নকশালবাড়ি আন্দোলন কি এখনও প্রাসঙ্গিক?
প্রকাশ : ২৮ মে ২০১৭, ১৬:৪৬
নকশালবাড়ি আন্দোলন কি এখনও প্রাসঙ্গিক?
প্রতীকী ছবি
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

সিপিআইএম বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) ভেঙে তৈরি হয় সিপিআই (এমএল) বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। এই দলের নেতা চারু মজুমদার, সুশীতল রায়চৌধুরী, কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতালের বক্তব্য ছিল, স্বাধীনতার পর দু দশক ধরে সংসদীয় রাজনীতি কমিউনিস্টদের বিপ্লবী চরিত্র নষ্ট করে দিয়েছে। তাই সংসদীয় রাজনীতিতে থাকলে সর্বহারা মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়।


নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতা চারু মজুমদার চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সে তুং-এর মতাদর্শে বিশ্বাস করতেন। তিনি মনে করতেন, শ্রমিক-কৃষকের যা প্রাপ্য, তা আবেদন-নিবেদনের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। এ জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হবে। এই নকশালপন্থিদের চোখে ভূস্বামী কিংবা শিল্পপতিরা শোষক শ্রেণি, খেটে খাওয়া মানুষ শোষিত। তাই চারু মজুমদারের নীতি, শ্রেণিশত্রুদের খতম করতে হবে। এই রক্তপাতের মাধ্যমেই একদিন 'বিপ্লব' সম্পন্ন হবে, শাসনক্ষমতা আসবে খেটে খাওয়া মানুষের হাতে।


১৯৬৭ সালে উত্তরবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামে সহিংস আন্দোলনের প্রথম স্ফূলিঙ্গ দেখা যায়। সেই গ্রামে কৃষকরা আইন হাতে তুলে নেন। ভূস্বামীদের উৎখাত করে জমির ওপর নিজেদের 'অধিকার' প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর দীর্ঘদিন ধরে চলে শ্রেণিশত্রুদের খতম এবং জবাবে নকশাল দমনের নারকীয় খেলা। সবই আজ ইতিহাস।


সেই নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি এবছর। এটা এমন এক সময়ে, যখন একদিকে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থি দলগুলির জনভিত্তি ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে, আবার অন্য কয়েকটি রাজ্যে চরম বামপন্থি সংগঠন এখনও সক্রিয়। তাই প্রশ্ন উঠছে, এই উদার গণতন্ত্রের যুগে সশস্ত্র সংগ্রাম কতটা প্রাসঙ্গিক?


ভারতে সংসদীয় পথে সক্রিয় বামপন্থিরা এখন মাত্র দু'টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে – কেরালা ও ত্রিপুরা। এছাড়া বিরোধী শক্তি হিসেবে শুধু পশ্চিমবঙ্গেই বামপন্থিদের ক্ষমতা বলার মতো। বামেরা যখন ক্রমশ জমি হারাচ্ছে, অন্যদিকে জঙ্গলমহলে সক্রিয় হচ্ছে সশস্ত্র বামেরা। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়সহ বিভিন্ন রাজ্যে ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে নকশালপন্থি বা মাওবাদীরা। অর্থাৎ ১৯৬৭ সালে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতে এখনও টিকে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধিকিধিকি জ্বলছে সশস্ত্র বামপন্থার আগুন। ছত্তিশগড়ে সম্প্রতি একাধিক হামলায় মাওবাদীরা মেরে ফেলেছে আধাসামরিক বাহিনীর জওয়ানদের।


কিন্তু কেন? গত শতাব্দীর ৭০ কিংবা ৮০-র দশকে, যখন কমিউনিস্ট সোভিয়েতের অস্তিত্ব ছিল, তখন নকশালপন্থি আন্দোলন বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ পেয়েছিল। কিন্তু সোভিয়েতের পতনের ফলে সেই পরিস্থিতি আর নেই। প্রায় তিন দশক আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়েছে। পতন হয়েছে কমিউনিস্ট পূর্ব ইউরোপের। বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে নির্বাচন ও গণতন্ত্র এখন সর্বজনস্বীকৃত। বন্দুকের নলের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা দখল করার বদলে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের রীতিই জনপ্রিয় হয়েছে দেশ দেশে। কমিউনিজমের পতাকা হাতে নিয়েই বাজার অর্থনীতির রাস্তায় চলেছে চীন। একই অবস্থা কমিউনিস্ট ভিয়েতনাম বা কিউবার।


এতোকিছু সত্ত্বেও কোন জাদুবলে আজও ভারতে চরম বামপন্থি আন্দোলন টিকে রয়েছে, সেই প্রশ্ন নকশালবাড়ি আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।


প্রাক্তন বামপন্থি নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর বক্তব্য, ‘‘মানুষ যেদিন থেকে এটা বুঝেছে, ভোটের মাধ্যমে অপছন্দের শাসককে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব, সেদিনই সশস্ত্র আন্দোলন গুরুত্ব হারিয়েছে। তাই মানুষের এখন আস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি।’’


সংসদীয় পথে যাঁরা এখন লাল পতাকা নিয়ে আন্দোলন করেন, তাঁদের বামপন্থি বলেই মানতে রাজি নন এই মন্ত্রী। তবে এসব দলকে খারিজ করলেও বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করেননি তিনি। তার কথায়, ‘‘যতদিন পৃথিবীতে শোষণ-নিপীড়ন থাকবে, ততদিন বিদ্রোহ-বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা ফুরোবে না।’’


পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট আমলের শেষ পর্যায়ে পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় মাওবাদী তৎপরতা ভীষণ বেড়ে গিয়েছিল। ২০১০ সালের আগে ও পরে বহু বামপন্থি নেতা-কর্মী সশস্ত্র বামেদের হাতে খুন হয়েছেন। বিভিন্ন জায়গায় আধাসামরিক বাহিনী আক্রমণের মুখে পড়েছে। ২০১১ সালে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি বদলেছে। পশ্চিমবঙ্গে বহুদিন মাওবাদী তৎপরতার খবর নেই, অনেক নেতা-নেত্রী সরকারে যোগ দিয়ে মূল স্রোতে মিশে গেছেন।


নকশালপন্থিদের দু'টি গোষ্ঠী পিপলস ওয়ার গ্রুপ ও মাওবাদী কমিউনিস্ট সেন্টার (এমসিসি) মিলে তৈরি করেছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী)।এরা এখন বিভিন্ন রাজ্যে সক্রিয় হলেও নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ হবে বলে মনে করেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অমল মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘সংসদের বাইরে এ ধরণের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন আদতে সন্ত্রাসবাদে পরিণত হয়। মানুষ খুনের রাজনীতি সফল হতে পারে না। পাঁচ দশক আগে মতাদর্শের যে শক্তি ছিল, আজ আর নেই।’’


অবশ্য এ কথা বললেও ১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ি আন্দোলনের সূত্রপাতকে ঐতিহাসিক বলেই মনে করেন তিনি। বলেন, ‘‘চারু মজুমদার গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার যে ডাক দিয়েছিলেন, সে সময়ের নিরিখে তার তাৎপর্য ছিল। কিন্তু ক্রমশ এই আন্দোলন বিপথগামী হয়ে যায়। প্রেসিডেন্সি কলেজ চরমপন্থি আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তাই নকশালবাড়ির উত্থান ও পতন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ আমার হয়েছে। এই আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে আমার বহু উজ্জ্বল ছাত্র হারিয়ে গেছে। যাদের মোহভঙ্গ হয়েছে, তারা এখন বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।’’


সিপিএম নেতা ও সাবেক বাম সরকারের মন্ত্রী মানব মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘অতীতের নকশালপন্থিরা এখন বৃহত্তর বাম আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গেছেন। তাই সেই অর্থে নকশালবাড়ির অনুসরণে সশস্ত্র সংগ্রাম বলে কিছু নেই। তবে, মানুষ যদি মনে করে গতানুগতিক রাজনৈতিক পথে তাদের দাবি পূরণ হচ্ছে না, তাহলে আজও তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিতে পারে। নেতৃত্ব সবসময় আন্দোলনের পথনির্দেশ দেবে, এটা ঠিক নয়। নিপীড়িত মানুষই প্রয়োজন অনুসারে রাজনৈতিক কর্মসূচি বেছে নিতে পারে। কিন্তু তাই বলে সশস্ত্র আন্দোলন করে সরকার বদলে দেব, এটা রাজনৈতিক পথ হতে পারে না।’’ সূত্র : ডয়চে ভেলে


বিবার্তা/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com