এম আর খান স্মরণে
প্রকাশ : ০৫ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:০৭
এম আর খান স্মরণে
আতাউর রহমান কাবুল
প্রিন্ট অ-অ+

প্রতি বছরই এম আর খান স্যারের জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে কিছু না কিছু লিখতাম, আজ লিখছি স্যারের প্রথম মৃত্যুদিবসে।


যখন কাগজ-কলমের তেমন-একটা প্রচলন ছিল না, তাল পাতায় হাতের লেখা চর্চা হতো, হাড়ির কালি আর সিমপাতার রস দিয়ে বানানো কালি আর বাঁশের কঞ্চির কলমে তাল পাতায় লেখা হতো, তখনকার সময়ের ছাত্র ছিলেন শিশুবিশেষজ্ঞ, জাতীয় অধ্যাপক এম আর খান স্যার।


প্রবাদ আছে, কোন শিশু যত কান্নাই করুক না কেন, একজন মানুষকে দেখলে তার কান্না থেমে যেতো। রাতে ফোনে তিনি যখন তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন হসপিটালে ভর্তি শিশু রোগীদের খোঁজ-খবর নিতেন, তখন যদি শুনতেন কোন শিশু মারা গেছে, আর কোনো কথা না বলে রিসিভারটি রেখে দিতেন।


উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশের শিশুস্বাস্থ্যের জনক হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত, শিশুবন্ধুখ্যাত সেই জাতীয় অধ্যাপক ডা. এম আর খান স্যারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী ৫ নভেম্বর।


এম আর খান তাঁর পেনশনের টাকা দিয়ে গড়েন ডা. এম আর খান-আনোয়ারা ট্রাস্ট। দুস্থ মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা, তাদের আর্থিক-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে এ ট্রাস্টের মাধ্যমে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠেছে জাতীয় পর্যায়ের শিশুস্বাস্থ্য ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠা করেছেন শিশুস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। গড়ে তুলেছেন সাতক্ষীরা শিশু হাসপাতাল, যশোর শিশু হাসপাতাল, সাতক্ষীরা ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, রসুলপুর উচ্চবিদ্যালয়, উত্তরা উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা সেন্ট্রাল হাসপাতাল, নিবেদিতা নার্সিং হোমসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া তিনি দেশ থেকে পোলিও দূর করতে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছেন, কাজ করেছেন ধূমপানবিরোধী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠান ‘আধূনিক’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে। প্রতিষ্ঠানতুল্য এই মানুষটির জীবনী স্থান পেয়েছে কেমব্রিজ থেকে প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল হু ইজ হু অব ইন্টেলেকচুয়ালে। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক ম্যানিলা অ্যাওয়ার্ড, একুশে পদকসহ আরও অনেক পুরস্কার।


২০০৭ সালের দিকে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সস্নেহে তিনি আমায় আগলে রাখতেন। কোনো অনুষ্ঠান থাকলে তিনি আমাকে সরাসরি ফোন করতেন। হয়তোবা বিলম্বে পৌছেছি। লক্ষ্য করতাম, স্টেজ থেকে আমাকে দেখেই একটা হাসি দিচ্ছেন, বসতে ইশারা করছেন।


স্যারের জীবনী নিয়ে বই ''জীবনের জলছব'' প্রকাশ হয় ২০০৮ সালের দিকে। আমি তখন কাঠালবাগান এলাকায় থাকি। আমার আব্বা তখন কিডনি ফেইলর রোগী, সপ্তাহে দুই-তিনবার ডায়ালাইসিস নিতেন। সেন্ট্রাল হাসপাতালের সহাকারী পরিচালক ডা. ফাহিম আহমেদ রুপম ভাই একদিন বললেন, 'চলো আজ স্যারের বইয়ের প্রুফ দেখি।' চলে গেলাম সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সারারাত দুজনে মিলে স্যারের বইয়ের প্রুফ দেখলাম। আমি যতই বইয়ের ভেতরে যাচ্ছি ততই অবাক হচ্ছি। একজন মানুষের জীবন এত ঘটনাবহুল হতে পারে! বিশেষ করে বিলেতে লেখাপড়াকালীন তিনি যে কষ্ট করেছেন, তা পড়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি।


এম আর খান স্যারের পকেটে সবসময় কাঠপেন্সিল ও সাদা কাগজ থাকতো। এর কারণ জিজ্ঞেস করেছিলাম একদিন। স্যার বলেছিলেন, ‌কাঠপেন্সিল দিয়ে লিখার সুবিধা হলো কোন ভুল হলে তা মুছে আবার লেখা যায়।'


একদিন স্যারের বাসার ড্রইং রুমে বসে গল্প করছিলাম। স্যার লুঙ্গি পরে আমার সঙ্গে বসে বসে কথা বলছিলেন। আমি স্যারকে প্রশ্ন করলাম, স্যার অনেক চিকিৎসক রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে কমিশন খায়। এটাকে কীভাবে দেখেন? তিনি শুধু বললেন, 'যারা এটা করে তারা বেশি দিন টিকে থাকে না।'


২০১৩ সালে আমি বিয়ে করলাম। বিয়ে করার মাস থেকে শুরু করে বছরখানেক বেকার ছিলাম। এ সময় স্যারের সঙ্গে একদিন সেন্ট্রাল হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে চাইল্ড হার্ট ট্রাস্টের অনুষ্ঠানে দেখা। তিনি আমার কথা জেনে, সঙ্গে সঙ্গে কাঠপেন্সিল আর কাগজ বের করলেন। আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকার মালিক ও সম্পাদক কাজী রফিকুল আলম সাহেবের নিকট লিখে দিলেন একটা চিঠি । বললেন, 'তুমি ওখানে গিয়ে আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিও।' প্রথম আলোতে যাতে জয়েন করতে পারি সেজন্য আরো একটি চিঠি দিলেন। পরে চিঠি নিয়ে আসলে কারো কাছেই যাওয়া হয়নি, তবে এখনো সেই চিঠি সংগ্রহে রেখেছি। কিছুদিন পর কালের কন্ঠ'র ফিচার এডিটর জামিল ভাইয়ের ফোন পাই। এরপর কালের কন্ঠে জয়েন করি।


আমার স্ত্রী তখন সন্তানসম্ভবা। এম আর খান স্যারের সঙ্গে সেন্ট্রাল হাসপাতালে দেখা হলে তাকে বিষয়টি জানালাম। তিনি কাগজ ও কাঠপেন্সিল বের করে সাদা কাগজে গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মালিহা রশিদ আপার কাছে চিঠি লিখে দিলেন। বললেন, তার কাছে রেগুলার চেকআপ করাতে। মহাব্যস্ত মালিহা আপার চেম্বারে গিয়ে আমি তো অবাক! যেখানে আপার সিরিয়ালই পাওয়াই কঠিন, সেখানে তিনি স্যারের রেফারেন্স পেয়ে আমার কাছে কোন ভিজিটই নিলেন না!


যারা আসলে স্যারকে ভালোবাসতেন, তারা স্যারের সবকিছুকেই সম্মান জানাতেন।


এম আর খান স্যার যখন অসুস্থ হয়ে সেন্ট্রাল হসপিটালে ভর্তি ছিলেন, তখন আমার স্ত্রীকে নিয়ে স্যারকে একদিন দেখতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, স্যারের চেহারা কেমন জানি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মুখে নেই সেই জৌলুস, নেই চিরাচরিত সেই হাসি! এমন ফ্যাকাশে মুখ এর আগে কখনো দেখিনি।


সেন্ট্রাল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধী অবস্থায়ও স্যারকে দেখতে গিয়েছি। তাকে আগে যেভাবে দেখেছি সেভাবেই তিনি নির্লিপ্ত থাকতেন। কখনো মৃত্যুভয়ে ভীত হতে বা আবেগপ্রবণ হতে দেখিনি স্যারকে।


তিনি আসলে কি ছিলেন, এটা বুঝছি তাঁকে হারিয়ে। এম আর খান নেই, যেন মাথার ওপর ছাতাটা সরে গেছে। স্যার আসলে মরেননি। তাঁর কৃতিই স্যারকে বাঁচিয়ে রাখবে শত শত বছর।


লেখক : সাংবাদিক


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com