বাঙ্গালী ও বাংলার মুক্তির সনদ ৬ দফা
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০১৮, ১৪:০৭
বাঙ্গালী ও বাংলার মুক্তির সনদ ৬ দফা
সুমনা আক্তার লিলি
প্রিন্ট অ-অ+

ঐতিহাসিক ৭ জুন ছয় দফা দিবস। বাঙালির মুক্তিসনদ ৬ দফা আন্দোলনের রক্তঝরা দিন।


১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ৬ দফা দাবির পক্ষে সারাদেশে পালিত হরতালের ভেতর দিয়ে সারা বাংলায় এক বিপুল গণআন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। সেদিন বাঙালি স্বাধিকার ও বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দীর মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী হরতাল পালন করেছিল। সেদিনের হরতালে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে প্রাণ দেন তেজগাঁওয়ের মনু মিয়া, আবুল হোসেন ও আদমজীর মুজিবুল্লাহসহ ১১ জন শ্রমিক। সেদিন প্রায় ৮০০ রাজনৈতিক নেতা-কর্মিকে গ্রেফতার করা হয়।


সেদিনের শহীদদের রক্তের পথ বেয়ে শুরু হয়েছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন।


ছয় দফা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উল্লেখ করেন, ''সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য।'' এ ছয় দফা ঘোষণার মাধ্যমে কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাঙালি তার মুক্তির ঠিকানা খুঁজে পায়। বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা হয়ে ওঠে ম্যাগনাকার্টা, আংশিক নয়, পূর্ণ স্বাধীনতাই ছিল যার অনিবার্য গন্তব্য।


সেই আন্দোলন বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে বেগবান ও নতুন মাত্রা দান করে। পর্যায়ক্রমে এই আন্দোলনই স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ৭ জুন ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।


১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা এ রকম :


দফা- ১ :
শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি


দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমন হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের (Legislatures) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম। এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের সরাসরি ভোটে।


দফা- ২ :
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা


কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবলমাত্র দু'টি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে। যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।


দফা- ৩ :
মুদ্রা বা অর্থ-সমন্ধীয় ক্ষমতা


মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দু'টির যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে -
(ক) সমগ্র দেশের জন্যে দু'টি পৃথক অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।
অথবা
(খ) বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবল একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে, যাতে করে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।


দফা - ৪ :
রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা


কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনোরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ-রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।


দফা- ৫ :
বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা


(ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।
(খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে।
(গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোনো হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।
(ঘ) অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কো্নো বাধা-নিষেধ থাকবে না।
(ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব-স্বার্থে বানিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।



দফা ৬ :
আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা


আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।


এ দফাগুলো পড়লে যে কোনো চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই দেখতে পাবেন যে, এর মর্মমূলে লুকিয়ে আছে স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। জ্ঞানপাপীরা না বুঝলে বা না-বোঝার ভান করলেও সাধারণ মানুষের বুঝতে একটুও দেরি হয়নি। তাই তো তারা ছয় দফার পথ ধরে ১৯৭১এ চূড়ান্ত মুক্তির লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে একয়ুও দ্বিধা করেনি।


আজকের দিনে ৬ দফা বাস্তবায়নে যারা জীবন দিয়েছেন সকল শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।


লেখক : সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com