প্রসঙ্গ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০১৮, ২০:০০
প্রসঙ্গ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন
সাব্বির খান
প্রিন্ট অ-অ+

গত বুধবার স্কুলশিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি সরকার মেনে নিয়েছে। দাবিগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক এবং বাস্তব। এগুলোর বাস্তবায়ন সরকার হয়ত করবে ঠিকই; তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে। কিন্তু এই দাবিগুলো উত্থাপনের অনেক আগেই এবং কোনো ধরনের আন্দোলন ছাড়াই ‘জনসেবা ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম’ হিসেবে সরকারের উচিত ছিল নিজ উদ্যোগেই কাজগুলোর বাস্তবায়ন করা!


এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই সরকারের নৈতিক পরাজয় হয়েছে, যা আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে! উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর মত সরকারের কিছু মন্ত্রীর দায় আবারো সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ওপরই বর্তেছে। এটা সত্যিই দুঃখজনক! তবে ছাত্রদের দাবিগুলো দ্রুত মেনে নিয়ে সরকার প্রধান যে দায়িত্বশীলতা এবং ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য!


গত বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিনদিন ধরে আন্দোলনকারীরা রাজপথে অবস্থান করছে। তাঁরা বিভিন্ন যানবহন থামিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং যানবহনের ফিটনেস কাগজপত্র চেক করছে। অত্যন্ত অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছাত্ররা গাড়িগুলোর ফিটনেস পেপার ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাচ্ছে না। ছাত্র আন্দোলন প্রমাণ করে দিচ্ছে, এতোদিন ধরে বিশেষ করে ঢাকার রাস্তায় যেসব দুর্ঘটনা এবং যানযট সৃষ্টি হয়েছে, তারজন্য এ সব ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভাররাই দায়ী।


এটাতো খুব স্বাভাবিক বিষয় যে, একজন ড্রাইভার যদি সঠিক পন্থায়, পড়াশুনা ও অনুশীলন করে রাস্তায় গাড়ি চালায়, তাহলে যখন-তখন সেই গাড়ি দুর্ঘটনায় পতিত হবে না। এমনকি একজন লাইসেন্সধারী শিক্ষিত ড্রাইভার কখনোই একটা আনফিট গাড়ি রাস্তায় চালাতে চাইবে না। সে চাইবে না তাঁর সন্তান এতিম হোক বা সে নিজে মরে যাক! গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে তিনি জেনেছেন, আনফিট গাড়ি চালালে তার পরিণতি কী হতে পারে! অর্থাৎ শিক্ষিত এবং প্রকৃত লাইসেন্সধারী ড্রাইভাররা কখনোই বিবেকহীন, সিদ্ধান্তহীন এবং ভয়ংকর হতে পারেন না। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যা দেখছি, তা সম্পূর্ণ বিপরীত এবং যে দুর্ঘটনা ঘটছে এবং যানজট হচ্ছে, তা হচ্ছে শুধুই অশিক্ষিত ড্রাইভারদের কারণে বললে হয়ত ভুল বলা হবে না।


আমি মনে করি এবং একই সাথে বিশ্বাস করি যে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং সংশ্লিষ্টতা ছাড়া ঢাকার রাস্তায় এ সব তুঘলকি কারবার সম্ভব নয়! কারণ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ই প্রতিটি গাড়ির ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করে বলেই আমি জানি।


এবার আসি অন্য বিষয়ে। প্রতিটা সৎ ও গণ-আন্দোলনের একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। তা না থাকলে সে আন্দোলনের উদ্দেশ্য এবং নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। যে আন্দোলনের ৯ দফা দাবি বিনাবাক্য ব্যয়ে এবং শর্তহীনভাবে গত বুধবার সরকার মেনে নিয়েছে, সেই একই আন্দোলন কিভাবে, কোন যুক্তিতে এরপরও চলতে পারে তা আমার বোধগম্য নয়! আমি বিভিন্ন মাধ্যমে জানার চেষ্টা করেছি, এই আন্দোলনে নতুন কোনো দাবি যোগ হয়েছে কিনা বা নয় দফা দাবি সরকার মেনে নেয়ার পরও ছাত্ররা নতুন কোনো বক্তব্য পেশ করেছে কি-না। আমার এই প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারেননি। অর্থাৎ কোনো দাবি বা বক্তব্য যোগ হয়নি!


তাহলে ধরে নিতে হবে যে, চলমান আন্দোলনটি এমন নতুন কোনো আন্দোলন, যারা রাজপথ দখল করে রেখেছে কোনো ধরনের ইস্যু ছাড়াই। দাবি মেনে নেয়ার পরেও একই ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় যদি ছাত্ররা রাজপথে থেকেও থাকে, তাহলে সে আন্দোলনকে আমি দেখতে চাই একটা ‘ইস্যুহীন অরক্ষিত আন্দোলন’ হিসেবে! আর এই ধরনেরর ইস্যুহীন অরক্ষিত আন্দোলনের চারিত্রিক একটা বৈশিষ্ট্য থাকে তাহলো, এটা যে কোনো সময় যেকোনো দিকে প্রবাহিত করা যায় বা সম্ভব হয়।



আন্দোলনটিকে সজিব এবং যৌক্তিক রাখার জন্য ছাত্ররা রাজপথে যা করছে, তা জনসাধারণের সমর্থন তো পাচ্ছেই, একই সাথে পরিবহন খাতে সরকারের এক ধরনের দুর্নীতির চিত্রও ফুটিয়ে তুলছে। আমার ধারণা এতে সরকারও যথেষ্ট বিব্রত! ইতোমধ্যে শুনেছি যানবহন ও পরিবহন শ্রমিকরা মালিক পক্ষের সাথে একজোট হয়ে ধর্মঘট ডেকেছে। তাঁদের ধর্মঘট সরকারের বিরুদ্ধে নয়; আবার ছাত্র আন্দোলনের পক্ষেও নয়। পক্ষে-বিপক্ষে না হলেও মালিক-শ্রমিকদের যৌথ ধর্মঘট জনজীবনকে করে তুলছে দুর্বিসহ। বাংলাদেশের স্বাভাবিক প্রবণতায় সে দোষ এবং দায়ও পড়বে সরকারের ওপর।


একটু আগে যা বলছিলাম, একটা ইস্যুহীন অরক্ষিত আন্দোলনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে যেকোনো সময় যে কেউ এটাকে মন মতো চালনা করতে পারবে এবং এর গায়ে যে কোনো ইস্যুর রং চড়িয়ে চালিত করতে পারবে! বর্তমান সরকারের শত্রুর অভাব নেই! অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা শত্রুরা যদি অরক্ষিত আন্দোলনের কোনো এক চরম মুহূর্তে এটাকে সরকারবিরোধী বা সরকার হটানোর আন্দোলনে রূপ দেয়, তাহলে খুব বেশি অবাক হবো না!


সরকারের উচিত সার্বিক পরিস্থিতি ঠাণ্ডা মাথায় পর্যালোচনা করে এবং কোনো ধরনের অহংবোধকে প্রশ্রয় না দিয়ে কর্তব্য মাফিক পরিস্থিতিকে সামাল দেয়া। ভুলে গেলে চলবে না যে, লাশের রাজনীতি বাংলাদেশে বরাবরই জনপ্রিয় রাজনীতি যা ভয়ংকর পরিণাম ডেকে আনে। ইস্যুবিহীন অরক্ষিত আন্দোলন থেকে উদ্ভুত যে কোনো পরিস্থিতির মাসুল সরকারকে দিতে হতে পারে।


লেখক : বিশ্লেষক ও সাংবাদিক


বিবার্তা/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com