লাহোরের আনারকলি বাজার
প্রকাশ : ২৯ জুলাই ২০১৮, ১৭:৫৭
লাহোরের আনারকলি বাজার
মোহাম্মদ হাসান শরীফ
প্রিন্ট অ-অ+

মোগল শাহজাদা সেলিমের (জাহাঙ্গীর) জীবনে তখনো মেহেরুন্নিসা (নূরজাহান) আসেননি। অন্য সময়ের মতো ওই রাতেও রংমহলে রঙিন দুনিয়ার আমেজ। নাচছে নতুন ফুলের সৌরভ নিয়ে আসা এক কিশোরী। তার রূপ, নাচের ছন্দে, ভ্রূ'র কটাক্ষে মুগ্ধতার রেশ কাটনো দায়।


পাগল হয়ে গেলেন সেলিম। শাহজাদাকে দেখে কিশোরীও শিহরিত। চার চোখ যখন এক হয়, তখন দুনিয়াই স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তারপর... তারপর যা হবার তা-ই হলো। ‘অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে কাটাইতে লাগিলেন’- এমনটা তো কখনো হবার নয়। এ কালের মতো সে কালেও ভিলেনরা হু-হা-হা-হা করে ছুটে আসত। মোগল শাহজাদা এক ক্রীতদাসীর প্রেমে পড়েছেন, তা কী মেনে নেয়া যায়! কথাটা যথারীতি সম্রাটের কানে তোলা হলো। তবে সম্রাট আকবর নিজে যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। তাই তিনি লাহোরে ছুটে গেলেন। আয়োজন করা হলো মুজরার। উদ্দেশ্য কাউকে বুঝতে দিলেন না। শীষমহলে আনা হলো সেই নর্তকীকে। সেলিমকেও হাজির করা হলো। শুরু হলো নৃত্য। নাচের ফাঁকেই সেলিমের চোখে চোখ রেখে একটু হাসল মেয়েটি। কেউ দেখল, কেউ টেরও পেল না। কিন্তু সম্রাটের নজর ছিল দেয়ালে দেয়ালে লাগানো কাচের দিকে। তাতেই তিনি যা বোঝার বুঝে নিলেন। অভিযোগ তাহলে সত্য! সেদিনই সেলিম কিছু বোঝার আগে কবর দেয়া হলো আনারকলিকে। পরে সেলিম সম্রাট হয়ে সেখানে তৈরি করলেন এক সমাধি। আনারকলির সমাধি।


বিদ্বান ব্যক্তিরা অবশ্য বলেন অন্য কথা। লাহোর দুর্গে আমাদের গাইড জাভেদ তো জোর দিয়েই বললেন, এ কাহিনী ইতিহাস-নির্ভর নয়। রাজা-বাদশাহদের নিয়ে কত কথাই তো রটে! ওই কাহিনীর আরো যেমন সংস্করণ আছে, ঠিক তেমনি কেউ কেউ বলেন, এখানে আছে জাহাঙ্গীরের আরেক স্ত্রী সাহাব-ই-জামালের কবর। তবে অনেক ঘটনার মতো এখানেও ‘সত্যের’ চেয়ে ‘কিংবদন্তির’ শক্তিই অনেক বেশি।


ঘটনা যা-ই হোক, পাকিস্তানে যাওয়ার পর সমাধিটি দেখার তীব্র ইচ্ছা জেগে উঠলো। নূরজাহানের চেয়ে আনারকলিই বেশি টানে আমাকে। কিন্তু সঙ্গী-সাথীদের চাপে আনারকলি সমাধিতে না গিয়ে যেতে হলো আনারকলি বাজার। দুটি স্থানের মধ্যে খুব বেশি দূরত্ব নেই। তবে ব্যবধান অনেক। স্মৃতিসৌধে যেতে অনেক আনুষ্ঠানিকতা পেরুতে হয়, কেননা, পাঞ্জাব প্রদেশিক সচিবালয়ের ভেতরে পড়ে গেছে আনারকলির সমাধি। ফলে লাহোর দুর্গ, বাদশাহি মসজিদ ইত্যাদির মতো হুটহাট করেই যাওয়া যায় না। অন্যদিকে বাজার তো বাজারই ; সবার জন্য খোলা।


হ্যাঁ, একেবারেই খোলা বাজার। কারো কারো মতে, এটিই এশিয়ায় টিকে থাকা সবচেয়ে প্রাচীন বাজার। সম্রাট জাহাঙ্গীরই নাকি বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেছেন। সাধারণ মানুষ যে আনারকলিকে ভোলেনি, তারই প্রমাণ তার নামেই এই বাজার। এই বাজারেরই একটি অংশে আছে ভারতবর্ষে প্রথম দিকের অন্যতম মুসলিম শাসক কুতুবউদ্দিন আইবেকের সমাধি। পোলো খেলতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন এই সুলতান। তার নামেও পরিচিত হতে পারত স্থানটি। লোকজন তাকেও ভোলেনি।


আমি যখন ভরদুপুরে সমাধিটিতে গেলাম, তখনো কিছু লোক মাজারটি জেয়ারত করছে দেখতে পেলাম। অল্প একটু জায়গায় ছিমছাম করে গড়া সমাধিটি, মোগলদের মতো বিশাল সমারোহ পুরোপুরিই অনুপস্থিত।


তবে আনারকলি বাজার আসলেই দেখার মতো জায়গা। না গেলে আফসোস থেকেই যাবে। পা রাখতেই মনে হলো, আরে এ তো আমাদের ঢাকার বঙ্গবাজার! তবে পার্থক্য হলো, বঙ্গবাজারে কয়েকটি সারি আর কলামে ভাগ করে ঘিঞ্জি হয়ে থাকা দোকানপাট, আর আনারকলিতে ২০-২৫ ফুট সরকারি রাস্তার দু'পাশে দোকানের পর দোকান। অবশ্য বাজারের ভেতরও নানা মার্কেট আছে। গলি-ঘুপচিও দেখা গেল।


পাকিস্তানের আনারকলি বাজারে বাংলাদেশের বঙ্গবাজারের মতোই দরদাম করে কেনাবেচা হয়। দোকানি দুই হাজার রুপি যে ব্যাগটার দাম হাঁকিয়েছিল, সেটি কিনতে পেরেছি মাত্র এক হাজার রুপিতে! আমি নিজেই থ। বঙ্গবাজারের চেয়ে সস্তা মনে হলো। সাথে সাথেই ভাবনায় পড়লাম, দাম কি আরো কমানো যেত? তবে সব দোকানে এমন নয়। নিজেই টের পেয়েছি। দুটি ছাতা নয় শ’ রুপি চাওয়ার পর ছয় শ’তেও রাজি করানো যায়নি দোকানদারকে। তার শেষ কথা - সাত শ’।


তবে এখানে খুব বেশি কেনাকাটা করা যায়নি। আগের কয়েক দিনে করাচি, ইসলামাবাদের সুপার মার্কেটগুলো মানিব্যাগকে একেবারে স্লিম করে ফেলেছিল।


আমাদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান ছিলেন, তারা ঠিকই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছেন। তারা টের পেয়েছিলেন, সুযোগ আসছে সামনে। আমাদের কেনাকাটার আগ্রহ দেখে পাকিস্তান পিআইডির ডেপুটি ডাইরেক্টর ইশরাত আখতার বলেই ফেললেন, ''আপনারা তো দেখি মেয়েদের মতোই কিনছেন।'' তিনি নিজে নারী বলেই এভাবে বলতে পারলেন? না, খুব বেশি কেনা হয়নি। তবে সময় লেগেছে অনেক। আর তাতেই পরের প্রোগ্রামে হাজির হতে হিমশিম খেতে হয়েছে।


তবে হাতে সময় থাকলে আর নাক উঁচু ভাব ঠেকানো গেলে, এই বাজারে কেনাকাটায় বেশ মজা পাওয়া যেতে পারে। এই বাজারে জীবনের ছোঁয়া পাওয়া যায়। সুপার মলে ক্রেতা-বিক্রেতা ভাবের আদান-প্রদান নেই, যান্ত্রিক কায়দায় কাজ সেরে যত দ্রুত সম্ভব বিদায় নেয়া। কিন্তু এখানে দরদামের উছিলায় মনের কথা বলা যায়, পরস্পরকে জানা যায়। একেই কি বলতে পারি প্রাচ্যের দৃষ্টিভঙ্গি?


এই বাজারে কী নেই। সবই পাওয়া যায়। ঠুনকো জিনিস যেমন, আছে বেশ মূল্যবান সামগ্রীও। গ্যারান্টি দেয়া যায়, কেউ খালি হাতে ফিরবে না এখান থেকে! আমাদের দলের একজন তিনটি স্যুট পিস কিনে নিলেন। তিনি বেশ অভিজ্ঞ লোক। জানালেন, বেশ দাঁও মেরেছেন। মাসুদ নামের এক দোকানি জানালেন, এই বাজারে যে যে জিনিসটি দুই হাজার রুপিতে পাওয়া যাবে, সেটি পাশের সুপার মলে নেবে এক দাম ছয় হাজার রুপি। হ্যাঁ। মারি থেকে যে চাদর কিনেছিলাম, সেগুলোর দাম এখানে কম বলেই মনে হলো।


যতই হাঁটি বাজারটি যেন ফুরাতে চায় না। দোকান যেমন আছে, অনেকে আবার ঢাকার মতো রাস্তাতেও পসার সাজিয়েছে। ‘বাইছা লন, দেইখা লন’-ধরনের দোকানে টি-শার্ট বিক্রি হতেও দেখলাম।


বাজারের মধ্যে নারীদের জন্যও আলাদা জায়গা আছে। বানু বাজার, ধনিরাম লেন, পান গলি - ইত্যাদি নানা অংশ রয়েছে এখানে। পান গলিতে মনভোলানো পান ছাড়াও ভারতীয় জিনিসপত্র নাকি দেদারসে বিক্রি হয় - জানালেন কয়েকজন। বাজার এলাকায় কয়েকটি শপিং মলও দাঁড়িয়ে গেছে। আবার পুরান আনারকলি বাজার, আর নতুন আনারকলি বাজার নামেও এটি বিভক্ত। ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠানের শাখাও দেখা গেল বাজারে।


এই বাজারে পাকিস্তানের রাজনীতির নাড়িও অনুভব করা যায়। আমরা যখন লাহোরে, তখন বিশ্বকাপ উত্তেজনা তুঙ্গে। ঢাকায় বাড়ি বাড়ি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। ২৫ জুন করাচিতে গিয়েই মনে হলো ভিন দেশে এসেছি। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বলে কিছু আছ, সে খবর দুনিয়ার এই অংশে মনে হলো এখনো এসে পৌঁছায়নি। তবে দেশটিতে যে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসছে, তা ভালোভাবে টের পেলাম আনারকলিতে এসে। বেশ কিছু দোকানে নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগ (এন), ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ, বিলাওয়াল ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির পতাকা, নির্বাচনী প্রতীক, ব্যাজ, ব্যানার ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে পাইকারি দরে। মজুত দেখে বোঝা গেল, বেচা-বিক্রিও ভালোই হচ্ছে।


সময়ের সাথে পাল্লা দিতে ঘড়ির দিকে তাকাতে হচ্ছে। অথচ বাজারের পুরোটা এক চক্কর দেখার ইচ্ছাটি বাদ দিতে ইচ্ছা করছে না। যতই আগে বাড়ি, ততই নতুন রহস্য ধরা দেয়। কিন্তু তবুও একপর্যায়ে ঘোরাঘুরির ইতি টেনে অতৃপ্তি নিয়েই ফিরতে হলো।


তবে আনারকলি কিন্তু পিছু ছাড়েনি। গুগল থেকে যতটুকু জানতে পারি, সে অনুযায়ী, আনারকলির সমাধিটি আকারে বেশ ছোট। তাতে ফারসিতে লেখা আছে -


ত কিয়ামাত শুকর গুয়াম কারদিগার খিশ রা/আহ! গার ম্যাঁ বাজ বিনাম রু ইয়ার-ই খিশ রা (আমি কিয়ামত তক খোদার শুকরিয়ায় মগ্ন থাকব/যদি পারি আর মাত্র একবার প্রিয়তমের মুখটি ছুঁয়ে দেখতে)।


আনারকলি যেমন তার প্রিয়জনকে একটিবার স্পর্শ করার জন্য এখনো অপেক্ষায় আছেন, আমিও থাকব তার দর্শন পাওয়ার জন্য, যদিও খুব কাছে গিয়েও এবার দূরে সরে আসতে হয়েছে।


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com