আসুন, সবাই রুখে দাঁড়াই
প্রকাশ : ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ১৮:১৩
আসুন, সবাই রুখে দাঁড়াই
আসিফ তালুকদার
প্রিন্ট অ-অ+

প্রত্যেকটি জিনিসের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। সেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মাত্রাটা আসলে কতো সেটি জানা ও বোঝাটা জরুরী।


পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বলে শুরু করার একটি কারণ রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব প্রসারের ফলে আমাদের বিশ্বটা এখন অনেক ছোট হয়ে এসেছে। আর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো এর নেতিবাচক ব্যবহারের মাধ্যমে কু-স্বার্থ চরিতার্থ করার একটা বিশাল সুযোগ মানুষের হাতের নাগালে চলে এসেছে।


বর্তমানে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার যেমন শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে অপরিসীম ভূমিকা রাখছে, ঠিক তেমনি এটি ব্যবহার করে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে জাতির মেরুদণ্ড ভাঙার সুক্ষ্ম পাঁয়তারাও চলছে।


বিগত কয়েক বছর পিইসি (প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী), জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে এবং তা বিভিন্ন সময়ে প্রমাণিতও হয়েছে। এমনকি প্রশ্ন জালিয়াতির সাথে জড়িত অনেককেই জালিয়াতির সরঞ্জামসহ হাতেনাতে আটকও করা হয়েছে।


আসলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন সেই প্রযুক্তির ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ। তাহলে জালিয়াত চক্র যতো কৌশলীই হোক না কেন, রক্ষা পাবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে যে কোনো অপরাধ দমন করতে পারে। তার প্রমাণও ইতোমধ্যে তারা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি জালিয়াতির দুই মূল হোতা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হয়েছে এমন সাতজন গ্রেফতার হয়েছে।


শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে এবং সেজন্য শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সকলে নিন্দিত হচ্ছেন। অথচ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে দেশের সাধারণ মানুষেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। জানতে ইচ্ছা হয়, প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করার আগে আমরা কেউ কি প্রশ্ন ফাঁস প্রতিরোধে কোন ভূমিকা রাখতে পেরেছি?


অবাক লাগে সেসব পরিবারের কথা ভেবে, যারা লাখ লাখ টাকা খরচ করে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সন্তানের হাতে তুলে দেয়। একটা সময় বাবা-মা পরীক্ষার আগে বাচ্চাদের নতুন কলম, স্কেল, জ্যামিতি বক্স, এক্সাম বোর্ড ইত্যাদি কিনে দিত। আর এখন তারা প্রশ্ন কিনে দিয়ে সন্তানদের বড় বড় প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে গর্ব করে। আফসোস হয় এসব অভিভাবকের কথা ভেবে, যারা জেনেশুনেই সন্তানদের ধ্বংসের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে এবং ভঙ্গুর করছে জাতির মেরুদণ্ড। গ্রামের মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীটি উচ্চ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ফাঁসকৃত প্রশ্নের কাছে।


যারা প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত তারা নিশ্চয়ই ভিনগ্রহ থেকে আসেনি। তারা আমাদের ভেতরে থেকেই এই ঘৃণ্য কাজ করে চলেছে। একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব এই চক্রকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করা।


অপরদিকে শিক্ষা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ শুধু অপরাধীদের সনাক্ত করার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকলেই হবে না। যে গাছটি কাটলে তার মূল থেকে আবার গাছ জন্মানোর সুযোগ থাকে, শুধু সেই গাছটি কেটে ফেললেই সমাধান আসবে না, সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে সেই গাছটিকে মূলসহ উপড়ে ফেলতে হবে।


প্রশ্ন ফাঁসের সাথে নিশ্চয়ই কোনো একক ব্যক্তি জড়িত নয়। এই চক্রের চেইন অনেক বড় এবং সেই চেইনের মূলে গিয়ে অপরাধীদের সনাক্ত করে তাদের তথ্যের ভিত্তিতে যদি সমস্যার মূল হোতাকে বিচারের আওতায় আনা না যায় তাহলে প্রশ্ন ফাঁস সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।


যে প্রজন্ম এগিয়ে যাবে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে, সেই প্রজন্মকে যদি শিক্ষা গ্রহণের প্রারম্ভে শিক্ষার নামে কু-শিক্ষার অন্ধকার নিমজ্জিত করা হয় তাহলে বড় বড় সার্টিফিকেটধারী এই প্রজন্ম একসময় জাতি গঠনের পথে সব থেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।


প্রশ্ন যারা ফাঁস করছে এবং যারা ফাঁসকৃত প্রশ্ন কিনে সন্তানদের দিচ্ছে তারা সবাই সমান অপরাধী। অপরাধীদের দমন করা যেতে পারে সাময়িক সময়ের জন্য সাময়িক শাস্তি দিয়ে। কিন্তু কিছু অপরাধকে নির্মূল করতে হলে তার নাড়িনক্ষত্র জানতে হবে এবং বের করতে হবে এর মূলে কে বা কারা রয়েছে। অনেক সময় মানুষ কি বলবে সেই ভয়ে অনেক অপরাধ দেখেও প্রশ্রয় দেয়া হয় এবং এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়টিকে যদি এড়িয়ে যাওয়া হয় তাহলে এক সময় ফাঁসকৃত প্রশ্নে শিক্ষিত প্রজন্মই প্রশ্ন ফাঁসের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের ভার সইতে পারবে না। আর এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি।


অনেক দিন ধরে জ্বলতে জ্বলতে সৃষ্ট দাবানলসম অপরাধ দমনে আমরা সবাই যদি একসাথে দাঁড়াতে পারি তাহলে যে কোনো অপরাধ আমাদের সামনে পরাভূত হতে বাধ্য। আমরা শূন্য থেকে শুরু করে আজ একটি গর্বিত জাতি। আমাদের সমাজ থেকে সব অপরাধ হয়তো একদিনে নির্মূল হবে না, কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের মতো জাতি ধ্বংসকারী অপরাধ নির্মূলে আমরা সবাই আন্তরিক ও সক্রিয় হলে এ অপরাধ সমূলে উৎপাটিত হবেই।


লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, শহীদ সা‌র্জেন্ট জহুরুল হক শাখা


বিবার্তা/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com