সচিবালয় থেকে বঙ্গভবন, কতদূর কতদূর?
প্রকাশ : ২৫ জুন ২০১৯, ১৬:৫৭
সচিবালয় থেকে বঙ্গভবন, কতদূর কতদূর?
আরিফুর রহমান দোলন
প্রিন্ট অ-অ+

সচিবালয় থেকে বঙ্গভবন কতদূর? ঘুরেফিরে বারবার এই প্রশ্নটিই মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে। কেন? পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অন্তত সাত দিন ধরে না-কি ফাইল বঙ্গভবনে যাচ্ছে-এই খবর পাচ্ছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে এই খবর বেরিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালও বলেছেন, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। যেহেতু এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির চূড়ান্ত অনুমোদন লাগে তাই ডিআইজি মিজানের ফাইলটি বঙ্গভবনে পাঠানো হবে।


সচিবালয় থেকে বঙ্গভবন কতদূর মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? যে বিতর্কিত কর্মকর্তার নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে তার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ধীরগতি কেন? এই প্রশ্ন তো স্বাভাবিকভাবেই আসছে। গড়িমসি ফাইল চালাচালিতে না-কি নীতি-নির্ধারণে? একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি আইনে মামলাযোগ্য অপরাধের বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে যে নজিরবিহীন সময়ক্ষেপণ একে আমরা কী বলে ব্যাখ্যা দেবো? আমাদের আমলাতন্ত্রের ‘অদক্ষতা’, ‘স্বজনপ্রীতি’ না-কি অন্যকিছু?


এসব ক্ষেত্রে আমাদের আমলাতন্ত্রকে মোটেও অদক্ষ বলা যাবে না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের আমলারা যথেষ্টই দক্ষ। যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণই করি তাহলে এ রকম অনেক নজির সেখানেই পাওয়া যাবে। সাহারা খাতুন কিংবা ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে এক ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি হবে। কিন্তু একজন ডিআইজি যে কয় বছর ফিডার পদে থাকলে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির যোগ্য হন সেই যোগ্যতা পূরণ করতে পারছেন না। কিন্তু সরকারের কর্তাব্যক্তিদের অনেকেই চাইছেন যোগ্যতা পূরণে ব্যর্থ কর্মকর্তাই যেন অতিরিক্ত আইজিপি হন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছোটাছুটি দৌড়াদৌড়ি শুরু হলো। ডিআইজি পদ থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির জন্য এই কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা প্রমাণের (মাফ) ফাইল রাতারাতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গেল বঙ্গভবনে। এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফাইল অনুমোদন হয়ে বঙ্গভবন থেকে এলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ওই কর্মকর্তা অতঃপর অতিরিক্ত আইজিপি হলেন।


সেটি ছিল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অর্জনের বিষয়। গোটা মন্ত্রণালয় অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে ফাইলের কাজ শেষ করে নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিল। আর যখন গোটা বাহিনীর ভাবমূর্তির প্রশ্ন, আরেকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডে তখন নানা প্রক্রিয়ার কথা আসছে। অবিশ্বাস্য ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। চাইলে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সচিব আগের ফাইলে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।


বিতর্কিত ডিআইজি মিজানকাণ্ডে সাধারণ মানুষের কাছে সংশ্লিষ্টদের পারসেপশ কী! এটি কি তাঁরা পরখ করে দেখেছেন? অতি ক্ষমতাধর, প্রভাবশালীদের মুখের ওপর কেউ তো কিছু বলে না। কিন্তু আলোচনা হয় আড়ালে-আবডালে। আর পুরোটাই কিন্তু নেতিবাচক। এই যেমন গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন মহলে কথা হচ্ছে ‘অবরুদ্ধ ডিআইজি মিজান’ কোথায়? এক এনজিও কর্মকর্তা এক আড্ডায় কিছুটা হাস্যোচ্ছলে বলেন, ‘ডিআইজি মিজান অবরুদ্ধ’। মানে? আরে দেখলেন না, টেলিভিশনে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন ডিআইজি মিজানের পালানোর সব পথ বন্ধ।


অথচ পত্রিকাতেই খবর বেরিয়েছে ডিআইজি মিজানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জ্ঞাত আয় বহির্ভূত যে মামলার পর গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালিয়ে ডিআইজি মিজানকে খুঁজে পায়নি।


খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেখানে বলছেন, পালাবার সব পথ বন্ধ, সেখানে সংশ্লিষ্টকে খুঁজে না পাওয়া কতটা স্বাভাবিক? তবে কি সর্ষের মধ্যেই ভূত?


মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হলেন মন্ত্রী। মন্ত্রী শপথ নেন, সংবিধানকে সমুন্নত রাখার। রাগ-অনুরাগের বশবর্তী হয়ে তিনি কোনো কিছু করবেন না, এটাই তাঁর শপথ। তাই ধরে নেবো, মন্ত্রী মহোদয় যা বলছেন, নির্মোহ হয়েই বলছেন, ভেবে-চিন্তে বলছেন এবং তাঁর কথার গুরুত্বও অপরিসীম। অতএব, বিতর্কিত ডিআইজি মিজানকে নিয়ে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যতটুকু বলেছেন, নির্মোহ হয়েই বলেই বলেছেন সেটিই ধরে নিচ্ছি। কিন্তু কথা এবং কাজে যতটা সাদৃশ্য থাকলে ইতিবাচক পারসেপশন তৈরি হয় ডিআইজি মিজানকাণ্ডে তা-কি করা গেছে?


নারী সাংবাদিক নিগ্রহ, দ্বিতীয় বিয়েসহ নানা বিষয়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে পুলিশ সদরদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন বছরখানেকের ওপর চাপা দিয়ে কী দক্ষতার পরিচয় দিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়? এটা তো বিরাট ব্যর্থতা, দায়িত্বহীনতা এবং সেই সাথে অনেক বড় স্বজনপ্রীতি।


ডিআইজি মিজানকাণ্ডে পুলিশ সদরদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন কি তবে ‘ভুল’ ছিল? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদি সেরকম কিছু মনে করে থাকেও তাহলে পুনঃতদন্ত করলো না কেন? বিষয়টি ‘চাপা’ দিয়ে রেখে কী বার্তা সবাইকে দেওয়া হলো? এখনো কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু কাজের হচ্ছে না কিছুই। কেন? এটা কি জনগণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে না? কারা করছেন এসব? কাদের স্বার্থে?


এখন তো আবার দেখছি আবার ডিআইজি মিজানের ঘুষ দেওয়া কাণ্ড নিয়েও কচ্ছপ গতি। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন তিনি দুদক কর্মকর্তাকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। সকল টেলিভিশনে তার এই বক্তব্য প্রচারিত হয়েছে। আমাদের দেশের আইনে ঘুষ দেওয়া এবং নেওয়া ফৌজদারি অপরাধ। অথচ এই কাণ্ডের পর প্রায় দু’সপ্তাহ পেরোলেও চাকরিতে সমান বহাল ‘ডিআইজি মিজান’। আর যিনি ঘুষ নিয়েছেন বলে ডিআইজি মিজান অভিযোগ করলেন, সেই দুদক পরিচালককে ঠিকই দুদক সাময়িক বরখাস্ত করলো। তার বিরুদ্ধে নিয়মিত তদন্তও শুরু করলো প্রথম দিন থেকেই।


সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দুদকের এই বিচক্ষণতা, ক্ষিপ্রতা প্রশংসিত হচ্ছে সব মহলেই। প্রশ্ন, দুদক পারলো, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন পারলো না?


একজন কর্মকর্তাকে প্রাপ্যতার চেয়েও আর্থিক পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিনে দিনে সব ধাপ পার করে ফাইল অনুমোদন করাতে পেরেছে। বঙ্গভবন থেকে সেই ফাইল ফেরত এসেছে ২৪ ঘণ্টায়। সেই দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখ নানা প্রক্রিয়া আর ধাপ অতিক্রম করতেই দিনের পর দিন সময় নিচ্ছে। তাও আবার ফৌজদারি অপরাধ করেছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে। খারাপ নজির তৈরি হচ্ছে-এটা বোঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞান থাকার দরকার হয়? কবে প্রক্রিয়া শেষ হবে আর বিতর্কিত ডিআইজি মিজানের শাস্তির প্রস্তাব পাঠিয়ে বঙ্গভবনে ফাইল যাবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য?


সচিবালয় থেকে বঙ্গভবন, কতদূর কতদূর!


লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ঢাকা টাইমস, ঢাকা টাইমস২৪ ডটকম ও সাপ্তাহিক এই সময়।


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com