বাস-ট্রেন-লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের স্রোত
প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৮, ১৪:০৭
বাস-ট্রেন-লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের স্রোত
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

দরজায় কড়া নাড়ছে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি বাড়ির পানে ছুটছে মানুষ। তিন দিন আগে থেকে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরু হলেও তাতে ঈদের ভিড়ের আবহ ছিল অনেকটা কম।


কিন্তু বুধবার প্রকৃত ঈদযাত্রার চিত্র দেখা গেছে রাজধানীজুড়ে। সকাল থেকেই রাজধানীর প্রতিটি বাস টার্মিনালে ছিল নীড়ে ফেরা মানুষের স্রোত। বাদ যায়নি ট্রেন স্টেশন ও লঞ্চঘাটও। ঘরমুখো মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে এসব স্টেশন।


অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত হাজারো বিড়ম্বনা যেন পিছু ছাড়ে না ঘরমুখো লাখো মানুষের। তবুও স্বজনদের সান্নিধ্য পেতে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা আর উচ্ছ্বাসই বলে দিচ্ছে যে ঘরে ফেরার আনন্দ তাদের কতটা। ঈদ মানে ঘরে ফেরার উৎসব। দৈনন্দিন ব্যস্ততা ভুলে ঈদ আনন্দ উদযাপন করতে কয়েক দিনের জন্য বাড়ি ফিরছেন সবাই। আর এই বাড়ি ফেরাতেই যেন সব আনন্দ তাদের। শত বিড়ম্বনা, ভোগান্তি উপেক্ষা করে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন তারা।


নিরাপদ ও আরামদায়ক যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রতি বছরের মতো এবারো অতিরিক্ত যাত্রী সামাল দিতে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চ মালিক সমিতি।


গাবতলীতে বাস টার্মিনালে মানুষের ঢল:


আপনজনদের সঙ্গে ঈদ করতে যাওয়া মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে। বুধবার সকাল থেকেই ঘরে ফেরা মানুষের জনস্রোতে পরিণত হয়েছে গাবতলী বাস টার্মিনালে।


দূরপাল্লার বাসগুলো আসন পূর্ণ করে ঢাকা ছেড়েছে। এছাড়া ঢাকার আশপাশের জেলাতে যাওয়ার বাসগুলোতেও ছিল যাত্রীদের চাপ। সব মিলে ঘরে ফেরা মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।


যারা টিকিট পেয়েছেন তারা নিশ্চিন্তে বসে থাকলেও রাস্তায় যানজটের একটা আশঙ্কার ছাপ দেখা গেছে তাদের চোখেমুখে। আবার যারা টিকিট নিতে পারেননি তারা ছুটছেন বিভিন্ন কাউন্টারে। অনেকে কষ্ট করে টিকিটের দেখা পেলেও এজন্য গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে হবে এমন আশায় বেশি দামেই টিকিট কাটছেন অনেকে।


গাড়ি আসতে দেরি করার অনেক বাসকে বিলম্বে ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। তবে অন্যান্যবার যেমন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো আজ তেমন অপেক্ষা করতে হয়নি যাত্রীদের। এসব যাত্রীদের অধিকাংশই চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থী।সময়ের হেরফের হলেও বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির দূরপাল্লার বাসগুলো যাত্রী বোঝাই করে ছাড়ছে টার্মিনাল।


গাবতলীর সাকুরা পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম জানান, মঙ্গলবার বিকেল থেকেই মূলত যাত্রীদের চাপ বাড়তে শুরু হয়েছে। আজ বুধবার সকাল থেকে সেই চাপ আরো বেড়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সমস্ত অফিস গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাবে, তাই আজকের চেয়ে আগামীকাল আরো চাপ বাড়বে।


মহাখালী বাস টার্মিনাল:


রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, বুধবার ভোর থেকেই যাত্রীরা ভিড় করছেন টার্মিনালটিতে। কেউ বসে আছেন অগ্রিম টিকিট কাটা বাসের অপেক্ষায় আর কেউবা আছেন টিকিট পাওয়ার অপেক্ষায়।


অভিযোগ রয়েছে, কাউন্টার থেকে ইচ্ছে করেই বিক্রি হয়ে গেছে বলে অগ্রিম টিকিট আটকে রাখা হচ্ছে। এরপর যাত্রীর চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে।



কমলাপুর রেলস্টেশন:


এবার বাস স্টেশনের চেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে কমলাপুর রেলস্টেশনে। বুধবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, মানুষ আর মানুষ। কাঙিক্ষত ট্রেন স্টেশনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাগ, লাগেজ হাতে নিয়ে মানুষ ছুটছেন সেদিকে। দরজা দিয়ে ঢুকতে না পেরে অনেকে জানালা দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছেন। ট্রেন আসার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো ট্রেন মানুষে ভরে যায়।


এদিকে আজ বুধবার থেকে ঈদের বিশেষ ট্রেন চালু করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। যাত্রী ভোগান্তি কমাতে প্রতি বছরের মতো এবারো এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঈদের প্রথম বিশেষ ট্রেনটি সকাল পৌনে ৯টায় দেওয়ানগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এবারই প্রথমবারের মতো ঢাকা-খুলনা-ঢাকা রুটেও বিশেষ ট্রেন চলবে।


রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রতিদিন সকাল সোয়া ৯টায় কমলাপুর থেকে লালমনিরহাটের উদ্দেশে একটি এবং রাত ১২টা ৫ মিনিটে খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে একটি বিশেষ ট্রেন। রাত ১০টা ৫০ মিনিটে পার্বতীপুরের উদ্দেশে একটি এবং রাত সোয়া ৯টায় রাজশাহীর উদ্দেশে ছেড়ে যাবে একটি বিশেষ ট্রেন।


খুলনা রুট ছাড়া বাকি রুটগুলোর বিশেষ ট্রেন ঈদের পর সাত দিন চলাচল করবে। ট্রেনগুলো ক্ষেত্র বিশেষে কয়েকটি স্টেশনে থামবে।


সূত্র আরও জানায়, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে বাংলাদেশ রেলওয়ে সব সময় ঈদ স্পেশাল সার্ভিস চালু করে। গত ১০ জুন থেকে স্পেশাল ট্রেনের টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে, যা এখনো চলমান। ঈদের পর সাতদিন ধরে এই ট্রেন চলবে। এসব ট্রেনের ফিরতি টিকিট নিজ নিজ স্টেশনে পাওয়া যাবে।


লঞ্চেও ভিড়, বিশেষ সার্ভিস শুরু:


ঈদ উৎসব উপলক্ষে স্বজনদের কাছে ছুটতে শুরু করেছে মানুষ। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে দক্ষিণাঞ্চলবাসীর সবচেয়ে প্রিয় লঞ্চযাত্রা। আর এই যাত্রাকে নিরাপদ ও আরামদায়ক করতে প্রতি বছরের মতো এবারো অতিরিক্ত যাত্রী সামাল দিতে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিআইডব্লিউটিএ এবং লঞ্চ মালিক সমিতি।


বিআইডব্লিউটিএর সূচি অনুসারে, আজ বুধবার থেকে চলবে লঞ্চের স্পেশাল সার্ভিস। অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটএ) চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।



বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ বরিশাল নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, ঈদে ভাড়া বেশি নেয়া হয় না। তবে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি নেয়া হয়। তারপরও সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কম নেয়া হচ্ছে। এরপরও যদি কোনো অভিযোগ আসে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।


বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল ও যাত্রী পরিবহণ সংস্থার সদস্য সচিব সিদ্দিকুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, ঈদের সাত দিন আগে থেকে লঞ্চের ডেকের যাত্রীদের জন্য সদরঘাটে স্থাপিত টিকিট কাউন্টারে টিকিট বিক্রি চলছে। অতিরিক্ত যাত্রীদের কথা বিবেচনা করে বুধবার থেকে স্পেশাল লঞ্চ সার্ভিস চালু করা হবে।


তবে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্যান্য সময়ে চেয়ে যাত্রীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলেও এখনো ভিড় মাত্রাতিরিক্ত হয়নি। দুপুরের পর থকে ভিড় শুরু হবে। ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যাবে আগামীকাল। তবে নিয়মিত লঞ্চের পাশাপাশি বিশেষ স্পেশাল সার্ভিস প্রস্তুত থাকবে। প্রয়োজনে স্পেশাল সার্ভিসের লঞ্চগুলো ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছেড়ে যাবে।


গত ৮ জুন থেকে চলছে লঞ্চের ডেকের যাত্রীদের জন্য টিকিট বিক্রি। যদিও ওই টিকিট সংগ্রহে নেই অতিরিক্ত চাপ। তবে ডেকের টিকিট সহজে পাওয়া গেলেও যত ঝক্কি কেবিন বা প্রথম শ্রেণির টিকিট প্রাপ্তিতে।


এদিকে এবার ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা আগের চেয়ে স্বস্তিদায়ক হবে এমন আশার কথা শুনিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, এবার রাস্তা গত কয়েক বছরের চেয়ে অনেক ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিং প্রবেলম নেই। রাস্তার কারণে যানজটের আশঙ্কা কম।


ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচলে ধীরগতি:


ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশের তিন কিলোমিটার জুড়ে যানবাহন চলাচলে ধীরগতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সকাল থেকেই গাড়ির বাড়তি চাপই এই ধীরগতির কারণ। মেঘনা সেতু থেকে শমসের আলী ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত যানবাহন চলছে ধীরগতিতে।


এদিকে হাইওয়ে পুলিশ বলছে, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে যানজট নিরসনে কাজ করছে তারা। বাড়তি যানবাহনের চাপ এবং অপ্রশস্ত সড়কের কারণে এই অবস্থা সষ্টি হয়েছে।


বিবার্তা/শারমিন/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com