জীবনগাড়ির চাকা
প্রকাশ : ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:১৭
জীবনগাড়ির চাকা
জে. ই. সজীব
প্রিন্ট অ-অ+

বার্ধক্য মানবজীবনের শেষ ধাপ। বার্ধক্যে পৌঁছাবার বয়স জনে জনে ভিন্ন হতে পারে। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকাল পার করে মানুষের জীবনে বার্ধক্য আসে জীবনের নিয়মেই।


একটা কথা আছে, মানুষ যখন নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তের কাছাকাছি চলে আসে তখন সে নাকি দিব্যদৃষ্টি লাভ করে। নিজের জীবনের সমস্ত ঘটনা তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি মুহূর্ত সে এক ঝলকে স্মৃতির আয়নায় দেখতে পায়। বিলীন হয়ে যাওয়ার আগে পার করে আসা জীবনের ব্যাপারে নিজের মূল্যায়ন করতে পারে বিচ্ছিন্ন চিন্তায়।


জানি না আসলেই এরকম হয় কিনা, তবে একটা ব্যাপার বুঝি, অনেক সময় মৃত্যুর শারীরিক যন্ত্রণা থেকে মানসিক যন্ত্রণা অনেক বেশি হয়, যখন কেউ কোনো অপূর্ণতা নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।


কিন্তু জীবনে কোনো অপূর্ণতা নেই, এরকম সাধু-সন্ন্যাসী কেউ কি আছে দুনিয়ায়? আমি আশপাশে যত মানুষ দেখি, সবাইকেই তো দেখি কম-বেশি হা হুতাশ করতে। এসব অপ্রাপ্তিগুলো কি জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতেও পীড়া দিতে থাকে?


ব্রুনি ওয়ের নামের এক অস্ট্রেলিয়ান লেখিকা বেশ গবেষণা করে একটা বই লিখেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, সব মানুষই নাকি মৃত্যুর আগে ঘু্রেফিরে একই রকম কয়েকটা ভুল নিয়ে আফসোস করে।


ভদ্রমহিলা পেশায় একজন নার্স, মৃত্যুর আগে প্রচুর মানুষকে সেবা দিয়েছেন, তাদের সাথে কথা বলেছেন। তাদের সে সময়ের অনুভূতি বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছেন, জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে একজন মানুষ কিভাবে নিজেকে নিয়ে, প্রিয় মানুষদেরকে নিয়ে আরও কিছুটা সময় কাটানোর, সব অপূর্ণতাকে কাটিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার তাগিদ বোধ করে।


ব্রুনি নিজের দীর্ঘ নার্সিং ক্যারিয়ারের সমস্ত অভিজ্ঞতা একসাথে করে নির্দিষ্ট করে কিছু অপূর্ণতার কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলো মৃত্যুর আগে মানুষকে সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয়।


''অন্যদের কথায় কান না দিয়ে নিজের মতো করেই যদি জীবনটা কাটাতাম, অন্যরা কি ভাবছে, তারা কি চায় সব কিছু অগ্রাহ্য করতাম!''


''সব সময় খালি অন্যদের ইচ্ছাগুলোই পূরণ করে এসেছি, নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দিকে কখনো নজর দেইনি। এসব না করে যদি নিজেকে নিয়ে পড়ে থাকতাম সবসময়। নিজের সব ইচ্ছাগুলো পূরণ করতে পারতাম, সেটাই বোধহয় ভালো হতো।''


''সারাটা জীবন এত খাটাখাটুনি করে তো কিছুই পেলাম না, এর চেয়ে আরও বেশি সময় যদি পরিবারের সাথে কাটাতাম, কাটাতাম প্রিয় মুখগুলোর সাথে, কতই না ভালো হতো!''


''কত কথা অব্যক্ত রয়ে গেলো। প্রিয়জনদের অজানা রয়ে গেলো কত অনুভূতি। কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি, যদি আর একটাবার সুযোগ পেতাম সব কিছু বলার!''


''আড্ডাপ্রিয় বন্ধুদের সাথে আর মাত্র একটা বার যদি সেই মুহূর্তগুলো ফিরে আসতো!''


জীবন নিয়ে সে যা-ই ভাবুক, আজকে যে বৃদ্ধ, তাকে নিয়ে আমার কি ভাবা উচিত সেটাই জানা দরকার। শেষ সময়ে আমাদের উচিত, তাদের মতো করেই যেন তাদের পাশে থাকি। তাদের ইচ্ছেগুলো, চাহিদাগুলোর প্রতি সম্মান রেখে।


শেষ সময়ে এসে যেন তাদের মনে আফসোসের উদয় না হয়। তিনি যেন মনে না করেন, তার জীবনের সব কিছুই ছিলো ভুলে ভরা।


তিনি জীবনের সবটুকু সময় ব্যয় করেছেন বার্ধক্যে ভালো থাকার কথা চিন্তা করেই।


শুধু মনে রাখতে হবে, এই বার্ধক্য সবার, সবার জন্যই তা বরাদ্দ। আমি এখন আমার বাবা, চাচা, মায়ের বার্ধক্য দেখি। ঠিক তেমনি তারাও তাদের বাবা-চাচাদের দেখেছেন, আমারটাও দেখবে আমার সন্তান। এভাবেই চলে জীবনগাড়ির চাকা।


শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, সে সবকিছুই আপনাকে দেখে দেখে শিখে। আপনার বাবার প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি, যে কোনো বৃদ্ধের প্রতি আপনা আচরণগুলো তারা কপি করে নিচ্ছে, আপনি যদি ভালো কিছু করেন, আপনিও ভালো কিছু পাবেন।


শরীরের চমড়া, চোখের দৃষ্টি, দেশের শক্তি, অর্থের জোর দিয়ে মানুষকে বিবেচনা করবেন না।
বিবেচনা করুন মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে।


লেখক: সমসাময়িক বিষয়ে অনলাইনে লেখালেখি করেন।


বিবার্তা/হুমায়ুন/কামরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com