কেন আওয়ামী লীগকে আরো দু' টার্ম ক্ষমতায় চাই
প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৮, ১৬:৫৮
কেন আওয়ামী লীগকে আরো দু' টার্ম ক্ষমতায় চাই
কাজী জাবের উদ্দিন
প্রিন্ট অ-অ+

এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা সরকার ও আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ছাড়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক মানুষের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই। অবশ্য দীর্ঘকাল ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগেও এখন হাইব্রিড ও নব্য ধনীদের ভিড়। নেতৃত্বের একটা ছোটো অংশ দ্বারা দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে । তারপরও আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই দলকেই সমর্থন করতে হবে।


প্রসঙ্গক্রমে বলি, ব্রিটেনের এক নামকরা সাংবাদিক চার্চিলকে দুই চোখে দেখতে পারতেন না। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে সেই সাংবাদিকই অন্ধভাবে চার্চিলকে সমর্থন দান শুরু করেন। কারণ জিজ্ঞেস করা হলে বলেছিলেন, ‘'এই মুহূর্তে ফ্যাসিবাদের হামলা থেকে ইউরোপ ও মানবতাকে রক্ষার জন্য চার্চিল ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তিত্ব দেখছি না।'' এ জন্য চার্চিলের অনেক সমালোচকও এখন পর্যন্ত স্বীকার করেন, চার্চিল ব্রিটেনের ‘সেভিয়ার অব দ্য নেশন’।


আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কারো সঙ্গে তুলনা করছি না, কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি যে বাংলাদেশের জন্য তিনি সেভিয়ার অব দ্য নেশন। তাঁর সমালোচনা অনেকেই করতে পারেন; কিন্তু তিনি যে নব্য ফ্যাসিবাদী ও হিংস্র মৌলবাদের কবল থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছেন এবং এখন পর্যন্ত রক্ষা করে চলেছেন - এ কথাটি স্বীকার করতেই হবে | আমি শুধু স্বীকারই করি না, বিনা দ্বিধায় সমর্থন করি। আমার সঙ্গে দলের সম্পর্ক কী, তা বিচার করি না।


বঙ্গবন্ধুহত্যা ও বাংলাদেশে নব্য ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতির ডানে-বাঁয়ে কোনো দিকে আশার আলো দেখেনি এ দেশের সাধারণ মানুষ । দেশে নবীন-প্রবীণ অনেক যোগ্য নেতা ছিলেন। আওয়ামী লীগে ড. কামাল হোসেনসহ বড় বড় নেতা তখনো ছিলেন। ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের সময় মওলানা ভাসানীর মতো গণমানুষের প্রবীণ নেতাও বেঁচে ছিলেন। কিন্তু কেউ জিয়াউর রহমানের রক্তাক্ত ক্ষমতা দখলকে প্রতিহত করার জন্য এগিয়ে আসার সাহস দেখাননি। ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা বেনিতো মুসোলিনির মতো জিয়াউর রহমান বিনা বাধায় ক্ষমতা দখল করেছেন। পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুবের কায়দায় একটি পুতুল পার্লামেন্ট গঠন করে তাকে বহুদলীয় গণতন্ত্র নাম দিয়েছেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল স্তম্ভগুলো একে একে ভাঙার ব্যবস্থা করেছেন।


বাংলাদেশে নব্য ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয় হিংস্র ধর্মীয় মৌলবাদ। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলারের সাহায্যে এই মৌলবাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের দিকে এগোয়। ঠিক এই সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আবির্ভাব। কৈশোর থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি তখন একজন স্ত্রী, মা ও গৃহিণী। দেশের এক বিপজ্জনক অবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানের অভিজ্ঞতা তাঁর ছিল না। কিন্তু পিতার মতো অসীম সাহস দেখিয়ে তিনি এই নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরবে - এ কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি।


অবশ্যই একজন সরকারপ্রধান হিসেবে তাঁর কিছু ভুলত্রুটি থাকতে পারে; কিন্তু আমি তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার একজন অনন্য নেত্রী হিসেবে দেখি ; তাঁর সততা, সাহস ও সেই সাহসের দ্বারা অর্জিত সাফল্যগুলোর জন্য। তাঁর জীবনের ওপর ছোট-বড় হামলা হয়েছে অন্তত সাত-আটবার। এর পরও তিনি ভয় পাননি। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড দিয়েছেন। এই একটি মাত্র কারণে তিনি ইতিহাসে একটি স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।


বঙ্গবন্ধু যদি বাংলাদেশকে স্বাধীন করে থাকেন, তাহলে শেখ হাসিনা স্বাধীনতার কাঠামোটিকে অন্তত ঘরের ও বাইরের শত্রুর পৌনঃপুনিক হিংস্র ছোবল থেকে জীবন বাজি রেখে রক্ষা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কর্নেল ফারুক বা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী নিজামী-মুজাহিদদের বাংলার মাটিতে বিচার ও দণ্ড হবে - এ কথা কেউ ভাবার সাহসও পায়নি। এখন শেখ হাসিনা সম্পর্কে যে যা-ই বলুক, বাংলাদেশে ধর্মান্ধতার রাজনীতির বিষদাঁত তিনি ভেঙে দিয়েছেন। ভারতে বড় বড় নেতা ও বড় বড় গণতান্ত্রিক দল এই বিষদাঁত ভাঙতে পারেনি। ফলে ভারতের মতো প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশেও উগ্র হিন্দুত্ববাদ ক্ষমতা দখল করতে পেরেছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা একাই সব চক্রান্তের মুখে ধর্মীয় জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখল ঠেকিয়ে রেখেছেন, এটা কি তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য। তাঁর এই সাফল্য স্থায়ী যাতে হয় সে জন্য তাঁর সরকারের আবারও ক্ষমতায় থাকা উচিত।


বিএনপি-জামায়াত সরকার দেশটাকে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও ধর্মান্ধতার যে বেড়াজালে আটকে ফেলেছিল, তা থেকে দেশকে মুক্ত করার পর দীর্ঘকালের সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের জঞ্জালমুক্ত করার কাজে শেখ হাসিনার অন্তত আরো দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকা উচিত। ব্রিটেনে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসে এ ধরনের কথা বলেছিলেন টোরি প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার। তিনি বলেছিলেন, ‘ব্রিটেনের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে জঞ্জালমুক্ত করার জন্য আমাকে সময় দিতে হবে এবং তিন টার্ম ক্ষমতায় থাকতে দিতে হবে।’ ব্রিটেনের মানুষ তাঁকে তিন টার্ম ক্ষমতায় রেখেছিল।


শেখ হাসিনা সরকার দুই টার্ম ক্ষমতায় থাকার কারণে দেশের অতুলনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাতে পেরেছেন। দেশে হিংস্র মৌলবাদের উত্থান ও ক্ষমতা দখল রুখে দিয়েছেন। এর ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তাঁর অন্তত আরো দুই দফা ক্ষমতায় থাকা উচিত। তাই আগামী সাধারণ নির্বাচনেও শেখ হাসিনার ক্ষমতায় অবস্থান আমি প্রত্যাশা করি। ২০১৪ সালের নির্বাচনের বিরুদ্ধে আমাদের তথাকথিত সুধীসমাজ যা-ই বলুক, এই নির্বাচনে গণতান্ত্রিকব্যবস্থা একটু খর্ব হয়েছে হয়তো; কিন্তু বাংলাদেশ আফগানিস্তানে পরিণত হওয়ার ভয়াবহ আশঙ্কা থেকে রক্ষা পেয়েছে।


উপমহাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। পাকিস্তানে মধ্যযুগীয় ধর্মান্ধতা শক্তিশালী হয়ে ওঠায় গৃহযুদ্ধ চলছে, মুসলমানদের হাতে মুসলমান নিহত হচ্ছে, মসজিদ-মাদরাসা ধ্বংস হচ্ছে। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ক্ষমতা দখল করেছে। একমাত্র বাংলাদেশে এই ধর্মান্ধ ফ্যাসিবাদ সম্পূর্ণ নির্মূল করা না গেলেও তার উত্থান প্রতিহত করা গেছে।


বাংলাদেশ যে তার অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন সত্তা এখনো নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে টিকিয়ে রাখতে পেরেছে তার কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। বাংলাদেশের এই অসাম্প্রদায়িক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই হাসিনা সরকারের আগামী নির্বাচনেও জয়ী হয়ে ক্ষমতায় থাকা উচিত।


আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার আবির্ভাব না হলে পঁচাত্তরের ঘাতক ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড দেওয়া সম্ভব হতো না। আওয়ামী লীগ বিভক্ত হতো, দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে থাকতে পারত না। সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন আরো দীর্ঘস্থায়ী হতো; বিএনপি-জামায়াতের শাসনে বাংলাদেশ আবার একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত হতো। তালেবান, আল-কায়েদার উত্থান প্রতিহত করা যেত না। পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো বাংলাদেশও একটি কিলিং ফিল্ডে পরিণত হতো। আমেরিকা, ন্যাটো, এমনকি ভারতও বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ পেত। গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসত না। অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটানো যেত না। ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা কয়েকটি সমস্যার সমাধান হতো না। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মান ও মর্যাদা বাড়ত না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশ উন্নয়নের একটি মডেল কান্ট্রি হিসেবে বিবেচিত হতো না। সর্বোপরি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা যেত না।


শেখ হাসিনার সরকারের এ রকম অনেক সাফল্য তাঁর ব্যর্থতাগুলোকে ঢেকে ফেলেছে। এই সাফল্যগুলোকে স্থায়ী করা ও ধরে রাখার জন্যই এই সরকারের আরেক টার্ম ক্ষমতায় থাকা জরুরি।


কথায় বলে, দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকলে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে দুর্নীতি বাড়ে। আওয়ামী লীগ আরো এক টার্ম ক্ষমতায় থাকলে দুর্নীতির প্রকোপ একটু বাড়তে পারে, কিন্তু দেশের গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা যদি রক্ষা পায় এবং বর্তমান আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে, সবার ওপরে উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যদি বজায় থাকে, তাহলে দুর্নীতি একটু-আধটু বাড়ল কি কমলো, তাতে ক্ষতি নেই।


ব্রিটিশ ক্যাপিটালিজম ও ব্রিটিশ এম্পায়ার তো গড়ে উঠেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির যথেচ্ছ লুটপাট ও দুর্নীতির মাধ্যমে। বাংলাদেশে তেমন দুর্নীতি ও লুটপাট আমরা কেউ চাই না। না চাইলে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের শাসন অনেক উত্তম। বাংলাদেশে এখন নব্য পুঁজিবাদের দাপট চলছে। আওয়ামী লীগও তাতে প্রভাবান্বিত। কিন্তু এই মুহূর্তে এই দাপট নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল নেই। তাই দেশের শাসনক্ষমতায় আওয়ামী লীগের আরো দুই দফা অবস্থান সমর্থন করি।


লেখক : ব্যবসায়ী


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com