রোহিঙ্গা ইস্যু : বাংলাদেশের করণীয়
প্রকাশ : ০২ অক্টোবর ২০১৭, ১৫:৫১
রোহিঙ্গা ইস্যু : বাংলাদেশের করণীয়
মেহেদী হাসান
প্রিন্ট অ-অ+

রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে বাম ছাত্রসংগঠনের মিছিল হয় কি-না জানি না। কারণ, অনেকদিন হলো ক্যাম্পাসে যাওয়া পড়ে না। তবে ফেইসবুকের দেয়ালে বাম ছাত্রসংগঠনের কোনো প্রতিবাদ মিছিলের খবর ও ছবি আমার চোখে পড়েনি।


ক্যাম্পাসে বাম ছাত্রসংগঠনের মিছিল দেখলে আমার ব্যক্তিগতভাবে একটু ভালো লাগত। আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের মনের অজান্তে সমতায় বিশ্বাসী, ধনী-গরীবের বিশাল বৈষম্য বিরোধী। কিন্তু কোনো সংগঠন যদি বৈষম্যবিরোধী হয় তাহলে তারা তো আরো বেশি মানবতাবাদী হওয়ার কথা, জোনায়েদ সাকী ভাইর মতো উচ্চকণ্ঠে কথা বলার কথা। রোহিঙ্গা প্রশ্নে জোনায়েদ সাকী ভাই উচ্চকণ্ঠে-নিম্নকণ্ঠে কোনো কথা বলছেন কিনা তা আমি জানি না। কারণ টেলিভিশনের খবর তেমন একটা দেখা হয় না।


আগের কথায় ফিরে যাই। বুঝে হোক না আর না বুঝে হোক, রাশিয়া আমার একটা মোটমুটি পছন্দের একটা রাষ্ট্র ছিল। এর মূল কারণ হলো আমাদের প্রজন্ম অন্য রাষ্ট্রের ওপর রাশিয়ার নির্যাতন তেমন একটা দেখেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্য পূৃর্ব ইউরোপে গণতন্ত্রকামী মানুষের উপর অনেক নির্যাতন করেছে। হাঙ্গেরী ও পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসন ধরে রাখার জন্য ওই দু'দেশের জনসাধারণের উপর মর্মান্তিক নির্যাতন চালায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন।


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে আকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করে। তার একটা বৈশ্বিক কারণ ছিলো। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভারতই এব্যাপারে কনভিন্স করেছিল।ইতার ওপর তখন চীনের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচণ্ড বাধাবাধি ছিল। তখন চীন-পাকিস্তান আপন সহোদরের মতো ছিল; সেই ল্যাঠা এখনও চুকে নাই; বরঞ্চ আরও গভীর হয়েছে। তখন চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে গালমন্দ করতেও দ্বিধা করতো না। আজকে অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত। কমনিউজম ভাব থাকলেই মানবতার পক্ষে কথা বলতে হবে - এরকম একটা নৈতিকতা আগের দিনে কিছুটা থাকলেও এখন একদম ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে। অনেককে দেখেছি রাশিয়া সিরিয়ার পক্ষে এবং আইএস ও মার্কিনীদের বিপক্ষে জোটে যুদ্ধে অংশগ্রহন করায় ভ্লাদিমির পুতিনের সিংহভাবাপন্ন ছবি ফেইসবুকের প্রোফাইলে লাগিয়ে দিয়েছে। তখন আমি মুচকি মুচকি হাসতাম। হাসার কারণ হলো যে ব্যক্তির নিজ দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নাই সেই ব্যক্তির অপরের পক্ষে মানবাধিকারের জন্য কাজ করবে শুনলে হাসিই পাওয়ার কথা। তাছাড়া সিরিয়ায় ভূমধ্যসাগরের পাড়ে রাশিয়ার নৌঘাঁটি রয়েছে। সিরিয়ার প্রসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পিতা হাফিজ আল আসাদের সময় থেকে রাশিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। এছাড়াও রাশিয়া জোর করে ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নিল। যার মধ্যে একনায়কতান্ত্রিক ভাব আছে সে কখনও অপরের ভালোর ধার ধারে না।


চীন তার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় মিয়ানমারের বিপক্ষে কথা বলবে না। বাংলাদেশের পিকিংপন্থীরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহন করে নাই। তাদের রাজনৈতিক গুরু চীন পিকিংপন্থীদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অস্ত্র ধরতে নিষেধ করায় পিকিংপন্থিরা সেদিন চিচিং ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। বর্তমান রোহিঙ্গা সংকটকালে চীনপন্থী ছাত্রসংগঠন কি নামকাওয়াস্তে হলেও কোনো মিছিল করেছে? না। তারা মায়ানমারের বিপক্ষে মিছিল নাও করতে পারে, কারণ তাদের গুরু রাষ্ট্র চীন নিষেধ করে থাকতে পারে। অবশ্য এদেশের বামপন্থি ছাত্রসমাজ মিছিল সমাবেশ করল কি করল না তাতে চীন ও রাশিয়ার কিছুই যায় আসে না।


এটা আমরা সবাই জানি যে মিয়ানমারের সাথে চীনের বিশাল অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। মিয়ানমারে চীনের তেল, গ্যাস, সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অবকাঠামো নির্মাণ তো রয়েছেই, তাছাড়া দীর্ঘ স্থল সীমান্ত প্রায় তেরশত কিলোমিটারের উপরে রয়েছে। মিয়ানমারের অন্যতম বৃহৎ প্রদেশ হলো শান। এই শান বিদ্রোহীরা স্বাধীনতা চায়। মিয়ানমার যদি চীন ঘেঁষা থেকে সরে আসতে চায় তাহলে চীন শান বিদ্রোহীদের অস্ত্র দিয়ে মিয়ানমারকে অস্থিতিশীল করে ফেলবে। আবার ভারতের অরুনাচল ঘেঁষা এবং মিয়ানমারের সাথে চীনের সীমান্ত ঘেঁষা কাচিন জাতি মিয়ানমারের থেকে স্বাধীনতা চায়। এই কাচিন জাতিকে চীন অস্থিতিশীল করতে পারে। তাই মিয়ানমার চীনের ট্র্যাপ বা ফাঁদ থেকে বের হতে পারবে না। তাছাড়া রোহিঙ্গা জাতি নিধনের জন্য INTERNATIONAL COURT OF JUSTICE ( ICJ) যে মামলা হবে তা ভেটো প্রদানের জন্য চীনকে মিয়ানমারের প্রয়োজন হবে।


রাখাইনের রোহিঙ্গা উচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে চীন ও পাকিস্তানের চাল রয়েছে। চীন রাখাইন প্রদেশে বঙ্গোপসাগরের তীরে পিউকপিউ নামক স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন করছে। চীন রাখাইন প্রদেশে অবকাঠামো নির্মাণ এবং বড় শিল্পনগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ সমস্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য রোহিঙ্গা উচ্ছেদ একান্ত প্রয়োজন। তাই বিভিন্ন কৌশলে নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি ঘটতেছে।


বাংলাদেশের করণীয়


জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কঠিন ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স কিছুটা কঠিন ভাষায় কথা বলেছে, কিন্তু এর ফল শূণ্য। চীন ও রাশিয়া তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ বেছে নিয়েছে। চীন ও রাশিয়া রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত করে বিশ্ব দৃষ্টি অন্যদিক নিয়ে যাবে। তখন বাংলাদেশ নয় লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়সহ বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে প্রতিকূল অবস্থার সন্মুখীন হবে। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।


এক্ষেত্রে একটা টিম গঠন করে বাংলাদেশের অবস্হান বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরতে হবে। বাংলাদেশেকে জোর প্রচেষ্টা চালাতে হবে প্রথমে ভারতকে সাথে নেবার। ভারতকে বুঝাতে হবে বাংলাদেশ ভারতের অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ভারতের সহযোগিতা লাগবেই। ভারত ভূ-রাজনৈতিক কারণে য়ানমারে চীনের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। ভারত বাংলাদেশের সাথে সুসম্পর্ক না রাখলে রোহিঙ্গার প্রভাব ভারতের মাটিতে পড়তে বাধ্য। এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের যে বিবিধ সমস্যা তা ভারতকে বুঝাতে হবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উদ্ভূত কোন সন্ত্রাসবাদী অথবা অন্য কোন জটিল সমস্যা ভারতের সেভেন সিস্টারসের ওপর পড়তে বাধ্য - এটা ভারতকে বুঝাতে হবে। ভারতকে বুঝাতে হবে যে পাকিস্তান সুযোগ পেলে এখানে ইনসারজেন্সি ঘটাবেই। আর এজন্য রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও ভারতকে একসাথে কাজ করতে হবে।


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com