শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তি : সমস্যা ও সমাধান
প্রকাশ : ২০ আগস্ট ২০১৭, ১৮:০১
শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তি : সমস্যা ও সমাধান
মো. শওকত হোসেন
প্রিন্ট অ-অ+

জন্মলগ্ন হতেই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারটি অবহেলা ও অমর্যাদা নিয়েই বেড়ে উঠেছে। তার সাথে নানাবিধ ষড়যন্ত্র একে অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিস হতে সুযোগ-সুবিধা-মর্যাদার ক্ষেত্রে তুলনামূলক পিছিয়ে দিয়েছে। বৃহৎ ক্যাডার হওয়া সত্বেও কাঙ্ক্ষিত জব স্যাটিসফেকশন না থাকায় এই ক্যাডারের কর্মকর্তারা জনসেবায় পুরোপুরি মনোনিবেশ করতে পারছেন না। ক্লাসরুম ছেড়ে, অফিস ছেড়ে অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় মাঠে, রাজপথে আর আদালতে দাঁড়াতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে তাদের সেবা থেকে বঞ্চিত হেচ্ছে দেশ ও জাতি । অথচ এই বৃহৎ ক্যাডারটিকে তার যথাযথ অধিকার ও মর্যাদা দিয়ে কাজে লাগাতে পারলে সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে সর্বাধিক সক্রিয় ভুমিকা রাখবে বলে আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।


শিক্ষা ক্যাডারে আছি বলেই এ ক্যাডারের সমস্যাগুলো কাছ থেকে দেখার এবং এসব নিয়ে ভাবার সুযোগ পেয়েছি। আমার দৃষ্টিতে শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তির সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক কিছু কারণ বিদ্যমান। ক্যাডার সার্ভিস হওয়া সত্বেও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে কোনো অবস্থান নির্দিষ্ট করা নেই, বদলী/পদায়নের কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান কার্যকর নেই, পদোন্নতিতে চলছে হযবরল অবস্থা। আর শিক্ষা ক্যাডারের জন্য “অবকাশ বিভাগ” শব্দটি এ সময়ের সবচেয়ে বড় কৌতুক। অবকাশ যাপনের সুযোগ নেই, কিন্তু আছে গালভরা নামের অবকাশ বিভাগ । সরকারের অন্য বিভাগগুলো সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করেন দুই দিন, অথচ শিক্ষা ক্যাডারের কলেজ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য সেটি একদিন। আরেকটি অবকাশ বিভাগ হিসেবে বিচার বিভাগের সাথে তুলনা করলে আরো করুণ চিত্র ফুটে উঠবে। গ্রীষ্মকালীন অবকাশ, শীতকালীন অবকাশ, রমজান মাসের অবকাশ যাপনের বিধান কিতাবে থাকলেও বাস্তবে নেই। বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিক্ষাবোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাসমুহের কারণে এসব ছুটি ভোগের সুযোগই পান না তাঁরা । ফলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মাঝে চরম হতাশা ও অস্বস্তি জমে আছে । অথচ ক্যাডারটিকে অবকাশ বিভাগ থেকে মুক্তি দিলেই সমস্যা চুকে যায়। অন্য ক্যাডারের মতো বদলী প্রক্রিয়া কার্যকর করা কর্তৃপক্ষের জন্য নস্যি। ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতিবিধি মোতাবেক যোগ্যদের পদোন্নতি দিলেই এ অস্বস্তি কেটে যায় নিমেষেই। সরকারের একটি সিদ্ধান্তেই ওযারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান পেতে পারে ক্যাডারটি।


এবার আসি বর্তমান সময়ে অস্বস্তির মূল কারণে। ক্যাডারটির জন্য “মরার উপর খাঁড়ার ঘা” হয়ে দাঁড়িয়েছে আত্তীকরণ সমস্যা । ক্যাডার সার্ভিসে আত্তীকরণ এক চরম অন্যায় ও অবিচার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে এমন একটি সুস্থ ও সুন্দর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সিভিল সার্ভিসকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন, যারা বিশ্বমানের সক্ষমতা সৃষ্টি, দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত সরকারি নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে নবপ্রতিষ্ঠিত দেশের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে পূরণ সক্ষম হবে। এ জন্য তিনি The Services (Reorganization and Conditions) Ordinance, 1975 নামে ১৯৭৫ সালে XXII নং অধ্যাদেশ জারি করেন। পরবর্তীতে এটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করেন এবং The Services (Reorganization and Conditions) Act, 1975 নামে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হয়। এ আইনের ৪ নং অনুচ্ছেদবলে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে ১৯৮০ সালে তৎকালীন সরকার ১৪টি ক্যাডার সৃষ্টি করে The Bangladesh Civil Services (Reorganization) Order, 1980 জারি করেন। সংশোধনীর মাধ্যমে ক্যাডার সংখ্যা ৩০-এ উন্নীত করা হয়। একটি ক্যাডারের ধরণ, পদের ধরণ ও পদ সংখ্যা নির্দিষ্ট করার জন্য প্রত্যেকটি ক্যাডারের জন্য একটি করে ক্যাডার কম্পোজিশন রুল প্রণয়ন করে ০১/০৯/১৯৮০ তারিখেই তা জারি করা হয়। এর মধ্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষার জন্য প্রযোজ্য রুলটি হলো The Bangladesh Civil Service (Education : General Education) Composition and Cadre Rules, 1980 । ক্যাডারে বা ক্যাডার পদে জনবল নিয়োগের স্বীকৃত নিয়মিত উপায় ২টি হলো - ১.সরাসরি নিয়োগ ও ২. পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ। ১৯৮১ সালে বিসিএস ক্যাডার পদে নিয়মিত নিয়োগের জন্য সরকার The Bangladesh Civil Service Recruitment rules, 1981 এটি সব ক্যাডারের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। এই রুলসেও নিয়োগের ধরণ বলা হয়েছে ২টি ১। সরাসরি নিয়োগ (ধারা ৪), ২। পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ (ধারা ৫)।


**জনবল নিয়োগের কাজটি করে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান The Bangladesh Public Service Commission (পিএসসি)। বিসিএস ক্যাডারে সরাসরি নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের একমাত্র বৈধ উপায় হলো বিসিএস পরীক্ষা এবং যেটি নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য ১১/০৫/১৯৮২ তারিখে BCS (Age, qualification & Examination for direct recruitment) Rules, 1982 নামে সরকার কর্তৃক একটি পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা বিধিমালা প্রণীত হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য বিধি মোতাবেক প্রিলিমিনারী, লিখিত, মনস্ত্বাত্ত্বিক, মৌখিক ও স্বাস্থ্যপরীক্ষা যোগ্য বিবেচিত হলে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে।


লক্ষ্য করুন, প্রথমতঃ ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস ১৯৮০ ধারা ৬ এ নিয়োগের ধরণ বলা হয়েছে ২টি - ১। সরাসরি নিয়োগ ২। পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ। আবার ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ তে নিয়োগের ধরণ বলা হয়েছে ২টি ১। সরাসরি নিয়োগ (ধারা ৪) ২। পদোন্নতির মাধ্যমে নিয়োগ (ধারা ৫)। আত্তীকরনের কোন সুযোগ নেই।
দ্বিতীয়ত, ১৯৮১ সালে জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের জন্য একটি বিধি তৈরী করা হয়, যেটা Teachers and Non Teaching Stuff of Nationalized Colleges Absorption Rules, 1981 নামে পরিচিত। এই বিধিতেও জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের ক্যাডার ভূক্ত করার কোন সুযোগ নেই। তাদেরকে কলেজ জাতীয়করনের তারিখ হতে চাকুরী গণনায় সিনিয়রিটির বিষয় উল্লেখ আছে সেটাও তাদের মধ্যে।


তৃতীয়তঃ ১৯৯৮ সালে জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের জন্য Teachers and Non Teaching Stuff of Nationalised Colleges Absorption Rulls, 1981 বাতিল করে স্বপদে আত্তীকরণ বিধিমালা ১৯৯৮ প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিতেও জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের তারা অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ/ যিনি যে পদেই থাকবেন সে পদে আত্তীকরন করা হয়, কিন্তু ক্যাডারভূক্ত করার কোনো সুযোগ নেই।


চতৃর্থতঃ ২০০০ সালে জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের জন্য জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষক অশিক্ষক কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০০০ নামে একটি বিধি প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিতে একটি ধারা ৯(২) সংযোজন করে ক্যাডার সার্ভিসকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে । যেখানে আত্তীকরণ বিধি ১৯৯৮ প্রণয়নের সময় বাতিলকৃত বিধি Teachers and Non Teaching Stuff of Nationalised Colleges Absorption Rulls, 1981 এর জ্যেষ্ঠতা ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয় এবং ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস ১৯৮০ ও ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ এর পরিপন্থীভাবে তাদেরকে ক্যাডাভূক্ত করা হয়। ফলে ওই সময়ে ২০০০ বিধিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও ১৯৮১ বিধিতে সুবিধা দিয়ে পিএসসির মাধ্যমে সরাসরি নিয়োইয়প্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তাদের উপরে সিনিয়রিটি দেয়া হয়েছে। ফলে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে।


সরকারি চাকুরীতে আত্তীকরণ আর ক্যাডার সার্ভিসে আত্তীকরণ এক বিষয় নয়। আমরা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই । প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের পর জনবল সরকারি চাকুরীতে আত্তীকরণ হতে পারে। মানবিক কারণে তাদের অর্থিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া যেতে পারে। তবে ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস ১৯৮১ মোতাবেক পিএসির মাধ্যমে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন ব্যতীত ক্যাডারভূক্তির কোনো সুযোগ নেই। সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগ প্রাপ্তির সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি বিদ্যমান। ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগের জন্য সরকারি কর্মকমিশনের অধীনে লক্ষ লক্ষ প্রার্থীর মধ্য হতে প্রিলিমিনারী, লিখিত, মনস্তাত্ত্বিক, মৌখিক, স্বাস্থ্যগত ও নিরাপত্তাগত যাচাই-বাছাইয়েরে পর প্রকৃত মেধাবীদেরকে ক্যাডারে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া এসব অনুসরণ করে না । তারাও আমাদের মতো বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য সাংবিধানিকভাবে অধিকারী ছিলেন। বেশিরভাগেরই বিসিএস পরীক্ষা দেবার যোগ্যতা ছিল না। যারা বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছেন তারা অংশগ্রহণ করে অনুত্তীর্ণ হয়েছেন অথবা প্রিলিমিনারীতেই বাদ পড়েছেন অথবা চূড়ান্তভাবে ক্যাডারে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হয়েছেন। শেষতক যেনতেন প্রক্রিয়ায় একটি বেসরকারি কলেজে শিক্ষক তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে রেখেছেন। সরকারের জাতীয়করণের সিদ্ধান্তের সুযোগে তারা রাতারাতি ক্যাডার কর্মকর্তা হতে চাচ্ছেন। মেধার যথাযথ মূল্যায়ণ না করে ভিন্নপথে ক্যাডারভুক্তির এই পথ এখনই বন্ধ করা না গেলে প্রকৃত মেধাবীদেরকে শিক্ষা ক্যাডার হতে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করবে। ফলে দেশে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পরতে পারে।


সিভিল সার্ভিস হিসেবে সব ক্যাডারই সমান সুবিধা, সম্মান মর্যাদা পাবার অধিকারী। কিন্তু তা না হওয়াতেই শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা দিন দিন তাদের প্রতি অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, ফুঁসে উঠছে, অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় আন্দোলনমুখী হচ্ছে। যেহেতু ক্যাডার রিক্রুটমেন্ট রুলস, ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস অনুযায়ী ক্যাডারে আত্তীকরণের কোনো সুযোগ নেই, ক্যাডার সার্ভিসের অন্য কোনো ক্যাডারে এভাবে ক্যাডারভুক্তকরণের কোনো নজির নেই, তাই যেনতেনভাবে এ ধরনের ক্যাডারভূক্তি শুধু শিক্ষা ক্যাডার নয়, গোটা ক্যাডার সার্ভিসের অমর্যাদা। আর এই প্রক্রিয়ায় ক্যাডারভুক্তকরনণই শিক্ষা ক্যাডারে অস্বস্তির মূল কারণ।


সুতরাং ক্যাডার বৈষম্য দূরীকরণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনা, অনুশাসন ও শিক্ষানীতি-২০১০ এর আলোকে কলেজ জাতীয়করণ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট কলেজ শিক্ষকদেরকে ক্যাডার বহির্ভূত রেখে তাদের নিয়োগ, পদায়ন প্রদান্নতির জন্য আলাদা সার্ভিস করাই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান।


লেখক : সহকারি অধ্যাপক (২৪তম বিসিএস), সদস্য সচিব, ক্যাডার মর্যাদা রক্ষা কমিটি


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com