আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের ভাবনা
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০:১৫
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের ভাবনা
মোহাম্মদ শাহী নেওয়াজ
প্রিন্ট অ-অ+

বর্তমান সমাজে বেড়েই চলছে প্রবীণ সমস্যা। প্রবীণ কারা? যাঁরা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় পিতা-মাতা,দাদা-দাদী, নানা-নানী, বড় ভাই-বোন, শিক্ষাগুরু কিংবা সমাজের শ্রদ্ধেয় গুরুজন, তাঁরাই। সামাজিক পরিবর্তন ও বিবর্তনে সমাজে দেখা যাচ্ছে নানা অসমতা। যাঁরা এ সমাজ-সভ্যতার রূপকার, যাঁদের সোনালি যৌবন উৎসর্গের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে বর্তমান আধুনিক সমাজ, তাঁরাই আজ প্রবীণ। আপনজনের শ্রদ্ধা, মমতা ও সেবা হতে তাঁরাই আজ উপেক্ষিত।


আজ ১অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। ১৯৯০ সালের ১৪ই ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ সভায় এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালের ১লা অক্টোবর হতে বাংলাদেশে এ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। আজ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন একযোগে দিবসটি পালন করবে। এবছর দিবসের প্রতিপাদ্য - 'মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রবীণদের স্মরণ পরম শ্রদ্ধায়'।


অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে প্রবীণজনসহ সমাজের সব বয়সীদের নিয়ে সুন্দর জীবন সুনিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের এ উদাত্ত আহবান।


মানবজীবনকাল স্থির নয়, কালের প্রবাহে আবর্তিত। আজকের প্রবীণ একদিন নবীন ছিলেন। বর্তমান নবীনই ভবিষ্যতের প্রবীণ। প্রবীণেরাই আমাদের জন্ম দিয়েছেন, প্রতিপালন করে বড় করেছেন, আর গড়ে তুলেছেন এই আধুনিক সমাজ ও সভ্যতা।


পূর্ণাঙ্গতা বা সম্পূর্ণতায় মানবজীবনযাত্রার সূচনা হয় না। বরং মাতৃগর্ভ বা মাতৃকোল থেকে সুনিবিড় পরিচর্যা, পরম স্নেহ-মমতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে আমাদের বেড়ে ওঠা। মানবের সুনাম, সুখ্যাতি,আদর্শিক ও আলোকিত মানুষ হওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান তাদের, যাঁরা আজ প্রবীণ। তাঁদের জীবন উৎসর্গিত আত্মসমৃদ্ধির জন্য নয়, বরং প্রজন্মের সমৃদ্ধির প্রত্যাশায়। আমাদের সকল সাফল্য, সকল অর্জনের মাঝে আছে প্রবীণের অস্তিত্ব। তাই তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, মমতা ও সেবার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা যায় প্রবীণের অধিকার।


প্রবীণ নীতিমালামতে ৬০ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সের ব্যক্তিকে প্রবীণ হিসেবে গণ্য করা হয়। বার্ধক্য বা প্রবীণ হল জীবনচক্রের শেষ ধাপ। জীবনের নাজুক ও স্পর্শকাতর অবস্থা! বেঁচে থাকলে প্রত্যেক মানুষকে বার্ধক্যের সম্মুখীন হতেই হবে। বার্ধক্য মানে শারীরিক অবস্থার অবনতি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায়। দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও হজমশক্তি লোপ পায়। ডায়বেটিক নিয়ন্ত্রণে থাকে না। রক্তচাপ ও হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। দুর্বল স্বাস্থ্য আর উপার্জনহীন একজন প্রবীণ সকলের কাছে অবহেলিত, উপেক্ষা ও দুর্ব্যবহারের শিকার। তাদের ভরণ-পোষণ, সেবা-যত্ন, চিকিৎসা ও আবাসন সমস্যা দেখা দেয়। প্রবীণদের আমরা বুঝতে চাই না। তাদের কল্যাণে কাজ করতেও চাই না। হতাশা, বিষন্নতা ও নিঃসঙ্গতায় চলে তাদের জীবন। প্রবীণ সেবা সূচকে বিশ্বে আমাদের অবস্থান ৬৭তম। যা আমাদের জন্য লজ্জার।


বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রবীণের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চিকিৎসাপ্রযুক্তির অসাধারণ সাফল্যের কারণেপ্রবীণ সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ প্রবীণ বা সিনিয়র সিটিজেন। আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা হবে প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ, ২০৫০ সালে ৪ কোটি ৫০ লক্ষ এবং ২০৬১ সাল নাগাদ হবে ৫ কোটি ৬০ লক্ষ। দেশের বর্তমান প্রবীণ বৃদ্ধির হার ৪.৪১ শতাংশ। ২০৫০ সালের দিকে এ দেশের ২০ শতাংশ নাগরিক হবে প্রবীণ। শিশু জনসংখ্যা হবে ১৯ শতাংশ। কোনো দেশের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ নাগরিক প্রবীণ হলে ওই দেশকে প্রবীণের দেশ বা বার্ধক্য জনসংখ্যার দেশ ধরা হয়। বাংলাদেশ ২০২৫ সাল নাগাদ প্রবীণের দেশে পরিণত হবে।


লক্ষণীয় হলো, বিশ্বের সর্বত্র অতি প্রবীণের (৮০+) সংখ্যা মধ্যম প্রবীণ (৭০-৮০) ও তরুণ প্রবীণের (৬০-৭০) তুলনায় দ্রুত বেড়ে চলেছে। ১৯২১ সালে এ দেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল মাত্র ২১ বছর। আমাদের বর্তমান গড় আয়ু ৭২.৮ বছরে উন্নীত। জীবনের সাথে আমরা অতিরিক্ত জীবন যোগ করতে পেরেছি। কিন্তু বাড়তি জীবনের সাথে জীবন প্রত্যাশা বৃদ্ধি করাই আমাদের চ্যালেঞ্জ।


প্রবীণদের মান্য করা, গুরুত্ব দেয়া, তাদের পরামর্শ নেয়া এবং দেখভাল করা ইত্যাদি ছিল আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য। কিন্তু জনসংখ্যা নীতি, আন্তর্জাতিক স্থানান্তর, আধুনিকায়ন, ভিন্ন সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ, যৌথ পরিবারব্যবস্থায় ফাটল, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ নানা কারণে প্রবীণ সংকটের সৃষ্টি। দেশের প্রবীণেরা যেন আজ অরক্ষিত, অসহায়, অভাবী, বিচ্ছিন্ন ও দুর্ব্যবহারে মর্মাহত।


বাংলাদেশের সংবিধান মানবাধিকারের অনন্য দলিল। সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে-“সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতৃ-পিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত আয়ত্তাতীত কারণে অভাবগ্রস্থতার ক্ষেত্রে সরকারী সহায়তা লাভের অধিকার”। বর্তমান সরকার সমাজকল্যাণবান্ধব সরকার। সাংবিধানিক দায়বদ্ধতায় ও প্রবীণকল্যাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে বিগত ১৯৯৭-৯৮ অর্থবর্ষে প্রবর্তন করা হয় বয়স্ক ভাতা কার্যক্রম। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে ৪০ লক্ষ প্রবীণের মাঝে ২,৪০০ কোটি টাকা বিতরণ করা হবে। এটি দেশের বৃহত্তম এবং জননন্দিত সামাজিক নিরাপত্তামুলক কর্মসূচী। তাছাড়া ‘বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা’ কর্মসূচীর মাধ্যমেও বিপুলসংখ্যক প্রবীণ মহিলাকে আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে।


দেশের প্রবীণদরদী রাজনীতিবিদ হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি হলেন দেশে বৃহত্তর পরিসরে সামাজিক নিরাপত্তামুলক কর্মসূচীর প্রবর্তক। তাছাড়া প্রবীণ ব্যক্তির অধিকার,আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও সার্বিক কল্যাণের লক্ষে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩’ প্রবর্তন করা হয়। সন্তান কর্তৃক পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করার জন্য প্রবর্তন করা হয়েছে ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন-২০১৩’। উল্লেখযোগ্য দিক হল সরকার কর্তৃক ৬০-উর্ধ্ব ব্যক্তিদের সিনিয়র সিটিজেন ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক ভাবনা হচ্ছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তাকৌশল হিসেবে সার্বজনীন নাগরিক পেনশন ব্যবস্থার প্রচলন। সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রবীণ কল্যাণে নবদিগন্তের সূচনা হবে।


বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ নাগরিক সমাজে প্রবীণের উপস্থিতি, ভূমিকা ও অবদান প্রশংসনীয়। বর্তমান আধুনিক সমাজ প্রবীণ সমাজের নিকট দায়বদ্ধ। গ্রামীণ পর্যায়ে প্রবীণদেরকেই আজও দেখা যায় ফলদ বৃক্ষরোপন ও গৃহস্থলীর সৌন্দর্য্যবর্ধনের ভূমিকায়। শত কষ্টেও তাঁরা প্রজন্মের তরে প্রার্থনায় রত নিরন্তর। তাঁরা আমাদের শৈশব ও কৈশোরের নিত্যসঙ্গী এবং আমাদের বর্ণিল জীবনের রূপকার। তাঁদের উৎসর্গিত সংগ্রামী জীবনের সুবিধভোগী আমরাই। প্রবীণই জীবনের চরম মুহূর্তে একান্ত ভালবাসা ও প্রেরণার শেষ আশ্রয়স্থল। তাই প্রবীণ সেবাই হোক আজকের অঙ্গীকার। জয় হোক প্রবীণের। আত্মউপলব্ধি হোক সকলের।


লেখক: সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদফতর, বিভাগীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম।


বিবার্তা/কামরুল/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com