শেখ মনি: বাংলাদেশের ম্যাকিয়াভেলিয়ান ‘প্রিন্স’
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১১:২০
শেখ মনি: বাংলাদেশের ম্যাকিয়াভেলিয়ান ‘প্রিন্স’
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

আজ ৪ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ নামক এই মৃত্তিকার ম্যাকিয়াভেলিয়ান ‘প্রিন্স’ হিসাবে খ্যাত অনন্য প্রতিভার অধিকারী শেখ ফজলুল হক মনির ৮১তম জন্মদিন। ১৯৩৯ সালে এই দিনে টুঙ্গিপাড়ায় পিতা মরহুম শেখ নূরুল হক ও মা শেখ আছিয়া বেগমের (বঙ্গবন্ধুর বড় বোন) ঘরে জন্মগ্রহণ করেন সময়ের সাহসী ও মেধাবী এই মানুষটি। শেখ মণি ১৯৫৬ সালে ঢাকা নব কুমার ইনিষ্টিটিউট থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৮ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৬০ সালে তিনি বরিশাল বিএম কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। একই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্র হয়ে ১৯৬৩ সালে এমএ পাশ করেন।


শেখ মনি লেখাপড়া করার সময় থেকেই সক্রিয়ভাবে ছাত্ররাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৬০ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ৬২ সালে কুখ্যাত হামিদুর রহমান কমিশনের বিরুদ্ধে সংগঠিত শিক্ষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে শেখ মনিকে গ্রেফতার করা হয়। ছ'মাস বিনা বিচারে আটক থাকার পর তিনি মুক্তি লাভ করেন। গণবিরোধী শিক্ষানীতি ও ছাত্রদের উপর দমন নীতির প্রতিবাদে ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তদানীন্তন কুখ্যাত গভর্নর মোনায়েম খানের হাত থেকে ডিগ্রি সার্টিফিকেট না নেয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগে শেখ মনির এমএ ডিগ্রি কেড়ে নেয়া হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তিনি ডিগ্রি ফিরে পান। এর কিছুদিন পরেই তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তদানীন্তন পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে ১৯৬৫ সালের শেষ নাগাদ কারাগারে আটক রাখা হয়।


শেখ মনির রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় কৃতিত্ব ১৯৬৬ সালের ৭ জুনে ৬ দফার পক্ষে হরতাল সফল করে তোলা। তখন ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ মাজহারুল হক বাকি– আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ঢাকা- নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ কর্মীদের পথসভা ও গেট সভা করতে বললেন এবং সমস্ত ঢাকাকে ১১টা ভাগে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন করে দিলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে মুনিরুল ইসলাম, আলী আহমেদ (চুনকা ভাই), গোলাম মূর্শীদ (এস.সি.এ), আনসার সাহেব, চকবাজারের রিয়াজুদ্দিন ও নাজিরা বাজারের সুলতান সাহেব, ফজলুর রহমান, নিজাম সাহেব পুরাতন ঢাকার। নতুন ঢাকার কর্মীদের পরিচালনা জন্য আনোয়ার চৌধুরী, ময়েজউদ্দিন আহমেদ, নুরুল ইসলাম। মিসেস আমেনা বেগম ও গাজী গোলাম মোস্তফা সবকিছু দেখা শুনা করার দায়িত্ব দিলেন। ছাত্রদের ১১টা গ্রুপের সার্বিক নেতৃত্বের ভার দিলেন মিজান চৌধুরীকে। তেজগাঁও, আদমজী পোস্তগোলাসহ শ্রমিকদের তিনি সংগঠিত করেছিলেন। এমনকি মানিক মিয়া বললেন, ইত্তেফাকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও তিনি পিছপা হবেন না। তিনি আরো আশ্বাস দিলেন, হরতালের কর্মসূচি যাতে করে সব কাগজে ছাপা হয় তার জন্য প্রভাব বিস্তার করবেন। বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে জানতে চেয়েছেন হরতালের প্রস্তুতি কতদূর কি হলো? গভীর রাতে পিছনের দেওয়াল টপকিয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তার মামিকে সবকিছু বিস্তারিত জানিয়ে বললেন, রাতের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর নিকট খবর পৌঁছে দাও হরতাল হবেই। ওই হরতাল সফল না হলে বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম পিছিয়ে যেত। মোনায়েম খান শেখ মনিকে গ্রেফতার করেন; তিনি মুক্তি পান ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সফল হওয়ার পর। ( সূত্র: ৭ জুন ১৯৭২ বাংলার বাণী)



শেখ মনি ছিলেন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা। সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী শেখ মনি, সত্তরের নির্বাচনী কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন, পাকিস্তানের প্রতিটি প্রদেশকে ৬ দফাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন, ব্যাংক-বিমা ও ভারী শিল্প, বৈদেশিক বাণিজ্য, পাট ও তুলা ব্যবসা জাতীয়করণ, পূর্ব পাকিস্তানের জায়গিরদারি, জমিদারি ও সর্দারি প্রথার উচ্ছেদ, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ, শ্রমিকদের ভারী শিল্পের শতকরা ২৫ ভাগ শেয়ার ও বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন ইত্যাদি। (স্মরণীয়-বরণীয়, ব্যক্তিত্ব, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-পৃ:৪৬১)।


শেখ মনি ষাটের দশকে বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত স্বাধীনতা আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিউক্লিয়াস বাহিনীর পরিকল্পক ছিলেন, তেমনি ১৯৭১ সালের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে মুজিব বাহিনী গঠনের অন্যতম প্রণেতা ছিলেন। এই ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও আজ বুঝতে পারি, কেন মনি ভাই মুজিব বাহিনী গঠন করে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন। গোলাম আযমও যখন ভাষা সৈনিক, বঙ্গবন্ধুর খুনিরা যখন মুক্তিযোদ্ধা, এমনকি ‘বীর উত্তম’, রাজাকারের গাড়িতে যখন পত পত করে উড়ে জাতীয় পতাকা তখন মুজিব বাহিনী গঠনের প্রয়োজন ছিল বৈকি?


আলোচনা ও সমালোচনা যে একটা শিল্প তিনি সেটা তার বক্তৃতা ও লেখনীর মাধ্যমে বহুবার মুন্সিয়ানাগিরির পরিচয় দিয়েছেন। আব্দুল গাফফার চৌধুরী সম্পর্কে বলেন, দোহাই গাফফার ভাই গোস্বা করবেন না। আপনার নিবন্ধে আপনি বাংলার বাণীর হিম্মতের কথাটি তুলেছেন। এটা যদি কমপ্লিমেন্ট হয়ে থাকে তাহলে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আর যদি এটা খোঁচা মারার জন্য আপনি লিখে থাকেন তবে আমি বিনয়ের সাথে বলছি, আমার অবস্থা আপনার থেকে কোনক্রমেই সুবিধাজনক নয়। আপনার যোগ্যতা আছে, মেধা আছে, আছে অভিজ্ঞতা এবং পেশার ব্যাপারে সুনাম। একটা গেলে আর একটা পেয়ে যাবেন। আর ওই একই কাজ করে আমাকে হারাতে হবে জাত। একবার হারালে আর ফিরে পাবো না। জানেনইতো আমার শত্রু সংখ্যা এদেশে আপনার চাইতে অনেক বেশি। (২৭ এপ্রিল, ১৯৭৩ বাংলার বাণী)



আবার এনায়েত উল্লাহ খানের অপপ্রচারের জবাবে তিনি বলেন, শেখ মনিরা জীবন বাজী রেখে মোনায়েমের কারাগারে অশেষ নির্যাতন আর ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে ভুঁইফোঁড় হিসেবে তাদের আবির্ভাব ঘটেনি। পরাজিত রাজনৈতিকদের গ্লানিও তাদের নেই। বাংলার বাণী বাংলাদেশে যদি আজ কোনো সত্য আসন দখল করে থাকে তাহলে স্বাধীনতা সংগ্রামে তার বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য, কারো পৃষ্ঠপোষকতার জন্য নয়। ভুলে যান কেন আপনারা যখন চায়ের কারবার করেছেন আমি তখন যুদ্ধ করেছি। আপনি যখন স্ত্রীর সাথে মোনায়েমের গুণ্ডার পার্টনারশিপ বাগিয়েছেন আমি তখন জেল খেটেছি। আপনি যখন তেল কোম্পানির নকর ছিলেন আমি তখন আন্দোলন চালিয়েছি। আর আপনি যখন হামিদুল হক চৌধুরীর হেরেমে সাংবাদিকতার তালিম নিচ্ছিলেন, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রাম শুরু করেছি। (১৯৭৩ সালের ১ অক্টোবর বাংলার বাণী)


তিনি বাঙালি সংস্কৃতির উপাসক ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক বাংলার বাণী, বাংলাদেশ টাইমস এবং বিনোদন পত্রিকা সাপ্তাহিক সিনেমার সম্পাদক ছিলেন। শাপলা কুঁড়ির আসরের প্রতিষ্ঠাতা। তার রচিত বেশ কিছু রাজনৈতিক উপন্যাস পাঠক সমাজে-সমৃদত হয়েছে। একটি উপন্যাস অবলম্বনে ‘অবাঞ্ছিত’ নামে একটি জনপ্রিয় টেলিফিল্মও তৈরি হয়েছে। এছাড়া "গীতারায়" নামে গল্পগ্রন্থ বেশ জনপ্রিয় ছিল।


শেখ মনি নতুন পত্রিকা বের করার পিছনে দুটো যুক্তি দেখান (১) মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য ও সঠিক ইতিহাস সংবাদপত্রের মাধ্যমে তুলে না ধরলে স্বাধীনতা শক্তি সুযোগ পেলেই আঘাত হানবে এবং বিভ্রান্ত করবে দেশের সাধারণ মানুষকে। (২) সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দোহায় দিয়ে সাংবাদিকের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হবে। তখনকার বাংলাদেশ পেক্ষাপটে তার দুটো যুক্তিই ছিলো অত্যন্ত সময় উপযোগী। (শেখ মনি- এম এ মুফাজ্জল, দৈনিক নিউ নেশন সম্পাদক)।



সংবাদপত্রের মালিক অনেকেই হতে পারেন। টাকা থাকলেই হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যেমন্টা হচ্ছে। কিন্তু সাংবাদিকতা পেশার ব্যাক গ্রাউন্ড নিয়ে যারা এসেছেন তাদের সংখ্যা খুব কম। মাওলানা আকরাম খাঁ, তফাজ্জল হসোন মানিক মিয়ার নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয়। শেখ ফজলুল হক মনি তাদেরই মত উদ্যোক্তা ছিলেন। যেহেতু তিনি নিজে সাংবাদিকতা করে সংবাদপত্র প্রকাশ করেছেন সেজন্য পেশার প্রতি ছিল তার ঐকান্তিক ভালবাসা।সংবাদপত্রকে তিনি শিল্প হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। (সাংবাদিক মনি ভাই, রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, দৈনিক ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রধান সম্পাদক)।


তিনি মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী অস্থির যুবসমাজকে সৃজনশীল খাতে প্রবাহিত করতে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র গণতন্ত্র, শোষণমুক্ত সমাজ অর্থাৎ সামাজিক ন্যায়বিচার, জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা অর্থাৎ সকল ধর্মের মানুষের স্ব স্ব ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের অধিকার তথা জাতীয় চার মূলনীতিকে সামনে রেখে বেকারত্ব দূরীকরণ, দারিদ্র বিমোচন, শিক্ষা সম্প্রসারণ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং যুবসমাজের ন্যায্য অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ১১ই নভেম্বর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে শেখ মনি বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের মধ্য থেকে স্বাধীনতা ও প্রগতিকামী যুবক ও যুব মহিলাদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে একটি সুশৃঙ্খল সংগঠন গড়ে তোলাই ছিল যুবলীগের মাধ্যমে তার উদ্দেশ্য।


বিশ্ব রাজনীতির ওপর তার প্রগাঢ় জ্ঞান ছিল। তার লেখা প্রবন্ধ ‘বিপ্লবের পরে প্রতিবিপ্লব’ আসবে পড়লেই বুঝা যায় তিনি বিশ্ব রাজনীতির সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার পেক্ষাপট। রুশ নেতা ক্রেনেস্কি জারের রাজাকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেছিলেন। তার কাছ থেকেই ক্ষমতা কেড়ে নিলেন লেনিন। অথচ রাশিয়ায় লেনিনের চেয়ে ক্রেনেস্কির জনপ্রিয়তা ছিল বেশি। তবুও যে সে সফল হলো তার প্রধান কারণ জারের শাসনের পর রাশিয়ার প্রশাসনযন্ত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল ক্রেনেস্কি নিজের লোক দিয়ে সেটা পূরণ করার ফুরসত পাননি বা সুযোগ নেননি। পক্ষান্তরে লেনিন সেই শূন্যতার সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন নিজের সপক্ষে কমিউনিস্ট বিপ্লবের অনুকূলে। জার সরে গেল। সমাজবাদী (!) ক্রেনেস্কি বিতাড়িত হলো কিন্তু লেনিন বেঁচে রইল নতুন রাশিয়ার জন্মের মধ্য দিয়ে। ইতিহাসের পাতায়, বিশ্বের সমাজবাদী আন্দোলনের ধারা বিবরণীর ছত্রে ছত্রে তার নাম মুদ্রিত হলো, ‘মহান লেনিন’ হিসেবে।



আরো স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও কেন ইন্দোনেশিয়ার নেতা ড. সুকর্ণের পতন হলো। ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণো ক্ষমতায় এসেছিলেন বিপ্লবের পথ ধরে, যুদ্ধের পরে। তার দেশে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। সুকর্ণো কেবলমাত্র নব্য ইন্দোনেশিয়ার জন্মদাতাই নন, তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বযুগের ইন্দোনেশীয় ব্যক্তিত্বের মধ্যে সব চাইতে উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, সব চাইতে চাকচিক্যময় মহাপুরুষ। ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে, জনতার মনে এবং বিশ্বের মনীষীদের দৃষ্টিতে তিনি এতটা শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন যে, অনেকে তার মধ্যে দৈবশক্তির, ঐশী প্রভাবের মাহাত্মা আরোপ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। অথচ সেই সুকর্ণো আজ হারিয়ে গেলেন ইতিহাসের পাতা থেকে। বিশ্ব নাট্যমঞ্চের সব চাইতে দুর্দমনীয় প্রতিভাবান নায়ক একদিন মঞ্চের উপর দুমড়ে পড়লেন আকস্মিক, অভাবিত মূহুর্তে। হতবাক বিশ্ব, বিস্ময়, বিমূঢ় ইন্দোনেশিয় জনগণ, অবাক বিস্ময়ে দেখলো, সুকর্ণো আর তার দেশের কর্ণধার নন। যা কেউ কল্পনায়ও আনেনি, বা কেউ ভাবতে পারেনি, বাস্তবে তাই ঘটে গেল।


এই পতন বঙ্গবন্ধুর বেলায়ও হতে পারে বলে সন্দেহ করেছিলেন তিনি। তার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারই একটি রাষ্ট্র। মানুষ এখানে দরিদ্র। মধ্যবিত্তের উচ্চাভিলাষ এখানে অপরিমিত, স্বাধীনতার শত্রুরা এখানে তৎপর, পুরনো আমলারা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রে পুনর্বাসিত। সুতরাং সময় থাকতে রোগ ধরা না গেলে দাওয়াইটিও কেউ খুঁজবে না এবং একজন সংবাদপত্র সেবী হিসেবে সে দায়িত্ব আমাদেরই। (১২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২ বাংলার বাণী)


মোনায়েমের আমলা দিয়ে মুজিবের শাসন চলতে পারে না। এই শিরোনামে মনি ভাই উপ-সম্পাদকীয় লিখেছিলেন। যে লেখা নিয়ে তোলপাড় হয়েছিলো প্রশাসনে। আমলারা একযোগে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ছুটে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে অভিযোগ নিয়ে। একজন মন্ত্রী টেলিফোন করে মনি ভাইকে বলেছিলেন, এ ধরনের লেখা প্রশাসনকে দুর্বল করবে। আমলারা আমাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। মনি ভাই বলেছিলেন, আজ হয়তো ক্ষমতায় থাকার জন্য আমার সমালোচনা করছেন কিন্তু মনে রাখবেন অল্প দিনের মধ্যেই বুঝতে পারবেন এই প্রশাসন কার। তখন অনেকেই মনি ভাইকে ভুল বুঝতেন। তারা মনে করতেন তিনি বোধকরি বিকল্প কোন শক্তির উন্মেষ ঘটাতে চাচ্ছেন। এই ধরনের অভিযোগ বঙ্গবন্ধুর কাছেও করা হতো। সিনিয়র মন্ত্রীরা নিলিশ জানাতেন। ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর আমলাদের অবস্থা কি হয়েছিল তা অনেকেরই জানা। খন্দকার মুশতাকের পেছনে ১৫ আগস্টের দিন জুম্মার নামাজ আদায়ের জন্য আমলাদের রীতিমত প্রতিযোগিতা ছিল। (মনি ভাই, অকৃতজ্ঞ থেকে গেলাম- মতিউর রহমান চৌধুরী,মানব জমিনের সম্পাদক)



‘দূরবীনে দূরদর্শী’র লেখাগুলো পড়ে উপলব্ধি করেছি শেখ মনির কলামে ছিল যথার্থ লেখকের ক্ষমতা। গদ্য শৈলীর প্রশ্নে বঙ্কিম চন্দ্রের মতো অনুপেক্ষণীয় গদ্যের বড়গুণ সরলতা এবং স্পষ্টতা। শেখ মনির কলামগুলোতে তার নিজস্ব মত সরল-সাবলীলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তার কথার সপক্ষে তথ্যের সন্নিবেশে কোনো ঘাটতি নেই। তিনি তাত্ত্বিকও ছিলেন। তত্ত্ব এসেছে অভিজ্ঞতা ও অধীত বিদ্যার উৎসমূল থেকে।


বারবারই তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবন সংশয়ের ব্যাপারটি ভাবছিলেন। তাই বলেন, ‘আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের জনতার আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভাবনা-চিন্তা আমাদের সাধের বাংলাদেশটিকে কেন্দ্র করে। বঙ্গবন্ধুর জীবন আমাদের মতো একটি সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সমস্যা সঙ্কুল দেশের মানুষের জন্য অশেষ মূল্যবান। চীন, রাশিয়া, আমেরিকার জনগণের দৃষ্টিতে সেখানকার নেতাদের জীবনের চেয়েও মূল্যবান। মাও সে-তুং না থাকলে, নিক্সন না থাকলে বা ব্রেজনেভ, কোসিগিন না থাকলে সেখানে আজ আর সমস্যা হবে না। কারণ সেখানকার সমাজ আজ একটা পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য সড়ক নির্মাণ হয়ে গেছে। আমরা কেবল শুরু করেছি। আবর্জনা সাফ করে আমাদের যাত্রা পথ তৈরি হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন সেই পথপ্রদর্শক কাণ্ডারি। খোদা না করেন, তাকে যদি আমরা হারাই, তাহলে বাংলার এই সাড়ে সাত কোটি দুঃখী মানুষের ভাগ্যে কি আছে! সুতরাং জাতীয় স্বার্থেই তার জীবনের জন্য যে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে তারচেয়ে শতগুণ কঠোর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা দরকার ছিল।’ (দূরবীনে দূরদর্শী- পৃ:১২৩)।


বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫-এ জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক দল বাকশাল গঠনের পর শেখ ফজলুল হক মণি বাকশালের অন্যতম সম্পাদক নির্বাচিত হন।


শেখ ফজলুল হক মণি ব্যক্তি জীবনে ২ পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শেখ ফজলে সামস্ পরশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইংরেজিতে মাস্টার্স এবং পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকেও ইংরেজিতে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে অধ্যাপনা করছেন। কনিষ্ঠ পুত্র শেখ ফজলে নুর তাপস একজন তরুণ ব্যারিস্টার ও ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, নিউ মার্কেট (ঢাকা-১২) এলাকা থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য। তিনি বঙ্গবন্ধু মামলার অন্যতম আইনজীবী ছিলেন।



কোনো নিরাপত্তা দিয়েই আমরা বঙ্গবন্ধু ও শেখ মনি ভাইকে ধরে রাখতে পারিনি। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে শেখ ফজলুল হক মণি ও তার স্ত্রী বেগম আরজু মণি (বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নি) শাহাদাৎ বরণ করেন।


শেখ মনির রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তার দূরদর্শিতা যদি আমরা কাজে লাগাতে পারি, তাহলেই তাকে স্মরণ করা সার্থক হবে।


লেখক: মুক্তাদিউর রহমান শিমুল
(সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ)


বিবার্তা/জহির

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com