প্রথম আলো বনাম আম আদমির বদনকিতাব
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ১৭:২৮
প্রথম আলো বনাম আম আদমির বদনকিতাব
শেখ আদনান ফাহাদ
প্রিন্ট অ-অ+

কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বারবার প্রচার করে জনমত তৈরি করে এজেন্ডা সেট করার ক্ষমতা গণমাধ্যমের আছে। এর উদ্দেশ্য ভালো হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। উদ্দেশ্য ভালো হলে আমরা বলব গঠনমূলক সাংবাদিকতা আর উদ্দেশ্য খারাপ হলে বলব অপসাংবাদিকতা বা জনপ্রিয় অর্থে হলুদ সাংবাদিকতা।


ভুল তথ্য দিয়ে যদি কোনো রিপোর্ট হয় তাহলে তার রিজয়েন্ডার দেয়া যায়, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কী করা যায়? একটি-দুটি রিপোর্ট হলে তার প্রতিবাদ আপনি করতে পারেন। কিন্তু কোনো বিশেষ মিশন নিয়ে কোনো পত্রিকা কাজ করলে সেখানে ভিকটিম কীভাবে এই বিষমাখা তীর সামলাবেন?


দেশে এখন বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সংবাদপত্র আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, একক সংবাদপত্র হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে চলেছে দৈনিক প্রথম আলো। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সংবাদের নিজস্ব উপাদানের কোনো মূল্য প্রথম আলোর কাছে নেই। প্রথম আলো নিজেই সংবাদের মূল্য নির্ধারণ করে। প্রকৃত অর্থে প্রথম আলো যেন নিজেই এক ‘রাষ্ট্র’।


এত বড় ক্ষমতা যার, সে পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা ধীরে হলেও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দিন দিন।
অনেক ঘটনা কাছ থেকে দেখার পরে আমার উপলব্ধি হল, যে ঘটনায় আপনি নিজে উপস্থিত আছেন, পরদিন প্রথম আলোয় তার কাভারেজ দেখলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবাক হবেন - কী দেখলেন, আরকী লিখল দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকটি! কিছু নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কী এক অনবদ্য পেশাদারিত্বে প্রথম আলো নিজেই একটা বাস্তবতা তৈরি করতে পারে! আর যে ঘটনায় আপনি উপস্থিত থাকবেন না, সে ঘটনার সংবাদ আপনি প্রথম আলোতে পড়লে মনে হবে, আপনি বাইবেল পড়ছেন, সন্দেহ করার প্রশ্নই ওঠে না!


এই বিশ্বাসযোগ্যতা প্রথম আলো অর্জন করে নিয়েছে। অনেক অপকর্মের পরেও লাখ লাখ পাঠকের মনে আজো প্রথম আলো রাজত্ব করে চলেছে। কিন্তু সে রাজত্ব আর আগের মতো নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, দেশে বুদ্ধিমান লোকের সংখ্যা যত বাড়বে, প্রথম আলোকে বিশ্বাসকারী লোকের সংখ্যা তত কমবে।


সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাবে - এমনটা ভাবার লোক খুব কম ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালে ওই এই বিশাল দেশটি ভেঙ্গে গিয়েছিল। পৃথিবীও একদিন ধ্বংস হয়ে যাবার কথা রয়েছে বলে আমরা জানি।


মিডিয়াকে বলা হয় কোনো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। এই স্তম্ভটি নিরপেক্ষতা ও বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে কাজ করবে - এটাই আমাদের প্রত্যাশা। জানি, বস্তুনিষ্ঠতা আকাঙ্ক্ষিত হলেও শতভাগ অর্জনযোগ্য নয়। তাই বলে কি অর্জনের প্রচেষ্টা থেমে যাবে? বাস্তবে বস্তুনিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা কেউই করে না। তবে একজন করেছিলেন ইতিহাসে, তিনি হলেন গ্রামবার্তা প্রকাশিকার কাঙাল হরিনাথ। অর্থের অভাবে যার পত্রিকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।


বিশাল বিশাল পুঁজির এই পৃথিবীতে রাজনৈতিক অর্থনীতির নানা মারপ্যাঁচে সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠছে নোংরা রাজনীতির হাতিয়ার। তারচেয়েও বড় বিপদজনক বিষয় হল, মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো মনে করে, তাদের চালাকি আম আদমি ধরতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতা হল আম আদমির আছে বদনকিতাব (ফেসবুক) কিংবা ইউটিউব। ইন্টারনেটভিত্তিক গণমাধ্যমের যুগে একজন আম আদমিও যে তথ্য-প্রমাণসহ বোমা ফাটাতে শিখে গেছে। মূলধারা কোনো মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে অপসাংবাদিকতা করলে সাথে সাথেই ফেসবুকে শুরু হয় পাল্টা তথ্যপ্রবাহ।


মূলধারার সংবাদমাধ্যম অর্থাৎ চতুর্থ স্তম্ভের সকল মিথ্যাচার, অপসাংবাদিকতার জবাব দিয়ে চলেছে পঞ্চম স্তম্ভের স্বীকৃতি পাওয়া নানা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট। ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা সামাজিক মাধ্যমের যে কী শক্তি, তা মাঝে মাঝেই প্রত্যক্ষ করছি। কাল যেমন করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে এক বিশাল মানববন্ধন হয়েছে সেখানে। প্রথম আলোর মত জায়ান্টরা হয়ত জেনেছেন, এ মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা সবাই ভালোবাসার তাগিদে এসেছেন। প্রথম আলোর রিপোর্টার নিশ্চয় আশেপাশে ছিলেন, চেষ্টা করেছেন কাজে লাগানো যাবে এমন কোনো তথ্য পেতে। পাননি, পেলে আমরা রিপোর্ট দেখতাম বিশাল কাভারেজসহ।
আমার শিক্ষক অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের বিরুদ্ধে চলমান অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নিয়েছি সে কাঠফাটা দুপুরে। পুরো আয়োজনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মফিজুর রহমান স্যার। বিভাগের এলামনাই এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মফিজ স্যার এই মানববন্ধনের ডাক দিয়েছিলেন। শুধু ফেসবুকে প্রচার চালিয়ে দু/একদিনের প্রচারণায় বিশাল গেদারিং হয়েছিল অপরাজেয় বাংলাকে ঘিরে। কাউকে কেউ জোর করেনি, শুধু দায়িত্ববোধ আর ভালোবাসার শক্তিতে এত বড় সমাবেশ সংঘটনে সক্ষম হয়েছে এলামনাই। শ্রদ্ধেয় সালাম স্যার, নাদির জুনাইদ স্যার, রোবায়েত ফেরদৌস স্যার, শফিউল আলম স্যার, সামিয়া ম্যাডাম, মনসুর স্যার, শাওন্তি ম্যাম, সাবরিনা ম্যামসহ অনেকেই এই বিশাল মানববন্ধনে অংশ দিয়েছেন। আমার এত ভালো লেগেছে! নানা হলের প্রভোস্ট, বিভাগের সভাপতি ও শিক্ষকরা এসে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। একে বলে ইনিশিয়েটিভ। উদ্যোগ নিয়েছেন মফিজ স্যার, এগিয়ে এসেছি আমরা সবাই। সাবেক, বর্তমান সবাই। যারা আয়োজক তারাই সমাবেশের সাইজ দেখে অবাক হয়েছেন! বদনকিতাবে ইভেন্ট করেই এত মানুষ! ফেসবুকে আর ইউটিউবের শক্তিতে প্রতিটি মানুষ যে একেকটি গণমাধ্যম হয়ে উঠতে পারে, এই সত্য কি এখনো এই মূলধারা টের পায়নি?


ভালো যেমন আমার লেগেছে, আবার আফসোসও করেছি। জাহাঙ্গীরনগর নিয়ে প্রথম আলোর ভূমিকা কতখানি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা আমি গবেষণা করে প্রমাণ করতে পারব। তিলকে তাল করা, স্বচ্ছ পানিকে ঘোলা করে সেখানে বড় বড় মাছ শিকার করার কাজ মাঝে মাঝেই করে প্রথম আলো। ছাত্র-ছাত্রীদের আমি বলি, অপেশাদার ‘সত্যবাদী’ থেকে পেশাদার ‘মিথ্যাবাদী’ কোনো কোনো ক্ষেত্রে দারুণ সফল, তবে এ সাফল্য সাময়িক, চূড়ান্ত অর্থে সত্যেরই জয় হয়। যেমন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়য়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবিরকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও প্রথম আলোর বিরাট ‘সফল’ ভূমিকা ছিল। তার পরিণতি পরবর্তীতে ছাত্র-ছাত্রীরা ভোগ করেছে। বর্তমান উপাচার্যকে নিয়েও প্রথম আলো এবং অন্যান্য অনেক গণমাধ্যমের অপসাংবাদিকতা লক্ষ্য করেছি। একটা উদাহরণ দিই। বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের ১০/১২ জন শিক্ষক যখন কোনো বিশেষ দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন করেন তখন পত্রিকাগুলোর উচিত তাদের নাম, সংখ্যা ও পরিচয় সঠিকভাবে তুলে ধরা। কিন্তু কোনো কোনো পত্রিকা কী করে? এমনভাবে সংবাদ পরিবেশন করে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো শিক্ষকসমাজই এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে! ছাত্রলীগ/ছাত্রদল মিছিল করলে লিখে ছাত্রলীগ/ছাত্রদল করেছে। কিন্তু বিশেষ কিছু ছাত্রসংগঠন করলে লিখে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন!


প্রথম আলোর মত শক্তিশালী গণমাধ্যম যখন এভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংবাদিকতা করে তখন অন্যান্য হাউজও প্রভাবিত হয়। ভুল করে যে এমন হয় না, সেটাও আমরা বুঝি। প্রকৃত বাস্তবতার বাইরে গিয়ে নতুন আরেকটি বাস্তবতা হয়, যার প্রভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। জাহাঙ্গীরনগরের সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবিরের সময় উপাচার্যের পক্ষের প্রায় ২৫০ শিক্ষকের একটি মানববন্ধনকে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবির আন্দোলন বলে চালিয়ে দিয়েছিল কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম। স্বস্তির বিষয় হল , মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারচেয়েও বড় কথা বদনকিতাব (ফেসবুক) এসে মানুষকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে। আম আদমি নিজেই নিজের ছবি তোলে, ক্যাপশন লেখে, এমনকি রিপোর্ট লিখে দিয়ে দিচ্ছে বদনকিতাবে।


সরকারবিরোধী হওয়া ভালো, কিন্তু রাজনীতি-বিরোধী কিংবা গণতন্ত্রবিরোধী হওয়া ভালো নয়। এতে রাষ্ট্রক্ষমতায় অগণতান্ত্রিক শক্তি আসতে পারে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে দীর্ঘদিন এজেন্ডা সেট করেছে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ কিছু পত্রিকা। সুশীল সমাজ, বিএনপি-জামাত জোট, মার্কিন দূতাবাসসহ আরও কিছু গোষ্ঠী একই ভাষায় কথা বলে গেছে দিনের পর দিন। কী লাভ হয়েছে তাতে? বিএনপি-জামাত নিজেরাই এখন আর তত্ত্বাবধায়ক কনসেপ্ট চর্চা করে না। অথচ এই ইস্যুতে বিএনপি-জামাতের সহিংসতায় মারা গেল পুলিশসহ বহু মানুষ।


অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় প্রথম আলোসহ কিছু গণমাধ্যমের মূল টার্গেট হল আওয়ামীলীগ। আওয়ামীলীগকে এরা সর্বতোভাবে ব্যর্থ প্রমাণ করতে চায়। তাই কখনো পিলখানাকে বেছে নেয়, কখনো বেছে নেয় সেনানিবাস, কখনো বেছে নেয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। প্রথম আলো, সিপিডি, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, মার্কিন দূতাবাস, ডক্টর ইউনুস, বিএনপি-জামাত, বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশে বসবাস করে যারা পাকিস্তান ও ভারতের দালাল হিসেবে কাজ করে, এরাই নানা সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে বিব্রত করতে চায়। রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে সরকার পরিবর্তন করে যার যার লক্ষ্য পূরণ করতে চায়। নিজস্ব নানা স্বার্থে কখনো কখনো তাদের ফাঁদে পা দেয় আওয়ামীলীগ পরিচয়ধারী কিছু শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী। যেমন অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক-বিরোধী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন নীল দলেরই কয়েকজন অধ্যাপক। অথচ বিরোধীদলে সবাই মিলে-মিশেই কিন্তু ক্লাসরুম ও রাজনীতির ময়দান সামলিয়েছেন।


ইরাক ইস্যুতে বিবিসি-সিএনএনের ভূমিকা, ওয়ান ইলেভেনে প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার পত্রিকার ভূমিকা কিংবা পদ্মাসেতু ও বিশ্বব্যাংক ইস্যুতে এদের ভূমিকা পর্যালোচনা করলেই উপরের সব বক্তব্যের মাজেজা বোঝা সহজ হবে বলে মনে করি।


আওয়ামীলীগ আজীবন ক্ষমতায় থাকুক, এমনটা বিরোধীরা না চাইতেই পারেন, কিন্তু স্বাধীনতা-বিরোধী মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামাত ক্ষমতায় আসুক এমনটা চাওয়ার নৈতিক অধিকার কারো নেই। আমাদের মা-বোনদের যারা ধর্ষণ করেছে, পাক-বাহিনীর হাতে যারা তুলে দিয়েছে তাদের ক্ষমতায় আসার রাস্তা তৈরি করার কোনো রাজনৈতিক বা নৈতিক অধিকার কারো নেই। কে না জানে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অস্থিতিশীল হলে সরকার পতনের কাজ অনেকখানি এগিয়ে যায়। তাই ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে আপনারা রাষ্ট্রকেই হুমকির মধ্যে ফেলছেন কি না, আবার ভেবে দেখুন।


লেখক : সাংবাদিক ও শিক্ষক


বিবার্তা/মৌসুমী/হুমায়ুন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com