পরম উৎসবের দিনে পাংকোর দ্বীপে
প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০১৮, ২০:৩৫
পরম উৎসবের দিনে পাংকোর দ্বীপে
শেখ আরিফুজ্জামান, মালয়েশিয়া থেকে
প্রিন্ট অ-অ+

ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে আনন্দ। ঈদের আনন্দ অন্য যে কোনো আনন্দের চেয়ে একটু ভিন্ন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সব কিছুই যেন একজন বাঙালির জীবনে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। আমরা এতে অভ্যস্থ হয়েছি বস্তুনিষ্ঠভাবেই। এভাবে অভ্যস্ত হওয়ায়কোনো খাদ ছিল না। সেই দিনটি এখন আর নেই। আমার মতো যারা প্রবাসী। প্রবাসে ঈদ উদযাপন কেমন যেন মলিন আর ফ্যাকাসে, নেই কোনো আমেজ!


এ যেন জীবনের গভীরতম শূন্যতার বহিঃপ্রকাশ। সব প্রবাসীর জীবনকে আলোড়িত করে অহরহ কষ্টের নোনা জল। ঈদের দিন এলেই যেন পরিবার-পরিজনের সাথে কাটানো আনন্দ স্মৃতিতে আক্রান্ত হয় মন। ফেলে আসা স্মৃতি, নিজ শহর, আড্ডা, চেনা পথ, পথের ধুলি আলোড়িত করে হৃদয়।


প্রবাসে ঈদের অভিজ্ঞতা একেক জনের একেক রকম। তবে দেশের বাইরে একজন বাঙালি হয়ে ওঠে অপর বাঙালির প্রিয় স্বজন। পরিচিত-অপরিচিত এখানে নিতান্তই গুরুত্বহীন ব্যাপার।



যৌবনের উচ্ছ্বাস আর আনন্দের মন-প্রাণ কেড়ে নেয়ার পঞ্চম ঈদ আমাদের আজ। তাইতো সব দুঃখ-কষ্ট দূরে ঠেলে কিছুটা আনন্দে থাকার জন্য ঈদ-উল-আযহায় আমাদের এবারের গন্তব্য ছিল পাংকোর দ্বীপ।


দ্বীপটি থাই নাম 'পাং কো' থেকে এসেছে। যার অর্থ সুন্দর দ্বীপ। কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ইপো থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে পেরাকের রাজ্যে অবস্থিত। দ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার এবং প্রধান আয়ের উৎস্য মাছ শিকার ও ট্যুরিজম।
দুই জায়গা থেকে ফেরিতে করে দ্বীপটিতে যাওয়া যায়। কুয়ালালামপুরের টিবিএস বাস স্ট্যান্ড থেকে এক ঘণ্টা পর পর বাসের ব্যবস্থা রয়েছে। ভাড়া পড়বে প্রতি টিকিট ২৭ রিঙ্গিত। শিশুদের জন্য ২০ রিঙ্গিত। বাসে যেতে হলে প্রথমে নামতে হবে লুমুট নামক স্থানে। সেখান থেকে ফেরিতে বা ট্রলারে করে পাংকোর দ্বীপের জেটিতে নামতে হবে। সময় লাগবে ৩০ থেকে ৩৫ মিনিট। ফেরি ভাড়া জনপ্রতি টিকিট ১২ রিঙ্গিত। একটা জিনিস অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, কোনোভাবেই ওই টিকিট ছিড়ে বা ফেলা যাবে না। কারণ আসার সময় ওই টিকিটেই চলে আসতে পারবেন। নতুন করে টিকিট কাটা লাগবে না।


এছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি বা তাড়াতাড়ি যেতে চাইলে মেরিন আইল্যান্ড থেকে অতি সহজে পাংকোর দ্বীপের জেটিতে যাওয়া যাবে। এজন্য সময় লাগবে মাত্র ১০ মিনিট ও ভাড়া ৮ রিঙ্গিত জনপ্রতি। জেটি থেকে মোটরসাইকেল ভাড়া অথবা মাইক্রো ভাড়া করে দ্বীপের যে কোনো সিবিচে যেতে পারবেন। মোটরসাইকেল ২৪ ঘণ্টার জন্য ভাড়া পড়বে ৫০ রিঙ্গিত। মাইক্রোতে একজন ৮ রিঙ্গিত করে। অথবা পুরো মাইক্রো নিলে ৩৫/৪০ রিঙ্গিত ভাড়া লাগবে গৌন্তব্যে পৌঁছাতে।


যেমন কথা, তেমন কাজ। অফিস কলিগ, বন্ধু-বান্ধব মিলে আমরা ১৩ জনের একটি গ্রুপে পরিণত হলাম। বিষাদ ভুলিয়ে দিতে আমাদের সঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় প্রকৃতি, পাহাড় ও সমুদ্র। গ্রুপের নাম দেয়া হলো 'ওকে বস'। যতই ঈদ ঘনিয়ে আসছিলো ভ্রমণকে কেন্দ্র করে আমাদের ব্যস্ততা ততই বাড়ছিলো। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো সারাদিনের অফিস শেষে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা শেষ করে চাঁদ রাতে ৩টার সময় রওনা দেবো। কিন্তু কয়েকজনের গাভিলতির কারণে রওনা হলাম ভোর ৫টায়।


কুয়ালালামপুর থেকে ৪ ঘণ্টার পথ অর্থাৎ ৩৫০ কিলোমিটার দূরে হলেও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ওয়ানওয়ে রাস্তার কারণে প্রাইভেটকারে কিছু কম সময়ের মধ্যে পৌঁছালাম মেরিন আইল্যান্ড নামক স্থানে। সবুজ অরণ্য ও পাহাড়ের বুক চিরে ছুটে চলা, পথিমধ্যে কিছু সময়ের বিরতি।



এদিকে, ঈদের নামাজের জন্য ৩টি গাড়ি যেন একে অন্যকে পাল্লা দিতে থাকলো। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাস্তায় কয়েক কিলোমিটার পর পর রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা। নির্দিষ্ট গতির উপরে উঠলে অটোমেটিক গাড়ির নাম্বারসহ ছবি তুলে নেবে। আর এজন্য গুণতে হবে জরিমানা।


পথিমধ্যে ঈদ-উল-আযহার নামাজ শেষে আবারও ছুটে চলা। মেরিন আইল্যান্ডে গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিশাল ব্যবস্থা রয়েছে। যা শতভাগ নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে। বিন্দুমাত্র চিন্তার কোনো কারণ নেই। আর এ জন্য ২৪ ঘণ্টায় খরচ পড়বে ১৫ রিঙ্গিত করে। অবশেষে গাড়ি পার্কিং করে সকালের ফেরিতে রওনা দিলাম পাংকোরের উদ্দেশে। দ্বীপটিতে অনেকগুলো সিবিচ থাকার কারণে আমরা পছন্দ করলাম 'তেলুক নিপা' সিবিচ।


তেলুক নিপা সিবিচে পৌঁছানোর পর বের হলাম হোটেল বুকিংয়ের জন্য। অনলাইনেও হোটেল বুকিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের হঠাৎ সিদ্ধান্তের কারণে অনলাইনেও বুকিং সম্ভব হয়নি। এ জন্য কিছু সময় খোঁজার পর একে একে খোঁজ পেলাম অনেকগুলো বাংলাদেশী ভাই। যারা বিভিন্ন হোটেলে কর্মরত। তাদেরই সহযোগিতায় কম খরচে পেয়ে গেলাম বাংলাদেশী ম্যানেজারের তত্বাবধানে থাকা হর্নবিল পাংকোর রিসোর্ট। ভাড়া পড়বে ডাবল রুম ১০০ রিঙ্গিত। অফ সিজেনে আরও কম।


হোটেলের ম্যানেজার রহমান ভাই থেকে শুরু করে সবার সহযোগিতা এবং সার্ভিসে মুগ্ধ 'ওকে বস' গ্রুপ। রাত বা দিন যে কোনো সময় ডাকা মাত্রই ছুটে আসে। রিসোর্টের ব্যতিক্রম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চাইলে ৯ জন মিলে একটি রুমে থাকার ব্যবস্থা আছে। রুমটির মধ্যে ৩টি কুইন সাইজের বেড, এয়ারকন, ফ্যান সবই আছে। ডাবল রুম থেকে ভাড়ার পার্থক্য সামান্য।


লম্বা জার্নি এবং রাতে ঘুম না হওয়ার কারণে কিছু সময়ের জন্য রেস্ট নিয়ে এবারের পালা দল বেঁধে বের হয়ে দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন। এ জন্য ম্যানেজার রহমানের ভাইয়ের সহযোগিতায় ২৪ ঘন্টার জন্য মোটরসাইকেল ভাড়া করে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলা। চাইনিজ টেম্পেল, সমুদ্রের মধ্যে মনোমুগ্ধকর মসজিদ দেখা ও জোহরের নামাজ আদায় করাসহ বিভিন্ন সিবিচ পরিদর্শন ও আড্ডা।


পাংকোর দ্বীপের প্রধান বাহন মোটরসাইকেল। আমাদের গ্রুপের অধিকাংশই মোটরসাইকেল চালানোয় দক্ষ থাকার কারণে কোনো রকম দুর্ঘটনা ছাড়াই পাহাড়ের উঁচু-নিচু রাস্তা দিয়ে দলবেঁধে বাইক চালানো, বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা ও ছবি তোলা। শুধু তাই নয় মোটরসাইকেলে তেলুক নিপা সিবিচ থেকে রওনা দিয়ে কখন সমতাল আবার কখনও পাহাড়ের উপর দিয়ে আবার কখনও সমুদ্রের পাশ দিয়ে পুরো দ্বীপটাকে ঘুরে দেখা সে এক অন্য রকম অনুভূতি। দক্ষ চালক ছাড়া সম্পূর্ণ দ্বীপটাকে ঘুরে দেখা অসম্ভব।



দ্বীপটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় একদিকে যেমন আকা-বাঁকা, উঁচু-নিচু, ঢেউ তোলা সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে কালো পিচের সর্পিল রাস্তা, অন্যদিকে সুনসান নীরবতার কারণে খুব কম মানুষই দিনের আলোয় মোটরসাইকেল নিয়ে পুরো দ্বীপটি ঘুরে দেখেন।


মূলত পাংকোরের মূল দ্বীপগুলোর একটি এটি ত্রিভূজ আকৃতির ও পাহাড়ী দ্বীপ। যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ১২১৬ মিটার। পাংকার হিল নামে পরিচিত। কয়েকটি দ্বীপগুলোর মধ্যে পাংকোর দ্বীপটি পাহাড় বেষ্টিত হওয়ায় সৌন্দর্য বর্ধণ ও যোগাযোগের জন্য চারিদিকে পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। যা দ্বীপের এক প্রান্ত থেকে রওনা দিয়ে ওই প্রান্তে আসতে মোটরসাইকেলে ১ ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে।


ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য দ্বীপে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক হোটেল/রিসোর্ট রয়েছে। পাংকোর দেখার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। কারণ দ্বীপটির আবহাওয়া সারাবছর একই রকম থাকে (যদিও এটি এখনও একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় দ্বীপ)।


সমুদ্রসৈকত, সামুদ্রিক মাছ, ১২১৬ মিটার উঁচু পাহাড়, সূর্যাস্ত উপভোগ করা ছিল মনে রাখার মতো। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা সবুজ অরণ্য, সমুদ্রের নীল জলরাশি— সব মিলিয়ে মনে হলো স্বর্গের একটি খণ্ড যেন ছিটকে পড়েছে এই দ্বীপে।



জীবনের ডাইরিতে যুক্ত হলো আরো কিছু স্মৃতি। এমনটি শোনা গেল সানজি ইসলাম, নওরিন, টানভির, রাসেল, সাঈদ, ফয়েজ-ওদের মুখেও। সবারই কথা- প্রবাসের একঘেয়েমি জীবনযাত্রা থেকে অনেক ঘুরতে হবে। জানা যাবে ইতিহাস, ঐহিত্য আর দেখা যাবে ধরণীর মায়াবি রূপ।


বিবার্তা/আরিফ/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com