ওয়ান ইলেভেনের তাৎপর্য
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০১৮, ২১:৩০
ওয়ান ইলেভেনের তাৎপর্য
সুমন দত্ত
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ওয়ান ইলেভেনের গুরুত্ব অনেক, যা সংক্ষেপে বলা সম্ভব নয়। বলতে গেলে ওয়ান ইলেভেনের কারণেই দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। মানুষের ভোটের অধিকার ফিরে এসেছে। স্বচ্ছ ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা পেয়েছে। রাজাকারের বিচার হয়েছে। দুর্নীতিবাজরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ওয়ান ইলেভেনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল তখনকার ক্ষমতায় বিএনপি-জামায়াতের কূটকচালীর কারণে। নিজেদের লোক দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তৈরির চক্রান্তই তাদেরকে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিল।


শুরুটা হয় সংবিধান অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে। প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ আইনজীবীরা গণমাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। আর এই মতভেদের কারণ ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তিনি একক প্রচেষ্টায় সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের বয়স বাড়ান। এই সংশোধন আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো মেনে নিতে পারেনি।


বিএনপি সুকৌশলে বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে চেয়েছিল। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ এই চক্রান্ত মেনে নেয়নি। ফলে রাজপথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ও সুষ্ঠু ভোটাধিকারের দাবিতে আওয়ামীলীগ আন্দোলনে নেমেছিল। তাদের এই আন্দোলনের মুখে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মদকে। সেদিন তার নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি উপদেষ্টামণ্ডলী তৈরি হয়। ৯০ দিনের মধ্যে সাধারণ নির্বাচন করার দায়িত্ব ছিল তাদের ওপর। কিন্তু তৎকালীন প্যারালাল সরকার হাওয়া ভবন থেকে নানাবিধ বাধা আসায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি।


অনেকটা ক্ষুব্ধ হয়েই সেদিন বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করেন। তাদের এই পদত্যাগে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় গণআন্দোলন। বিএনপি-জামায়াত বাদে সব মতের রাজনৈতিক দলগুলো একদিকে অবস্থান নেয়। এরশাদের জাতীয় পার্টি ও বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসা নেতাকর্মীদের তৈরি রাজনৈতিক দলগুলোও আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেয়। ঢাকার ভাসানী স্টেডিয়ামের পাশে মঞ্চ তৈরি করা হয়। সেখানে একাত্মতা ঘোষণা করেন তারা।


বঙ্গভবনের পাশে তৈরি করা ওই মঞ্চ থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতিকে তত্ত্বাবধায়কের পদ ছাড়ার পরামর্শ দেন। সেদিন হরতাল ও আন্দোলন কর্মসূচির কারণে দেশ স্থবির হয়ে পড়ে। এসময় জামায়াত ও বিএনপি আন্দোলন ঠেকানোর কৌশল নিলে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিপরীতমুখী দাবি নিয়ে রাজপথে শুরু হয় অঘোষিত যুদ্ধ।


এতে পুলিশের গুলিতে ওয়ার্কার্স পার্টির এক কর্মী মারা যায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী বিপরীত মতাদর্শে আন্দোলনকারীদের মুখে পড়ে। তাকে পিটিয়ে মারা হয় সেদিন। লোমহর্ষক সেই ঘটনা বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করলে সেদিন রাতে সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করে। তার আগে রাষ্ট্রপতি এক ঘোষণায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান থেকে ইস্তফা দেন। পরে সেনাবাহিনীর অধীনে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যে সরকার দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দু'বছর ক্ষমতায় থাকে।



সেই দুই বছরে সেনাশাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি স্বচ্ছ ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরি করে, যা পরবর্তীতে জাতীয় পরিচয়পত্র হিসেবে সবার মাঝে বিতরণ করা হয়। সেই সময়ে আওয়ামী লীগের দাবি ছিল একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করার, যা তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ফখরুদ্দিন আহমেদ পূরণ করেন। আর এই ভোটার তালিকা নিয়ে যে নির্বাচন হয় তাতে বিএনপি ঢাকা ও সিলেট বিভাগ থেকে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। এমনকি সংসদীয় আসন বিজয়ে তৃতীয় স্থানে থাকা জাতীয় পার্টি বিএনপিকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে। এরপর যা হয় তা আজ ইতিহাস।


লেখক : সাংবাদিক


বিবার্তা/সুমন/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com