীন স্বনামধন্য চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লি. এর কাছে বাড়িটি ভাড়া দেন। শেষে ১৯৯৩ সালে বাড়িটির অধিকার ফিরে পান কাজী রকিব, হুমায়ুন সাহেবের পারিবারিক বংশধর। বাড়িটির বর্তমান মালিক কাজী রকিব ও তার স্ত্রী লায়লা রকিব।



রোজ গার্ডেন


এ ভবনেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন হয়। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এই বাড়িতেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান আওয়ামী লীগ) গঠনের পরিকল্পনা হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশেম এর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একাংশের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলির কে এম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্রাসাদে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সভাপতি হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।


রোজ গার্ডেনের পশ্চিম বাহু এবং উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী অংশে দুটি মূল ফটক আছে। প্রবেশ ও বাহির হওয়ার জন্য পশ্চিম দিকের ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই আছে একটি বিস্তীর্ণ খোলা প্রাঙ্গণ। এখানে মঞ্চের উপর দণ্ডায়মান আছে কয়েকটি সুদৃশ্য নারী মূর্তি। পূর্বাংশের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি আয়তাকার পুকুর। পুকুরের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মাঝামাঝি একটি করে বাঁধানো পাকা ঘাট আছে। এর পূর্বাংশে আছে পশ্চিমমুখী একটি দোতলা ইমারত। এ ইমারতটির নাম হলো ‘রশিদ মঞ্জিল’। রশিদ মঞ্জিলের প্রবেশপথের অনতিদূরের সম্মুখের চত্বরে ইটও সিমেন্ট নির্মিত একটি সুন্দর ফোয়ারা দেখা যায়। সাত ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি দিয়ে রশিদ মঞ্জিলের প্রথম তলায় ওঠা যায়।



ভবনের সামনের খোলা জলাশয়


এর সামনের দিকের মাঝামাঝি অংশের প্রতি কোঠার পাশাপাশি তিনটি খিলান দরজা আছে। উপরের তলায় প্রতিটি খিলানের উপর একটি করে মশাল বেদি আছে। ‌ভবনের স্তম্ভগুলো লতাপাতার নকশা এবং রঙিন কাঁচ দিয়ে শোভিত। এর সামনে আছে উপবৃত্তাকার অপ্রশস্ত বেলকনি। এর দুপাশে একটি করে সুসজ্জিত পিলার আছে। পিলারগুলোর দুই পাশের অংশে প্রতি তলায় আছে একটি করে খিলাল দরজা। এদের প্রতিটির কাঠের পাল্লার ভেনিসীর ব্লাইন্ড ও লতাপাতার নকশা দেখা যায়। এর ছাদ একটি আধাগোলাকার গম্ভুজ ঢাকা। ইমারতটির দু-কোনে দুটি পিলার দেখা যায়। প্রথম তলায় প্রবেশের পর পশ্চিমাংশের বাঁ দিকে আছে উপরের তলায় যাওয়রা জন্য ঘুর্ণায়মান সিঁড়ি। বাইরে ও ভেতরের দিকে পুরোপুরি সাদা চুনকামে আবৃত।


এটি গত ৩ দশক ধরে নাটক ও টেলিফিল্ম শ্যুটিং স্পট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। সত্তরের দশকের জনপ্রিয় ছবি শবনম, রহমান ও গোলাম মোস্তফা অভিনিত ও মুস্তাফিজ পরিচালিত 'হারানো দিন' চিত্রায়িত হয়েছিল এ বাড়িতে। পরে এ ভবনে আরো অনেক ছবির চিত্রায়ণ হয়েছে। এই ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য এখন বিভিন্ন নাটক ও টেলিফিল্মেও দেখা যায়।


গত বছর ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ভবনটি কিনে নেয়ার কথা ছিল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের। এখানে দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক জাদুঘর ও নিয়মিত প্রদর্শনীরও প্রস্তাবনা এসেছিল। তবে সেসব কিছুই এখনো বাস্তাবিয়ত হয়নি।


স্থাপনার আশপাশের অধিবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সপ্তাহে ২/১ দিন ছাড়া এই ভবনে প্রবেশ নিষেধ থাকে, মুল ফটকে তালা দেয়া থাকে। বাড়ির মালিকগণ বছরে ২/১ বার আসলেও সাধারণ মানুষ বা পর্যটক কেউই এখানে অবাধে প্রবেশ করতে পারে না। ২/৩ বছর পর পর এটিতে রঙ করা হয়। নামমাত্র একজন কেয়ারটেকার আছেন , যার একমাত্র কাজ স্থাপনায় সাধারণের প্রবেশ ঠেকানো।



ভেতরের চক্রাকার সিঁড়ি


আরবান স্টাডি গ্রুপ ও ঢাকার ইতিহাসবিদ তইমুর ইসলাম বিবার্তাকে বলেন, এধরনের স্থাপনা দেশের ইতিহাসকে তুলে ধরার জন্য একটি রোল মডেল। এই ভবনসহ এধরনের আরো যত প্রাচীন স্থাপনা আছে সবগুলোকে সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের উচিত এটিকে একোয়ার করে এর যথাযত সংস্কার করে সাধারণ জনগেণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া। এখান থেকে যেমন পর্যটন শিল্পে আয় বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে।


স্থাপনাটির বর্তমান মালিক কাজী রকিব বা লায়লা রকিব কারো সাথেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।


বিবার্তা/আদনান/উজ্জ্বল/জাই


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com