রোহিঙ্গা সমস্যা : ঘোর সংকটেও সম্ভাবনার আলো
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১৯:৪৪
রোহিঙ্গা সমস্যা : ঘোর সংকটেও সম্ভাবনার আলো
সেলিনা শিরীন শিকদার
প্রিন্ট অ-অ+

একদল "ছায়া" এসে দাঁড়ালো গ্রামের সীমানায়। সেখানে চরে বেড়ায়্ একদল মহিষ। ওরা গোপনে মহিষের লেজে আগুন লাগিয়ে দিলো আর মহিষের দল ভয়ে-বেদনায় সারা গ্রাম লাফিয়ে হয়রান। আর এদিকে মহিষের লেজের আগুন লেগে শত শত ঘর পুড়লো, ক্ষেতের শস্য নষ্ট হলো। ছুটন্ত মহিষের দল আর আগুন দেখে দৌঁড়ে পালাতে গিয়ে গ্রামবাসী কারো হাত-পা ভাঙলো, শিশুরা কেঁদে উঠলো ভয়ে। গ্রামবাসী যখন এই তাণ্ডবে হতাহত, সেই সুযোগে ছায়াগুলো সবার নজর এড়িয়ে তাদের খারাপ উদ্দেশ্য পূরণ করে নিলো।


মিয়ানমারের (বার্মা) অবাধ্য সেনাবাহিনী যেন এমনি এক "ছায়া" চরিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্তে মাদক চোরাচালান চলে। আর এ চোরাচালানের সাথে বার্মার সামরিক বাহিনী জড়িত। সুতরাং প্রায় সময়ই তারা নানাবিধ কাণ্ডকারখানা করে থাকেন। আর এদিকে বাংলাদেশের ভেতরেও আছে একটি মহল, যারা নানাভাবে বার্মার এই অপকর্মের সাথে জড়িত।


কোকাকোলা ও দুর্নীতির বিশ্বায়নে জাতি রাষ্ট্রসংঘ সর্বস্তরেই ব্যক্তি সমাজ ও সংস্কৃতি ভূক্তভোগী। আমি মনে করি, মানুষ চাইলে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। তার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোবৃত্তি। প্রয়োজন সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট থাকা, অনুশীলন ও দক্ষতা অর্জন।


রোহিঙ্গা মিয়ানমারের (বার্মা) অনেকগুলোর মধ্যে একটি ছোট ও প্রাচীন জাতিসত্ত্বা। ওঁরা শত শত বছর ধরে সেখানেই বাস করছেন। যদিও তাদের রাজ্যের রাজসভায় সুদূর অতীতে বাংলা সাহিত্য চর্চার নিদর্শন রয়েছে, কিন্তু কোনো অবস্থায় ওঁরা বাঙালি নয়।


নানা মুণি নানা কথা বলেন। প্রত্যেকেই নিজ অবস্থান থেকেই দেখছেন। আমিও তাই।


রোহিঙ্গাদের বিষয়টি দয়া বা সহানুভূতি নয়, সহমর্মিতার জায়গা থেকে দেখা দরকার। ধর্মীয় আবেগের মধ্যে অন্ধ সমর্থন রয়েছে। এই মুহূর্তে অন্ধ সমর্থনের চেয়ে যুক্তির প্রয়োজন বেশি। তাই ধর্মীয় আবেগ নয়, মানবতাবোধ থেকেই পুরো বিষয়টি অনুধাবনের চেষ্টা প্রয়োজন।


প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা ও সরকারের প্রতি বাংলাদেশ সরকারের নীতি ও পদক্ষেপ একাধারে মানবিক ও বন্ধুসুলভ। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজ রাষ্ট্রের দায়িত্ব, জনগণ ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের বিষয়েও সম্পূর্ণ সচেতন। বাংলাদেশে এমনিতেই পাহাড় কম। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন সংকটের কারণে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এর জন্য বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবার অধিকার রাখে।


বাংলাদেশে প্রতিদিন যতো সংখ্যক শরণার্থী সমাগম হচ্ছে, এটা একটা দেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফলে ভারতে বাংলাদেশের যে বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর সমাবেশ হয়েছিলো, তা কি ভারতের ওপর একটা বিশাল চাপ ছিলো না? অবশ্যই ছিলো। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেসময় সারা বিশ্বে বাংলাদেশের জন্য সুপারিশ করেছিলেন, তেমনি বিশ্বময় বন্ধুত্ব করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্ব ছিলো দৃঢ়, লক্ষ্যে অবিচল ও বন্ধুত্বপূর্ণ।


আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে বাংলাদেশরও এরকম একটি নেতৃত্বদানের সুযোগ রয়েছে। আর বাংলাদেশের পক্ষে এমনই একটি দৃঢ় ও যুগান্তকারী নেতৃত্ব দানের জন্য দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের উচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশে থাকা।


ছোট উন্নয়নশীল দেশ হয়েও বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে পিঠ ঘুরে দাঁড়াবার সাহস দেখিয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে সফল হয়েছে। আমার বিশ্বাস, মিয়ানমারের অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে সংহত হতে সহায়তা করার মাধ্যমে এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সূক্ষ্ম রাজনৈতিক মেধা ও সৃজনশীল নেতৃত্বের পরিচয় দেবেন। বিশ্বদরবার থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ ট্রফি জয় করে নিয়ে আসা বাংলাদেশের পক্ষে এটা সম্ভব। যদিও এখন ঘোর সংকট, কিন্তু এই ঘোর সংকটেই আমি সেই সম্ভাবনাটিই দেখতে পাচ্ছি।


লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক, মনোবিজ্ঞানী ও উন্নয়নকর্মী


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com