‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চুরিতে দেশের কেউ জড়িত নয়’
প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ১৬:৩০
‘বাংলাদেশ ব্যাংকে চুরিতে দেশের কেউ জড়িত নয়’
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা ৮১ মিলিয়ন ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি যাওয়ার দু’বছর পেরিয়েছে। এরই মধ্যে তদন্তও অনেকখানি এগিয়ে গেছে।


তদন্তে দেখা গেছে দেশের কেউ এই হ্যাকিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বরং বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঘটনার ভিক্টিম। নিউইয়র্ক টাইমস ও আল জাজিরায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও এফবিআই এর গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।


এফবিআই’র প্রতিবেদনের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থার ত্রুটির সুযোগ নিয়ে দেশের বাইরে থেকে হ্যাকাররা এই চুরির ঘটনা ঘটায়। এক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের কথাই প্রতিবেদনগুলোতে ওঠে এসেছে।


ফিলিপাইনের ব্যাংক আরসিবিসি এই অর্থ পাচারে সহযোগিতা করেছে। পাচারকৃত অর্থের একটি অংশ এরই মধ্যে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহযোগিতায় বাংলাদেশ ফিরেও পেয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সত্ত্বেও এ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে অনেক বিতর্ক হয়েছে।


দেশের অনেক ‘স্বনামধন্য’ ব্যক্তিরা প্রমাণ ছাড়াই বাংলাদেশ ব্যাংকের নীরিহ সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মকর্তাদের দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। তবে এসব প্রচারণা এখন আর ধোপে টিকছে না। সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইম ম্যাগাজিন এবং কাতারভিত্তিক আলজাজিরা টেলিভিশন দীর্ঘ তদন্ত শেষে দুটো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।


তাতে পুরো হ্যাকিং প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে ফিলিপিনের আরসিবিসি ব্যাংক থেকে অর্থপাচার হয়ে যাবার ঘটনাগুলোর বিষদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।


দুটো প্রতিবেদনের কোথাও বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা যে দায়ী রয়েছে এমন কোনো তথ্য আসেনি। বরং বলা হয়েছে কোনো দুর্বল টার্মিনালের মাধ্যমে গোলমেলে ওয়েব সাইট অথবা ইমেইল অ্যাটাচমেন্ট দিয়ে ব্যাংকের কম্পিউটারে প্রবেশ করেছিল হ্যাকাররা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল।


এরা সুনিপুণভাবে সাইটটির স্ক্রিনভিউ ব্যবহার করেছিল; মাসের পর মাস নিজেদের লুকিয়ে রেখে ওরা ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যকলাপ বুঝে নিয়েছিল।


আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্সের মাধ্যমে তারা কর্মকর্তাদের পাসওয়ার্ড সংগ্রহ করেছিল এবং ক্রমেই নেটওয়ার্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র দখল করে সুইফ্ট সার্ভারে তাদের পথ খুঁড়ে নিয়েছিল। এতে আরো বলা হয়, হ্যাকাররা চাইনিজ নিউইয়ার, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তাহান্তের ছুটির সুযোগ নিয়ে লেনদেনের অর্ডার দিয়েছিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা প্রিন্টারটি কারিগরিভাবেই অকেজো করে দিয়েছিল।


তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা যতক্ষণে এই হ্যাকিংয়ের বিষয়টি টের পান ততক্ষণে হ্যাকাররা ফিলিপিনের অপরাধী ব্যাংকের সহায়তায় প্রায় পুরো অর্থই নগদায়ন করে অন্যত্র সরিয়ে ফেলে।


বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে ‘স্টপ পেমেন্ট’ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাও ফিলিপিনের ব্যাংকটি গ্রাহ্য করেনি। ব্রিটিশ, রাশিয়ান, মার্কিন তদন্তেও একই তথ্য মিলছে। এফবিআই থেকেও অনুরূপ প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে। এফবিআই এর তদন্তে সকল প্রতিবেদনেই বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘ভিকটিম’ বলা হচ্ছে।


অথচ আমাদের দেশের প্রভাবশালী কয়েকজন অপরিণামদর্শী ব্যক্তির অবান্তর কথাবার্তার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তাদের সামাজিক ও মানসিক বিপর্যয়ই শুধু ঘটানো হয়নি, ফিলিপিনের অপরাধী ব্যাংকটিও এসব কথা এখন তাদের পক্ষে ব্যবহার করছে।


সেজন্যে ও দেশ থেকে বাকী টাকা ফেরত আনা বেশ কষ্টকর হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সর্বশেষ এসব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও এফবিআইয়ের প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হ্যাকিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়া উচিত বলে পর্যবেক্ষকরা মত দিচ্ছেন।


এখন ফিলিপিনের ওই ব্যাংক এবং যেসব ইন্টারমিডিয়েটের (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক) মাধ্যমে এই অর্থ লেনদেন হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা করা দরকার।


টাকা উদ্ধারে এই মূহুর্তে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো জোরালো তৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।


প্রতিটি আন্তর্জাতিক ফোরামে উপস্থিত হয়ে ফিলিপিন সরকার এবং সে দেশের অ্যান্টিমানিলন্ডারিং কাউন্সিলের অকার্যকর ভূমিকার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ফাইনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের সাবেক উপ-প্রধান ম. মাহফুজুর রহমান। একই সঙ্গে কালবিলম্ব না করে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার জোর তাগিদ দেন তিনি।


বাংলাদেশ ব্যাংকের সবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ বলেন, সাম্প্রতিক এসব আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ ছিল এই ঘটনার শিকার। অথচ বেশ কিছু স্বার্থাণ্বেষী মানুষ এই বিষয়টি নিয়ে অবান্তর মন্তব্য করে বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে ফেলেছেন। এই প্রতিবেদনগুলো পড়ে তাদের এখন অনুতপ্ত হওয়া উচিত।


বিবার্তা/সোহান

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com