বছরের পর বছর ধরে পথশিশুদের জন্য কাজ করছেন লুসিও
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ১২:৩০
বছরের পর বছর ধরে পথশিশুদের জন্য কাজ করছেন লুসিও
আকরাম হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+

লুসিও বেনিনাতি। শিশুদের কাছে লুসিও ভাই নামেই পরিচিতি। নিঃস্বার্থভাবে বছরের পর বছর ধরে পথশিশুদের সেবা করে যাচ্ছেন এই মানুষটি। পথের ভাসমান শিশুদের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, খেলাধুলা, চিকিৎসাসহ নানা রকম বিনোদনের ব্যবস্থা করছেন। তার হাত ধরে পথের জরাজীর্ণ আর অনিরাপদ জীবন রেখে পথশিশুদের আশ্রয় হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে। তারা ফিরছে স্বাভাবিক জীবনে। আর পাঁচ দশটা সাধারণ শিশুর মতো দেখছে আগামীর পৃথিবীর সুন্দর এক স্বপ্ন।



লুসিও বেনিনাতি জন্মগ্রহণ করেছে ইতালিতে। পড়াশোনা করেছেন ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। ইচ্ছে করলেই ভোগবিলাস আর প্রাচুর্যের মধ্যে জীবন পাড় করে দিতে পারতেন। কিন্তু ভোগবিলাসের জীবন তাকে কাছে টানতে পারেনি। বেরিয়ে পরেছেন আত্ম-মানবতার পথে।
ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের দুনিয়া রেখে গড়ে তুলছেন সহনশীলতা, প্রেম-ভালোবাসার আরেক দুনিয়া। জাতী-গোত্র-ধর্ম-বর্ণ আর দেশের সীমায় তিনি আবদ্ধ থাকেননি। বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ধনী এবং গরিবের বৈষম্য কমিয়ে নতুন এক পৃথিবীর গল্প পৌঁছে দিচ্ছেন পথে পথে।


লুসিও বাংলাদেশ ছাড়াও অধিকার বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন, ভারত, মিয়ানমার, ব্রাজিলে। শুধু বাংলাদেশেই কাজ করছে ১৯ বছর ধরে। সমাজের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর মানুষের দুঃখ-কষ্ট কাছ থেকে বোঝা ও জীবন সংগ্রাম অনুধাবনের জন্য এদেশে আসার পর থেকে থেকেছেন বস্তিতে।



লুসিও প্রথম বাংলাদেশে আসেন ১৯৮৮ সালে। ৭ বছর বাংলাদেশে থাকার পর নিজ দেশ ইতালিতে চলে যান। সেখান কিছুদিন পরিবারের সাথে কাটানোর পর পথশিশুদের সেবা করতে চলে যান ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে।


ব্রাজিল থেকে আবারো বাংলাদেশে আসার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন, কিন্তু ভিসার জটিলতার কারণে সেখান থেকে সরাসরি বাংলাদেশে আসতে পারেননি। তবুও থেমে যাননি তিনি, বাংলাদেশে আসার জন্য ব্রাজিল থেকে আসেন ভারতে। ভারতে আসার পর স্থানীয় একটা সংগঠনে মাধ্যমে পথশিশুদের নিয়ে কিছুদিন কাজ করেন। সেখান থেকে পুনরায় ২০০০ সালে বাংলাদেশে আসেন। তারপর থেকে এ দেশের পথশিশুদের সেবা করে যাচ্ছেন।


লুসিও ১৯৮৮ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসেন কাজের সন্ধানে। বাংলাদেশে আসার পর দিনাজপুরের একটি টেকনিক্যাল স্কুলে কাজ শুরু করেন।


টেকনিক্যাল জগৎ ছেড়ে পথশিশুদের সেবায় নিজেকে সপে দেযার কারণ জানতে চাইলে তিনি বিবার্তাকে বলেন, এটা ইন্টারেসটিং! আমাদের স্কুল ছিল দিনাজপুর শহর থেকে একটু দূরে। রাতে একজন স্থাসীয় শিক্ষকের সাথে আমি দিনাজপুর শহরে যেতাম। তখন দিনাজপুরের রেলস্টেশন অনেক অসহায় মানুষ দেখা যেত, অনেক পথশিশু দেখা যেত। এদের রিয়ালিটি (বাস্তবতা) দেখে আমার মনে আঘাত লাগলো, আমার খারাপ লাগলো। তখন চিন্তা করলাম এই সব মানুষদের জন্য আমাকে কিছু করতে হবে।


পথশিশুদের নিয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করার পরও সর্বশেষ বাংলাদেশকে বেঁছে নেয়ার কারণ সম্পর্কে লুসিও বলেন, ‘মানুষের মধ্যে একতা আনার জন্য বাংলাদেশ একটা ইন্টারেসটিং এরিয়া (জায়গা)। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এমনকি যারা ধর্মের বিশ্বাস করে না তারাও মনে করে শিশুরা নিষ্পাপ, তাদের জন্য কিছু করতে হবে। এই সব মানুষদের মধ্যে একতা সৃষ্টি করার জন্য, রিয়ালিটি বোঝার জন্য বাংলাদেশ ভালো জায়গা। শিশুদের সেবা করতে এসে আমরা নিজেরাও একত্রে থাকি।’


মানুষের মধ্যে একতা, সমাজে স্বেচ্ছাসেবী কাজের প্রসার, পথশিশুদের সেবা আর সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের জন্য লুসিও গড়ে তুলেছেন, ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’। ঢাকা সিলেটে ও চট্টগ্রামের নিদিষ্ট কয়েকটি স্থানে নিয়মিত অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা, ছবি আঁকা, বিনোদন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের বাড়ি পোঁছানো, প্রয়োজন হলে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়াসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন থাকেন এই সংগঠন। যে সকল শিশু পড়াশোনা এবং পথের জীবন থেকে সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে আগ্রহী তাদেরকে পুনর্বাসিত করছেন। সেখানে শিশুরা পরিবারের মত বেড়ে উঠছে।



বাংলাদেশে পথশিশুদের সেবা করতে গিয়ে কোন ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে নাকি? এই প্রশ্নের জবাবে লুসিও জানান, ‘আমাদের সংগঠনের সাতজন প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে একজন শুধুমাত্র (লুসিও নিজে) বিদেশি। মানুষ আমাদের সম্পর্কে মাঝেমধ্যে ভুল ধারণা পোষণ করে। এটা একটু খারাপ লাগে। অনেক বাঙালিরা মানুষ পরিচয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চায় না। তারা মানুষের ধর্ম দেখে, কোন দলের সাপোর্টার (সমর্থন করে) সেটা দেখে, শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে, নারী-পুরুষ দেখে, বয়স দেখে, সোশাল ক্লাস দেখে মানুষের বিচার করে। অথচ মানুষের কাজ তার বড় পরিচয় হওয়ার কথা ছিল। তবে আশার কথা, বাংলাদেশের মানুষ নৈতিক থাকতে চায়। বিভিন্ন কারণে সেটা সম্ভব না হলেও মানুষের মধ্যে সৎ থাকার চাহিদা আছে। মানুষ সৎ থাকতে চায়। অনেকের মধ্যেই অসহায় মানুষের জন্য কিছু করার প্রবণতাও আছে।’


সংগঠনের আর্থিক পরিচালনার ব্যাপারে সংগঠনের বর্তমান কো-অর্ডিনেটর কবির আপন জানান, ‘আমরা কোন ধরনের বিদেশি অনুদান গ্রহণ করি না। আমাদের সংগঠনের সদস্যদের অনুদান দিয়ে সংগঠনের বিভিন্ন কাজ চলে। অনেকেই শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমাদের আর্থিক সহযোগিতা করে।



তিনি আরও বলেন, অনেকেই আমাদের আর্থিক সহোযোগিতায় করতে চায়। তবে আমরা সবার টাকা নেই না। আমাদের কিছু নিয়ম আছে। যারা শিশুদের জন্য কিছু দিতে চায় তাদেরকে আমাদের কাজ দেখতে আসতে উৎসাহিত করি। যাতে তারা দেখতে পারে তাদের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে, পাশাপাশি পথশিশুরা কি অবস্থায় আছে সেটার বাস্তবতা বুঝতে পারে। যদি কেউ অনুদান দিয়ে ১ বছর সময়ের মধ্যে আমাদের কাজ দেখতে আসতে না পারে তাহলে আমরা তাদের টাকা ফেরত দেয়। আবার অসৎ টাকা হলে আমরা নিই না। যদি বুঝতে পারি, শিশুদের সেবা ব্যতিত অন্য উদ্দেশ্য টাকা দিচ্ছে তাহলে আমরা টাকা নেই না।


সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা লুসিও সদস্যদের ব্যাপারে জানান, ‘আমাদের সংগঠনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ রয়েছে, বিভিন্ন বয়সের মানুষ রয়েছে, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ রয়েছে। আমরা একত্রে মিলেমিশে শিশুদের সেবা করি। আমাদের মধ্যে এই কাজ ঐক্য তৈরি করতে সহযোগিতা করে। আমরা চাই পথে যেনো কোনো শিশু না থাকে। সবাই সুন্দর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুক। সবাই মিলে সকলের সহযোগিতায় আমরা নতুন সমাজ গড়ে তুলতে চাই।’


বিবার্তা/আকরাম/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com