মোল্লাতান্ত্রিক ইরান বনাম মার্ক্সবাদী সোভিয়েত ইউনিয়ন
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:০১
মোল্লাতান্ত্রিক ইরান বনাম মার্ক্সবাদী সোভিয়েত ইউনিয়ন
ড. খালেদ এম. বাতারফি
প্রিন্ট অ-অ+

১৯৯৪ সালে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস সফরে, একদিন সেখানে এক ইরানী ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে দেখা ও আলাপ। মানুষটি খোমেনীশাসিত ইরানে বেশ কয়েক বছর কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে এসেছেন।


কথায়-কথায় তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, ইরানের বিপ্লবের বয়স তো এক দশকমতো হয়ে যাচ্ছে। তা শাহ আমল আর এ আমলের মধ্যে কী তফাৎ দেখলেন, বলুন তো?


জবাবে তিনি বললেন, রাজতন্ত্রীরা অন্যদের চাইতে বেশি খেতো, কিন্তু যেটুকু বাকি থাকতো, সেটা টেবিলে রেখে আসতো। আর মোল্লারা শুধু বেশিই খায় না, সব চেটেপুটে খায়। অন্য কারো জন্য কিছুই অবশিষ্ট রাখে না।


ইরানে দুর্নীতি সবসময় ছিল, তবে মোল্লাতান্ত্রিক শাসনে এটা নিকৃষ্ট রূপ নিয়েছে। প্রতিবেশীদের প্রতি ইরানের হুমকি প্রসঙ্গেও একই কথা বলা চলে। শাহ'র আমলে ইরান চেষ্টা করেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের শেরিফ হওয়ার আর মোল্লারা একদিকে বিপ্লব রফতানি করছে অন্যদিকে নিজেদের সাম্রাজ্যকে বিদ্যমান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে দিতে চাইছে।


শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ছিলেন প্রাজ্ঞতর ব্যক্তিত্ব, তাই তিনি বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছিলেন। ''রাজাদের রাজা'' অর্থাৎ শাহানশাহ হিসেবে তিনি আরব, তুর্কী ও ইসরাইলী সবার সঙ্গেই সুসম্পর্ক রেখেছিলেন। একই ভারসাম্য বজায় রেখেছিলেন তৎকালীন পরাশক্তিসমূহের সঙ্গে সম্পর্কের বেলায়ও। এমনকি পশ্চিমা শিবিরের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়েও পূর্বাঞ্চলীয় শিবিরের সঙ্গে ইরানের ছিল শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক। অন্যদিকে মোল্লারা কয়েকজন ছাড়া সব বন্ধুকেই হারিয়েছে। এ মোল্লার দল যেদেশের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করেছে, সেদেশের ওপরই গজব নেমে এসেছে - ইরাক থেকে সিরিয়া, ইয়েমেন থেকে লেবানন সবারই একই অবস্থা। ব্যতিক্রম শুধু রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও কিউবা। তবে বন্ধু হিসেবে এরা নির্ভরযোগ্য নয়।


ইরানীদের জন্য গণতন্ত্র সবসময় মরিচীকা হয়েই থেকেছে। বিংশ শতাব্দীতে তিনবার তারা এর পেছনে ছুটেছে এবং নাগালে পেয়েও ধরে রাখতে পারেনি। দেশটিতে প্রথম গণতন্ত্র আসে ১৯০৬ সালের বিপ্লবের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে তারা পায় গণতান্ত্রিক সংবিধান ও সংসদীয় শাসনব্যবস্থা। ১৯২৫ সালে এর অবসান ঘটে শাহ রেজা পাহলভীর রাজা হওয়ার মাধ্যমে। তিনি ক্ষমতা নিয়ে সংসদকে রাবার স্ট্যাম্প বানিয়ে ফেলেন। তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভী ইরানকে আধুনিক করেন, কিন্তু সব ক্ষমতা রেখে দেন নিজের হাতে। তাঁরই প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রিয় নেতা মুহাম্মাদ মোসদ্দেক ১৯৫১ সালে দ্বিতীয় বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন। এসময় তিনি সংসদের হাতে হৃত ক্ষমতা ফিরিয়ে দেন এবং শাহের কর্তৃত্ব খর্ব করেন। ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ-আমেরিকান মদদপুষ্ট এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সময়টি শেষ হয়ে যায়। ক্ষমতা ফিরে পেয়ে শাহ অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি রকমের স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন।


অপরদিকে খোমেনীর বিপ্লবের ফলে ইরান একটি সংবিধান পায় বটে, কিন্তু ওতে সকল ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয় অনির্বাচিত এক একনায়কের হাতে। সুপ্রিম লিডারই সেখানে সবকিছু। তিনি আল্লাহর নামে সবকিছুতে সই করবেন এবং সিদ্ধান্ত দেবেন কে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন আর কাকেই বা শাসনব্যবস্থার সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হবে। অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনী চলবে তাঁর কথায়। বৈদেশিক সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতেও শেষ কথা তিনিই বলবেন।


অতীতে এবং এখনও জনগণের মৌলিক চাহিদা উপেক্ষা করে এ দেশটি সামরিক খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেছে। সেটা এখন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে। শাহ'র আমলে রাজস্ব আয়ের একটা ভালো অংশ দেশকে আধুনিকায়নের কাজে বিনিয়োগ করা হতো, ব্যয় করা হতো জনকল্যাণে। শাহ'র আমলের সেসব অবকাঠামোই ইরানে এখনো বিদ্যমান এবং সেগুলোর বিন্দুমাত্র উন্নয়ন ঘটেনি। দেশটির অর্ধেক মানুষ দরিদ্র, এক-তৃতীয়াংশ বেকার এবং বেশিরভাগ মানুষই সরকারি সেবা বা ত্রাণ পায় না, পেলেও নামেমাত্র। রাজস্ব আয়ের বেশিরভাগই চলে যায় সেনাবাহিনী, বিপ্লবী গার্ড এবং বিদেশি মিলিশিয়া ও শাসকগোষ্ঠীর পেছনে।


এসব আমাকে মনে করিয়ে দেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের কথা। রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট বিপ্লব করা হয়েছিল গরীবদের নামে। জনগণ বিদ্রোহ করেছিল অবিচার, দারিদ্র্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে। তারা ভেবেছিল, কমিউনিজম মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে।


কিন্তু ক্ষমতা লাভের পর দেখা গেল, লাল ঝান্ডাধারীরা নিজেদের লোকজনের চাইতে অন্যদের সাহায্য করতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ঊঠেছে। ভিয়েতনাম ও কিউবাকে সাহায্যের নামে অপচয়ের নিচে চাপা পড়ে যায় তাদের রাষ্ট্রগঠন কার্যক্রম। কোরিয়া ও আফগানিস্তানে জড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি ভীষণ ব্যয়বহুল স্টার ওয়ারসের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা সংগীন হয়ে পড়ে।


ইরানের খোমেনী শাসকরা শান্তিতে থাকতে চায় না। ঠিক কমিউনিস্টদের মতো তারাও নিজেদের সঙ্গীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দেয় এবং সবাইকে নির্মূল করে। ১৯৮৮ সালে তারা ৩০ হাজার বিবেকবন্দীকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। এছাড়া তখন পর্যন্ত প্রতি বছর এক হাজারের বেশি ভিন্নমতাবলম্বীকে হত্যা করেছে দেশটি। এরপর তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বন্দ্বে এবং ইরাকের সঙ্গে আট বছরব্যাপী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।



ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন ইরানকে সুযোগ এনে দেয় প্রতিশোধ নেয়ার এবং তাদের প্রাচীন সাফাভিদ সাম্রাজ্য পূণঃপ্রতিষ্ঠার। তারা আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে সিরিয়া ও লেবানন, তারপর ইয়েমেনে নিয়মিত ও ভাড়াটে সৈন্য পাঠায়, তাদের আরব মিলিশিয়া ও এজেন্টদের মদদ যোগায় এবং ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নূরী আল-মালিকী ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের মতো স্বৈরাচার ও দুর্বৃত্ত শাসনব্যবস্থার পেছনে বিনিয়োগ করতে থাকে।


এ অবস্থায় ইরানের সুশীল জনসমাজ এখন চতুর্থ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত। তারা আবার চায় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও আধুনিকতা। তারা লড়ছে মোল্লাতন্ত্র, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নিজেদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে ফ্যাসিবাদী শাসনের ধারালো নখরাঘাত থেকে বাঁচাতে অন্য যে কোনো সময়ের চাইতে বেশি করে তাদের এখন বিশ্বকে পাশে পাওয়া দরকার।


সউদি গেজেট থেকে ভাষান্তর : হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী


বিবার্তা/হুমায়ুন/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com