আবুল হাসেমের আত্মহত্যা
প্রকাশ : ০২ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:২৫
আবুল হাসেমের আত্মহত্যা
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার
প্রিন্ট অ-অ+

আবুল হাসেম আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু কে এই আবুল হাসেম?


তিনি প্রবীণ নিবাসের এক অধিবাসী, বয়স মাত্র ৫০। প্রবীণ নিবাসের একজন সেবক জানান, নিবাসের যে কক্ষটিতে আবুল হাসেম থাকতেন সেই কক্ষে আরও তিন বৃদ্ধ থাকেন। তাদের একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ও বাকপ্রতিবন্ধী। এক রাতআটটার দিকে জানালার রডের সঙ্গে পায়ের ব্যান্ডেজের কাপড় খুলে গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন বৃদ্ধ আবুল হাসেম।


প্রবীণ নিবাসের কর্মকর্তারা জানান, ক’মাস ধরে পায়ের সমস্যায় ভুগছিলেন নোয়াপাড়া আমেনা-বশর বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা আবুল হাসেম, যা মাসখানেক আগে চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। পরে বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ তাকে চিকিৎসার জন্য পাঠায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার পায়ের অবস্থা খারাপ দেখে বাম পা’টি কেটে ফেলেন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন এক বোনও। প্রায় দু’সপ্তাহ আগে হাসেম আবার বৃদ্ধাশ্রমে ফিরলেও তাকে কেউ বাড়ি নিতে আসেনি। যদিও ফকিরটিলা গ্রামে তার স্ত্রী-সন্তান রয়েছে। দুই ছেলে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী। এক ছেলে স্থানীয় মাদরাসায় পড়ে।


নিবাসের কর্মকর্তারা আরও জানান, হাসপাতাল থেকে ফিরে বেশ কয়েকবার বাড়িতে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন আবুল হাসেম। পরে চিকিৎসাকালে পাশে থাকা বোনকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু পরে এসে নিয়ে যাওয়ার আশা দিয়ে তার সেই বোনও আর ফিরে আসেননি! এদিকে তার পায়ের ব্যথাও দিনদিন বেড়ে যাচ্ছিল। প্রায় সময় আবুল হাসেম ব্যথা সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে কান্নাকাটি করতেন।


স্থানীয় এক ইউপি সদস্য জানান, ‘কয়েক বছর আগে আবুল হাসেমের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের পারিবারিক বিষয়ে ঝামেলা হয়। সে সময় আবুল হাসেম নিজের বাড়িভিটা স্থানীয় একজনের কাছে বন্ধক দিয়েছিলেন। পরে নিজেই গিয়ে প্রবীণ নিবাসে আশ্রয় নেন। পরিবারের কেউ খবর না নিলেও মাঝে মধ্যে তার এক বোন প্রবীণ নিবাসে আবুল হাসেমকে দেখতে যেতেন। তার বাম পা কেটে ফেলার পর থেকে ডান পা-ও ধীরে ধীরে অচল হয়ে পরে। রাত-দিন পায়ের যন্ত্রণায় চিৎকার ও কান্নাকাটি করতেন তিনি। ক’দিন আগে তার বোন দেখতে এলে তিনি তাদের সঙ্গে বাড়ি যেতে চেয়েছিলেন। তারা কিছুদিন পর এসে তাকে নিয়ে যাবে বলে জানিয়েছিলেন।


তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘ চার বছর ধরে প্রবীণ নিবাসে অবস্থান করলেও তার বোন ছাড়া স্ত্রী-পুত্র কেউ তাকে দেখতে আসেনি।


কখন মানুষের বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়ে - এই প্রশ্নটা সবার হলেও উত্তরটা সবার জানা নেই। কোনো মানুষ যখন তার মৌলিক চাহিদাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষ পরিচয়টা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, পরিবারের মাঝে বাঁচতে চায়, সেই পরিচয়টাই যখন কেউ হারিয়ে বসে তখন তার কাছে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য নিঃশেষ হয়ে যায়। মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি, মানবতার প্রতি এবং নিজের সত্ত্বার প্রতি আমাদের অবহেলাই সেই ব্যবধান দূর করে দেয়। যা ঘটেছে বয়োজ্যেষ্ঠ আবুল হাসেমের ক্ষেত্রে। যখন লাশের স্বীকৃতিটিও পরিবার থেকে পাওয়া যাবে কিনা সে সঙ্কা থাকে, মানবতা ও জীবনের জন্য এর চেয়ে করুণ পরিণতি আর কি হতে পারে?


লেখক: শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক।


বিবার্তা/হুমায়ুন/কামরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com