বিউটি বোর্ডিংয়ের একাল-সেকাল !
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:০০
বিউটি বোর্ডিংয়ের একাল-সেকাল !
পুরাণ ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং
আদনান সৌখিন
প্রিন্ট অ-অ+

বুড়িগঙ্গার তীরঘেঁষা চারশ বছরের পুরনো শহর পুরান ঢাকা। কালের সাক্ষী হয়ে এখানে দাঁড়িয়ে আছে অগণিত স্থাপনা। আমাদের ইতিহাস ঘুরে বেড়ায় এখনো পুরান ঢাকার অলিগলিজুড়ে। আজ তেমনি একটি স্থাপনার গল্প ও ইতিহাস জানাব আপনাকে৷ ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাটির নাম বিউটি বোর্ডিং। বাংলাবাজারের শ্রীশ দাস লেনে অবস্থিত বিউটি বোর্ডিং। আজকের দিনে নিস্তরঙ্গ বিউটি বোর্ডিং আন্দাজও করা যাবে না এর সাথে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস।


১৯৪৭ সালের আগে এ বাড়িটিতে ছিল সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস। এখানেই মুদ্রিত হয়েছিল বিখ্যাত কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা। দেশভাগের দেয়ালে পড়ে আছে শ্যাওলা। দোতলা এ বাড়িটি দেখলে নিতান্তই সাধারণ মনে হলেও এ বাড়ির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য কিছু মানুষের ছাপ।


দেশভাগের পর যখন সোনার বাংলা পত্রিকা চলে গেল, তখন প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা এবং তার ভাই নলিনী মোহন সাহা দুজন মিলে এখানে শুরু করেন বিউটি বোর্ডিং। এটা ১৯৪৯ সালের কথা। তার আগেও বাড়িটা এমনিতেই সারাদিন গম গম করত মানুষে। রাজনৈতিক নেতারা এখানে এসে আড্ডা দিতেন। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা এসে তাদের রণকৌশল ঠিক করতেন আড্ডার আড়ালে। যখন এ বাড়িতে সোনার বাংলা পত্রিকার অফিস ছিল, তখন এখানে এসেছিলেন পল্লীকবি জসীমউদদীন, নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোসও!


বিউটি বোর্ডিং শুরু হওয়ার পর এটি হয়ে ওঠে বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র। অনেক কবি সাহিত্যিকের বেড়ে ওঠা এ বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রাঙ্গণে। কবি শামসুর রহমান বিউটি বোর্ডিং নিয়ে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে লিখেছেন,


‘মনে পড়ে, একদা যেতাম
প্রত্যহ দু’বেলা বাংলাবাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই
বিউটি বোর্ডিং-এ পরস্পরের মুখ দেখার আশায় আমরা কজন।’


আমরা ক’জন বললে হয়ত সংখ্যাটা বোঝানো যাবে না। আগে পরে এ বিউটি বোর্ডিং প্রাঙ্গণে এসেছেন এমন মানুষের সংখ্যা অনেক ৷ বিউটি বোর্ডিংয়ের ভেতরের দেয়ালে লেখা আছে সংস্কৃতি অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষের নাম, যাদের পদধূলি পড়ে এ বিউটি বোর্ডিং এ।


বোর্ডিং অফিসের দেয়ালে লাগানো পোস্টারে নাম রয়েছে কবি শামসুর রাহমান, রণেশ দাসগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, বিপ্লব দাশ, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মাহমুদ, সত্য সাহা, এনায়েত উল্লাহ খান, আল মাহমুদ, আল মুজাহিদী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ড. মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতা, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাশ, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, ইমরুল চৌধুরী, সাদেক খান, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরী, সিকদার আমিনুর হক, জুয়েল আইচসহ আরো অনেকের।


বিউটি বোর্ডিংয়ে চলছে খাবার পরিবেশন


প্রশ্ন জাগতে পারে কেন এ বাড়িটির নাম বিউটি বোর্ডিং? নলিনী মোহন সাহার বড় মেয়ের নাম বিউটি। আদরের কন্যার নামেই নামকরণ হয় বোর্ডিংটির। প্রথমদিকে দুই একটি ঘর ভাড়া দেয়া হতো আগন্তুকদের। পরে চাহিদা বাড়ায় কক্ষের সংখ্যা বাড়ানো হয়। মাত্র দুই-তিন টাকায় থাকা যেত এক রাত। খাবার মিলত এক টাকায়। স্বল্প খরচে এমন বোর্ডিংয়ে থাকতে কে না চাইবে !


দেশভাগের পর বাংলাবাজার জমে ওঠে। নতুন নতুন কবি সাহিত্যিকদের আনাগোনা বাড়ে এ অঞ্চলে। তাদের আড্ডার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় বিউটি বোর্ডিং। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চায়ের কাপ ঘুরতে থাকে, চলে অফুরন্ত আড্ডা। চায়ের কাপে ঝড় ওঠা যাকে বলে। সাথে চপ-কাটলেট থাকাটা যেন আরো লোভনীয় করে তোলে আড্ডাকে।


কবি শামসুর রাহমানরা এককালে এখানে চুটিয়ে আড্ডা মেরেছেন। তিনি থাকতেন আশেক লেনে। লক্ষ্মীবাজার থেকে আসতেন কবি শামসুল হক। কবি শহীদ কাদরির তো নিজস্ব আস্তানাই ছিল বিউটি বোর্ডিং-এর ধারে এক দালানে। বিকেল হলেই একে একে সবাই আসতেন। সঙ্গে যোগ দিতেন আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমানের মতো কবিরাও।


বিউটি বোর্ডিং সেই সময়কার উদীয়মান সৃজনশীল মানুষের আঁতুড়ঘর। এখানে বসেই অনেকে নিজের জীবনের সেরা লেখাটি লিখেছেন। আহমদ ছফার ‘স্বদেশ’ সাহিত্য পত্রিকার উত্থানও এখান থেকেই। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর পরিকল্পনা এখানে বসেই করেন আবদুল জব্বার খান।


১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর হাতে খুন হন বিউটি বোর্ডিংয়ের অন্যতম মালিক প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহাসহ ১৭ জন। রাজাকাররা দখলে নিয়ে নেয় বিউটি বোর্ডিংকে। এ পরিবার তখন প্রাণ বাঁচাতে চলে যায় ভারতে। মুক্তিযুদ্ধের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে এলে দুই ছেলে তারক সাহা ও সমর সাহাকে নিয়ে ফিরে আসেন প্রহ্লাদ সাহার সহধর্মিণী প্রতিভা সাহা। তিনি এসে আবার নতুন উদ্যমে শুরু করেন বিউটি বোর্ডিং।


স্বাধীনের পর কবি বেলাল চৌধুরী ও শহীদ কাদরি আবারো আড্ডা বসান। কিন্তু আগের মতো জমে না। পুরনো সেই দিনের কথা, পুরনো স্মৃতিই শুধু থেকে যায়। একসময় অভিমানী শহীদ কাদরি তো দেশ ছেড়েই চলে গেলেন।


বিউটি বোর্ডিংয়ে যারা আড্ডা জমাতেন তারা আজ প্রায় সকলেই পাড়ি জমিয়েছেন অন্যলোকে। কোথাও কেউ নেই এখন আর। কালের সাক্ষী হয়ে শ্রীশ দাস লেনে দাঁড়িয়ে আছে শুধু হলুদ রঙ্গা নোনা দেয়ালে জড়ানো সাথে এক চিলতে উঠান নিয়ে দাঁড়িয়ে বিউটি বোর্ডিং।


বিউটি বোর্ডিংয়ে বর্তমানে ২৭টি আবাসিক কক্ষ রয়েছে। এগুলোর কোনোটি সিংগেল বেডের আবার কোনোটি ডাবল বেডের। এগুলোর ভাড়া ২৫০ থেকে শুরু করে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।


একসময় এখানে পিঁড়িতে বসে মেঝেতে থালা রেখে খাওয়ানো হতো। বিউটি বোর্ডিংয়ের খাবারের বিশাল নাম-ডাক ছিল একটা সময়। এখনো খাবার ঘরটিতে ঢোকার সাথে সাথেই বাহারি সব খাবারের ঘ্রাণে মন ভালো হয়ে যাবে আপনার। খাবারের তালিকায় রয়েছে ভাত, ডাল, সবজি, শাকভাজি, ভর্তা, বড়া, চড়চড়ি, সরিষা ইলিশ, রুই, কাতলা, বাইলা, তেলাপিয়া, চিতল, পাবদা, ফলি, সরপুটি, শিং, কৈ, মাগুর, ভাংনা, চিংড়ি, চান্দা, বোয়াল, কোরাল মাছ, আইড় মাছের ঝোলসহ বিচিত্র পদ।


ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে খরচ করতে হবে ১৮০ টাকা। মুরগি ও খাসির মাংস ১০০, খিচুড়ি প্রতি প্লেট ৪০ টাকা, পোলাও ৫০ টাকা, সবজি ৩০ টাকা, বড়া ১০, চচ্চড়ি ৩০ আর একবাটি মুড়িঘণ্ট মিলবে মাত্র ৭০ টাকায়। এ ছাড়া এখানে ৩০ টাকা মূল্যে দই পাওয়া যায়।


সপরিবারে বিউটি বোর্ডিংয়ে ঘুরতে আসা উত্তরার হাবিবুর রহমান বিবার্তাকে বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়ে বা বর্তমান প্রজন্ম ইতিহাস বা আমাদের দেশের ঐতিহ্য সম্পর্কে অনেকটাই জানে না। আমি চেষ্টা করি সময় পেলেই পুরান ঢাকা ঘুরে যেতে। কারণ আমাদের দেশের আসল ফ্লেভার টা এখানে পাওয়া যায়। আর বিউটি বোর্ডিং এত ভালো একটা জায়গা যে এখানে আসলে যে কেউ অতীতে হারিয়ে যেতে বাধ্য। কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটা স্থাপনা সংরক্ষণে সত্যি কোনো উদ্যোগ নেই কারো। এখানে পর্যটন আকর্ষণ করার জন্য কিছু কাজ করলে ভালো হতো।


বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা নলিনী মোহন সাহার বড় ছেলে তারক নাথ সাহা


বোর্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা নলিনী মোহন সাহার বড় ছেলে তারক নাথ সাহা বর্তমানে বোর্ডিং এর সকল কাজ দেখাশোনা করেন।


তিনি বিবার্তাকে বলেন, আমাদের এখানে বাংলাদেশের এমন কোন পর্যায়ের মানুষ নেই যে আসেনি। বাংলা চলচিত্র, রাজনীতি, স্বাধীনতা সব কিছুরই সাক্ষী হয়ে আছে এটা। আমাদের এখানে থাকা-খাওয়াও অনেক সস্তা। কারো কাছে টাকা না থাকলে আমরা ফ্রি ও রাখি। ঐতিহ্য ধরে দেখে আমরা সবসময় বাঙালি খাবারই পরিবেশন করার চেষ্টা করি। ইদানীং ২টা নতুন রুম করেছি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে। তবে এখানে যারা ঘুরতে আসেন, তারা মূলত ঐতিহ্যের স্বাদ নিতেই আসেন।


সময়ের ঢেউ মানুষকে কোথায় থেকে যে কোথায় নিয়ে যায়। মান্না দে’র গানের কথা মনে পড়বে আজকের বিউটি বোর্ডিংয়ে গেলে।


এখনো এ জায়গাটায় ঘুরতে মানুষ আসে। যারা একটু উদাসী তারা এখানে এসে অনুভব করে সেই ষাটের দশকের জমজমাট উত্তাল সময়টাকে। আর মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবে, কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই।


বিবার্তা/আদনান/উজ্জ্বল/রবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com