রোহিঙ্গাদের দেশে
প্রকাশ : ৩০ নভেম্বর ২০১৭, ১৯:৪৭
রোহিঙ্গাদের দেশে
আবদুল আজিম
প্রিন্ট অ-অ+

মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটের মংডু শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল ২০১৫ সালে। তখন দেখেছি রোহিংগাদের ওপর নিপীড়নের বহু দৃশ্য।


কর্মসূত্রে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় তিন বছরেরও বেশিকাল থাকার কারণে সীমান্তবর্তী উপজেলা উখিয়া, টেকনাফ, নাই্যংছড়িসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সীমান্তবর্তী লেমুছড়ি, তুমব্রু, ঘুমধুম, চাকঢালা, আশারতলী প্রভৃতি বিওপি পয়েন্টে যাওয়ার সুবাদে মিয়ানমার ভ্রমণেরও সুযোগ এসে যায় আকস্মিকভাবে।


ভ্রমণের দিন ঠিক হলো ৪ জানুয়ারি রবিবার। পৌষ মাসের কুয়াশাস্নাত ভোরে রামু থেকে রওয়ানা দিয়ে টেকনাফ লিংক রোড ধরে নিজস্ব গাড়িতে আঁকাবাঁকা সর্পিল পথ বেয়ে উখিয়া ও হ্নীলা হয়ে সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে টেকনাফ স্থলবন্দরে পৌঁছুলাম। এখানে এসে বর্ডার পাস বুঝে নিলাম। হালকা নাস্তা ও ইমিগ্রেশনের কাজ সেরে ট্রলারে ওঠার অপেক্ষা। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সোজা জানিয়ে দিলো, কেবল পাঁচ হাজার টাকা (এক টাকাও বেশি না) ছাড়া কোনো মোবাইল, ক্যামেরা, ইলেকট্রনিকস দ্রব্য, মানিব্যাগ, এমনকি কোনো কাগজপত্রও নেয়া যাবে না সাথে। ভাবলাম, এ না হলেই কি মগের মুল্লুক!!


অগত্যা ড্রাইভারের কাছে মানিব্যাগ, মোবাইল, ক্যামেরা, ব্যাগ জমা রাখলাম। আর বিকেল ৫টায় টেকনাফ স্থলবন্দরে আমাদের ফিরে আসা পর্যন্ত থাকতে বললাম।


মোবাইল না থাকায় যোগাযোগবিচ্ছিন্নভাবে চলেছি। পকেটে পাঁচ হাজার টাকা ছাড়া কিছুই নেই। ক্যামেরা, মোবাইল না নিতে পারায় মনটা খারাপ হয়ে আছে। এই ভ্রমণের স্মৃতিস্বরূপ কোনো ছবিই থাকবে না! আধুনিক একবিংশ শতাব্দীতেও এমন জংলি আইন! ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল।


অনেক যাত্রী নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় ট্রলার ছাড়ল। ট্রলারে উঠে মনে হলো, অজানার উদ্দেশে চলেছি। কাঠের ট্রলার, মাছ ধরার ট্রলারই বলা চলে, ছাদ নেই। কাঠের তক্তার ওপর বসার জায়গা। একটু দূরে সেন্টমার্টিনে গমনকারী কেয়ারি সিন্দবাদ, গ্রিনলাইন ক্রুজার দেখা যাচ্ছে।


নিজেকে মিসকিন মিসকিন মনে হলো, কাঠের ট্রলারে বিদেশ ভ্রমণ! এর আগে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ হয়েছে; কিন্তু কখনোই এত খারাপ লাগেনি।


ট্রলার চলতে শুরু করল শান্ত নাফ নদী বেয়ে। সেন্টমার্টিনের পথে কিছু দূর এগিয়ে বামে মোড় নিল। ডানে টেকনাফের সুউচ্চ পাহাড়।


খোলা ট্রলারে প্রখর রোদ, অনেক রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের নাগরিক নারী-শিশু-পুরুষ, পাস নিয়ে বিভিন্ন কাজে বাংলাদেশে এসে ফেরত যাচ্ছে। কয়েকজনের সাথে কথা বললাম। তারা নিজেদের জীবনমান, অধিকার, বঞ্চনা নিয়ে দুঃখের কথা জানাল। চেহারা ও স্বাস্থ্য দেখেই তাদের দুরবস্থা বোঝা যাচ্ছিল। আমরা দু-চারজন ছাড়া সব পুরুষই লুঙ্গি পরিহিত। কয়েকজন নারী বোরকা পরে এবং ছাতা মাথায় দিয়ে পর্দা করছেন।


সোয়া ঘণ্টা পর মংডু শহরের বন্দরে পৌঁছলাম। মংডু বন্দরের কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল, পুরনো আমলের জমিদার বাড়ির পুকুরে শান বাঁধানো পাকা ঘাটের মতো একটা ঘাট। টিনের ছাউনি। বৈঠকখানার মতো দু’পাশে বসার ব্যবস্থা। সেখানে ট্রলার থেকে ওঠা-নামা করা হয়।


আমরা নেমে ঘাটে দাঁড়ালাম। দেখলাম লুঙ্গি, গেঞ্জি ও স্যান্ডেল পরা অস্ত্রধারী সীমান্তরক্ষী। গেঞ্জি আবার লুঙ্গির ভেতরে ‘ইন করা’!! জীবনে অনেক ক্যাডার ও অস্ত্রধারী দেখেছি, কিন্তু এ রকম ক্যাডার বা রক্ষী তো দেখিনি! তবে কয়েকজন ইউনিফর্মধারীও ছিল।


আমাদের সবাইকে কাস্টমস শেষে ইমিগ্রেশন রুমে নেয়া হলো। ছবি তোলা হবে সবার। বর্ডার পাসে সিল-ছাপ্পর মেরে ছবি তোলার জন্য সবাইকে এক রুমে জড়ো করা হলো। সবাইকে কঠিন নির্দেশ দিয়ে নীরবে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়া হলো। আমরাও লাইনে দাঁড়ালাম। শুধু ছবি তোলা নয়, যাচাই-বাছাইও চলল। একেকজনের ছবি তুলতে ১০-১৫ মিনিট টাইম লেগে গেল। ''রেডি'' বলে শাটার টিপে, কিন্তু ক্যামেরা অন হয় না। ছবি তুলতে অনেক ‘কাহিনী’ করল ওরা। ইংরেজিতে তেমন কথা বলতে পারে না, খালি ‘অং পং মং চং’- এসব অবোধ্য বুলি আওড়াচ্ছে।


বাইরে এসে দেখি, কয়েকজন রোহিঙ্গা তরুণ রিকশা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখে তর্কাতর্কি শুরু হলো তাদের মধ্যে, কার রিকশায় উঠাবে তা নিয়ে। তারা বলছে, ‘আঁর রিকশাত উডন অঁনেরা, আঁর রিকশাত, আঁর রিকশাত’। দুটো পয়সা কামানোর জন্য হত-দরিদ্র রোহিঙ্গাদের কী প্রাণান্তকর চেষ্টা!


রিকশাগুলো আবার আমাদের দেশের মতো নয়। অনেকটা হুইল চেয়ারের মতো। তবে দু’পাশে দু’জন বসতে পারে, একজনের পিঠের সাথে অন্যজনের পিঠ লাগিয়ে দু’জন দু’দিকে মুখ করে বসতে হয়। চাইলেই হাত দিয়ে মাটি স্পর্শ করা যায়। চালক আমাদের দেশের রিকশার মতো সামনের সিটে বসে চালায়।


আমরা একটি রিকশা ভাড়া করে চালক রোহিঙ্গা ছেলেটির সাথে গল্প করতে করতে এক বাজারে এলাম টাকা এক্সচেঞ্জ করার জন্য। বাংলাদেশী এক টাকা সমান মিয়ানমারের ১৩ কিয়াত। আমাদের নেয়া পাঁচ হাজার টাকায় মোট ৬৫ হাজার কিয়াত পেয়ে শার্ট-প্যান্টের সব পকেট ভর্তি হয়ে গেল। খুশিতে মনটা নেচে উঠল; কিন্তু সে খুশি একটু পরেই উবে যায়।


আমরা যে মংডুতে এসেছি, তা মিয়ানমারের একটি জেলা শহর। টেকনাফ সীমান্তের ঠিক ওপারেই অবস্থিত। নাফ নদীর ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন (আসল নাম আরাকান) রাজ্যের ১৭টি শহরের একটি এই মংডু। পাঁচ লক্ষাধিক জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ মুসলিম, বাকিরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগ।


মংডু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি না হলেও শাল-সেগুন-চন্দন গাছের বাগানঘেরা অত্যন্ত সুন্দর শহর। যদিও মিয়ানমারের সামরিক সরকার পর্যটকদের তেমনভাবে মিয়ানমার ভ্রমণ করতে দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। তবে লক্ষ্য করেছি, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানায় জান্তা সরকার।


মংডু অত্যাধুনিক শহর নয়। অনেকটা আমাদের বরিশাল কিংবা ময়মনসিংহের মতো অনেক পুরনো। শহরের লোকেরা তন্ত্রমন্ত্রে খুব বিশ্বাসী। এরা এখনো মুমূর্ষু না হলে ডাক্তারের কাছে সহজে রোগী নেয় না। ঝাড়-ফুঁক, তাবিজ-কবচে বিশ্বাসী।


এখানকার সব বাড়িঘর সেগুন কাঠের তৈরি দোচালা। তিনচালা টিনের ঘরগুলো দেখতে অনেকটাই ক্যাং ঘরের (বৌদ্ধদের উপাসনালয়) মতো। কোনটা যে ক্যাং ঘর আর কোনটা মানুষের বসতবাড়ি, দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই।


বিশাল আকৃতির প্যাগোডা আছে ১২টি। আছে অসংখ্য ভাঙাচোরা মাদরাসা-মসজিদ। সরকার এখানে মসজিদ-মাদরাসা সংস্কার করতে দেয় না। বরং ইচ্ছা হলেই ভেঙে দেয়।


মংডুবাসী লোকজন রাখাইন ও আদি চাটগাঁইয়া ভাষায় এবং কিছু কিছু উর্দু ভাষায় কথা বলে। এখানে চায়ের দোকানকে বলে ইয়ং নি, ভাতের হোটেলকে বলে বাতং নি। মুসলমানদের হোটেলে ভাত, ভর্তা, মাছ, গোশত সবই পাওয়া যায়। তবে এরা সবাই শুঁটকি খেতে অভ্যস্ত। মগরা স্থানীয়ভাবে তৈরি মদ পানে আসক্ত।


মংডুতে প্রবেশের আগে মিয়ানমারের নাসাকা বাহিনী এবং মংডুর ইমিগ্রেশন বিভাগে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়ে ঢুকতে হবে যে, আপনার সাথে কোনো ইলেকট্রনিক দ্রব্য বিশেষ করে সেলফোন ও ক্যামেরা নেই। ওখানে বিদেশীদেরএসব বহন নিষিদ্ধ। মংডু থেকে আপনার পারমিশন থাকলে রাখাইন রাজ্যের রাজধানী শিত্তুই বা আকিয়াব যেতে পারবেন। তবে যাওয়ার কারণ হতে হবে অবশ্যই ব্যবসায়িক। সাথে থাকতে হবে ট্রেড লাইসেন্স, চেম্বার অব কমার্সের মেম্বারশিপ, ইমপোর্ট লাইসেন্স। আকিয়াব যেতে জাহাজে সময় লাগে ১২ ঘণ্টা। যাদের মিয়ানমার যাওয়ার ভিসা আছে, তারা জাহাজে করেই ইয়াঙ্গন যেতে পারবেন, সময় লাগবে চার দিন।


আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাস বই ফি (সোনালী ব্যাংকে চালানের মাধ্যমে জমা দেয়া) ৫০০ টাকা। ভ্রমণকর ৫০০ টাকা। বন্দর শুল্ক ৫০ টাকা। ট্রলার ভাড়া ১০০ করে ২০০ টাকা (আসা-যাওয়া)। মংডুতে প্রতিদিন থাকা-খাওয়া সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা। ওখানে থাকার জন্য আছে কেন্নাহ, সুওই, ওহো প্রভৃতি রেস্ট হাউজ।


বাজারে টাকা ভাঙানোর পর পকেটভর্তি ৬৫ হাজার কিয়াত নিয়ে রিকশায় পুরো শহর ঘুরলাম। ছোট শহর। কিছু দোকানপাট, দোতলা কিছু পুরনো আমলের মার্কেট। পরিপাটি বহুতল মার্কেট তেমন চোখে পড়েনি। বেশিরভাগ ঘরবাড়ি ছনের ও কাঠের, কিছু কিছু টিনশেড। তবে কিছু বাড়ি সুরম্য অট্টালিকা। পুরো শহরটা পুরনো আমলের, আধুনিকতার কোনো ছাপ দেখলাম না। যানবাহন বলতে বেশিরভাগ রিকশা, কিছু ট্যাক্সি আর দু-একটা কার ও বাস চোখে পড়ল।


চলতে চলতে রিকশাচালক শহরের একপ্রান্তে এসে থেমে গেল। বলল, এর পরে আর যাওয়া যাবে না। বোঝা গেল, রোহিঙ্গাদের চলাফেরার স্বাধীনতা নেই। নির্দিষ্ট এরিয়ার বাইরে ওরা যেতে পারে না। নিজ দেশেই ওরা বন্দী। মনে হলো, পুরো মংডু শহরটা যেন একটা কারাগার।


আসার পথে রিকশাচালক আধুনিক কয়েকটা বিল্ডিং দেখাল, যেগুলো নাকি মুসলমানদের, কিন্তু রাখাইনরা তাড়িয়ে দিয়ে দখল করে রেখেছে। দুপুর গড়িয়ে গেলেও কোথাও কোনো আজানের ধ্বনি শুনলাম না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা হলেও আজান বা নামাজের আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব। অনেক খুঁজে কয়েকটা মসজিদ দেখলাম, পরিত্যক্ত ও তালাবদ্ধ।


দুপুরের শেষ দিকে খাওয়ার জন্য একটি মুসলিম হোটেল খুঁজে নিলাম। দাম জেনে নিলাম - কোয়েল তিন হাজার ৫০০, মুরগি দুই হাজার ৫০০ কিয়াত। মুরগি, কোয়েল, সাদা ভাত, ডাল, সবজি খেলাম চারজনে। বের হয়ে চা-কফি খেলাম। পকেটভর্তি ৬৫ হাজার কিয়াতের বিশাল বোঝা দ্রুত হালকা হতে লাগল। রিকশা ভ্রমণ বাবদ বিল এলো তিন হাজার ৫০০ কিয়াত।


দ্রুত সময় ফুরিয়ে আসছে, তড়িঘড়ি করে একটা মার্কেটে গেলাম। সব কিয়াত প্রায় শেষ হওয়ার পথে। দ্রুত ইমিগ্রেশনের জন্য বন্দর ঘাটে এলাম। সব আনুষঙ্গিক কাজ সেরে উঠলাম বোটে।


শীতের বিকেল, ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। পেছনে ফেলে এলাম শত শত বছর ধরে বসবাসরত এবং ভাগ্যবিড়ম্বিত, অধিকারবঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গা মুসলমান অধ্যুষিত শহর মংডু। শত-সহস্র নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত মা-বোন, নারী, শিশু-পুরুষের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী করা শহর।


লেখক : ব্যাংকার


বিবার্তা/হুমায়ুন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com