অযৌক্তিক ফতোয়া ও কিছু কথা
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:০৮
অযৌক্তিক ফতোয়া ও কিছু কথা
শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি
প্রিন্ট অ-অ+

টিএসসির সব সংগঠনের কাজ রাত ৮টার ভেতরে শেষ করতে হবে, আর ৯টার পর কেউ টিএসসি প্রাঙ্গণে অবস্থান করতে পারবে না। ওয়েল, এখানে আমার কিছু কথা আছে:


১। যেহেতু প্রশাসনের মতে সংগঠন করা পাপ, আর ছাত্রছাত্রীকে সংগঠনবিমুখ করার জন্যই এমন সিদ্ধান্ত কিনা জানি না, তাহলে তো টিএএসি যাওয়াই নিষিদ্ধ করে দেয়া উচিত। ঢাবির ছাত্রছাত্রী টিএএসসিতে কেন থাকবে, ওটাতো বহিরাগতদের অভয়ারণ্য!


২। যেহেতু ছাত্রছাত্রীরা সংগঠন করে অবসর সময়ে, আর তখন যেহেতু বাইরে থাকা যাবে না, তাই ক্লাস, টিউশনি বাদ দিয়েও সংগঠন করা যেতে পারে। তাহলে রাত ৮টার ভেতর সব কাজ ইজিলি শেষ করা সম্ভব! প্রশাসন এতেও যদি আপত্তি করে, তাহলে টিউশনির বেতনটা তারা ছাত্রদেরকে দিয়ে ধন্যও করতে পারে চাইলে!


৩।শুনলাম, এক মেয়ে এর প্রতিবাদ করায় এক ভাইয়া জানতে চেয়েছেন, রাত নয়টার পর বাইরে থেকে তার ধর্ষিত হবার ইচ্ছা আছে কিনা! তিনবছরেরও বেশি সময় ধরে টিএএসসির সংগঠনগুলোর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার পরেও আর এক বছর ধরে টিএএসির একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্বে থাকার পরেও এমন একটাও ঘটনার সাক্ষী হবার সৌভাগ্য না হওয়ায় জীবন আমার ব্যর্থ হয়ে গেছে বলে মনে করছি। এ জীবন আর রাখা ঠিক হবে কিনা, সেটাও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে!


৪। আর একজনের মতামত, নয়টার পর টিএএসিতে নাকি মেয়েরা গাঁজা খায়! বলতে চাইনি, কিন্ত বলতে বাধ্য হচ্ছি, লাইব্রেরির চিপায় বসে এমপিথ্রি গলাধঃকরণ করা কোনো ছেলের পক্ষে কোনো কিছু না জেনে এরকম মন্তব্য করা অস্বাভাবিক কিছু বলে আমার মনে হয়নি। টিএসসির কয়জন মেয়েকে চেনেন? যাদের গাঁজা টানার তারা যে চাইলে সকালেও টানতে পারে, এটা বোঝার জন্য তো খুব বেশি কমনসেন্সের দরকার নেই। ঢালাওভাবে এরকম মন্তব্য করাটাই তো গাঁজাখুরি!


৫। মেয়েদের টিএসসি যাওয়াই একেবারে নিষিদ্ধ করে দেয়া হোক। একটা মেয়ে সংগঠন করে কি করবে? প্রশাসনের বরং অতিশীঘ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য ভোর ৬টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত 'রান্না এবং সেলাইশিক্ষা কর্মসূচি' হাতে নেয়া উচিত। পারলে 'আদর্শ পাত্রী হবার ৪২০ টোটকা' নামে বইও বের হতে পারে ঢাবি প্রকাশনা থেকে!


৬। প্রশাসন বলতে পারে, নিরাপত্তার জন্য এমনটা করছে। বিনয়ের সাথে বলছি, তাদের বেতন দিয়ে রাখা হয়েছে আসলে ক্যাম্পাসের ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, ক্যাম্পাসে বহিরাগত সমস্যার কোনো সুষ্ঠু সমাধান না করে এরকম অযৌক্তিক ফতোয়া জারি করার জন্য নয়। নয়টার পর টিএএসির কেউ থাকবে না তো কি বহিরাগতরা থাকবে? ৮টার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে মানে কি? সময়সীমাটা রাত দশটা পর্যন্ত করলেই তো আর এমন দৃষ্টিকটু লাগে না বিষয়টা।


৭। একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, কয়দিন আগে টিএসসির সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বন্যার্তদের সাহায্য করার উদ্যোগ নেয়। সব সংগঠনের নেতৃস্থানীয়রা রাতে মিটিং করে তাদের পরবর্তী দিনের কর্মপরিকল্পনা ঠিক করত। মেয়েদের মধ্যে আমি একা ছিলাম। সাড়ে নয়টায় হলগেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমি দুইটার বেশি মিটিংয়ে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তারা মিটিং কলই করত রাত দশটায়। সারাদিনের কর্মসূচি আর ফান্ড কালেকশন শেষ করে তার আগে সবার কাজ শেষ হত না। টাইমিং মিলত না। সেখানে রাত আটটার আগে কাজ কিভাবে শেষ হবে, তা আমার কাছে মোটেও পরিষ্কার নয়।


যাই হোক, শুধু হলের গেট বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমি সরে আসতে বাধ্য হই। প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কি যোগ্য ছিলাম না? সময়ের কারণে এরকম ভালো একটা উদ্যোগে কন্ট্রিবিউট করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবার বিচার কার কাছে চাইব আমি?


৮। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ ক্লাসরুমগুলোই কোনোরকম সাংগঠনিক শিক্ষা দেয়া হয় না। পোলাপান ক্লাসের পড়ায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে লাইব্রেরিতে গিয়ে বিসিএসের বই নিয়ে বসে থাকে। সারাদিন লাইব্রেরিতে বসে চাকরির পড়া পড়তে পড়তে আধমরা ছেলেটা ভাইভা বোর্ডে গিয়ে আমতা আমতা করে। এ লজ্জা কার?


৯। সময় নির্ধারণের আগে কি সব সংগঠনগুলোর সাথে একবার আলোচনায় বসা উচিত ছিল না? উদাহরণস্বরূপ, বাঁধনের কার্যক্রম রাত নয়টা পর্যন্ত। সবকিছু শেষ করে অফিস বন্ধ করতে করতে সাড়ে নয়টা বাজে। যে অসহায় মানুষগুলো এখানে রক্তের জন্য আসে, তাদেরকে রাত আটটার পর টিএসির পরিচালকের বাসায় পাঠিয়ে দিলে ভালো হবে না? বলা হয়েছে, অনুমতিসাপেক্ষে রাত এগারটা পর্যন্ত কাজ করা যাবে। তাহলে কি অনুমতির নামে বাড়তি হয়রানিই আসল উদ্দেশ্য?


শেষকথা, যাদের উপর এই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদের মতামত নেয়ার ন্যূনতম কোনো প্রয়োজন আছে কিনা, জানার আগ্রহ প্রকাশ করে এই দীর্ঘ লেখার ইতি টানছি।


লেখক : সাধারণ সম্পাদক, স্লোগান' ৭১


বিবার্তা/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com