‘মুক্তামনির পরিবার ভেবেছিল আর লাভ হবে না’
প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৮, ১৩:১২
‘মুক্তামনির পরিবার ভেবেছিল আর লাভ হবে না’
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

শিশু মুক্তামণিকে দাফন করা হবে আজ বুধবার বাদ জোহর। ছোট্ট শিশুটিকে চিরশায়িত করার প্রস্তুতিই চলছে তাদের সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কামারবায়সা গ্রামের নিজ বাড়িতে। বাদ জোহর নামাজে জানাযা শেষে দাদার কবরের পাশে দাফন করা হবে ছোট্ট মুক্তামনিকে।


মুক্তামনির মৃত্যুর খবরে পুরো কামারবায়সা গ্রামে শোকের ছায়া নেমে আসে। মুক্তামনিকে শেষবারের মতো দেখতে তাদের বাড়িতে আসছেন পড়শী ও আত্মীয়-স্বজনরা। প্রাণপ্রিয় মেয়ের মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না মুক্তামনির বাবা ইব্রাহিম হোসেন ও তার মা আসমা খাতুন। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আত্মীয়-স্বজনসহ প্রতিবেশীরা। তাদের আর্তনাদে কামারবায়সা গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।


মুক্তামণির মৃত্যুর সংবাদটি কিছুক্ষণ আগেই জেনেছি। চিকিৎসক জীবনে এ রকম সংবাদ খুব কমই শুনতে হয়েছে। জীবনে বহু রোগীর চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছি, আবার বহু রোগীর মৃত্যুও দেখেছি। কিন্তু মুক্তামণির মৃত্যু আমার জন্য হার্ট ব্রেকিং খবর। ছোট্ট এ শিশুটির ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্তলাল সেন।


আজ বুধবার সকালে মুক্তামণির মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এসব কথা বলেন তিনি।


তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরেই মুক্তামণির বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঢাকায় নিয়ে আসতে বলে আসছিলাম। গতকালও সাতক্ষীরার সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে দুজন চিকিৎসককে তাদের বাড়িতে পাঠাই। বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসকরা জানায়, মুক্তামণির শারিরিক অবস্থা খুবই খারাপ। হাতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মারাত্নক (হিমোগ্লোবিনের অভাব) রক্তশূন্যতায় ভুগছে।


তখন মুক্তামণির বাবাকে বলি, ঢাকায় না হউক অন্তত সাতক্ষীরা হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু তার বাবা রাজি হয়নি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘স্যার, অনেক তো চেষ্টা করেছেন। ভাগ্য খারাপ- ভাল হয় নাই। এখন মেয়েটা অনেক কষ্ট পাইতাছে। আর টানাহেঁচড়া করতে চাই না। আল্লাহর হাতে ছাইড়া দিছি। মরলে বাড়িতেই মরুক।’ আর আজ সকালেই তার মৃত্যু সংবাদ শুনতে হলো।


কয়েকদিন ধরেই মুক্তামনির শরীর ভালো যাচ্ছিল না। হাতের তীব্র জ্বালা-যন্ত্রণায় নির্জীব হয়ে পড়ছিল সে। টানা ছয় মাসের উন্নত চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া মুক্তামনির ক্ষতস্থানে ফের পচন ধরে। ডান হাতের ক্ষত স্থানের পচা জায়গা থেকে বেরিয়ে আসছিল ছোট-ছোট পোকাও।


গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুক্তামণিকে রিলিজ নিয়ে বাড়িতে নেয়া হয়। পরবর্তীতে বেশ কয়েকবার তাকে ঢাকায় আসতে বলা হলেও মুক্তামণি রাজি হয়নি। সম্প্রতি তার শারিরিক অবস্থার অবনতি হয়।


অবশেষে দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসা সেবার পর এক মাসের ছুটিতে বাড়িতে আসে মুক্তামণি। তবে পরবর্তীতে মুক্তামণি আর ঢাকায় যেতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। একইসঙ্গে মুক্তামণির অবস্থার পরিবর্তন না হওয়ায় ঢাকায় যেতে নিরুৎসাহী হয়ে পড়ে তার পরিবারও।


উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে ইব্রাহিম গাজি ও আসমা দম্পত্তির ঘরে দুটি যমজ সন্তান জম্মগ্রহণ করে। আদর করে নাম রাখা হয় হীরামণি ও মুক্তামণি। এছাড়া তাদের দু’বছরের আল-আমিন নামের একটি ছেলে রয়েছে। জন্মের দেড় বছর পর মুক্তামনির দেহে একটি ছোট মার্বেলের মতো গোটা দেখা দেয়। এরপর থেকে সেটি বাড়তে থাকে। তার ডান হাতের কবজি ফুলতে শুরু করে। এরপর সাতক্ষীরা ও খুলনার অনেক ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানো হয়।


দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়েও কোনো চিকিৎসা হয়নি। তার আক্রান্ত হাতটি গাছের গুঁড়ির আকার ধারণ করে প্রচণ্ড ভারি হয়ে ওঠে। এক সময় এতে পচন ধরে, পোকাও জন্মায়। দিন রাত চুলকানি ও যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে থাকত মুক্তামনি। বিকট দুর্গন্ধের কারণে আত্মীয়স্বজন ও পড়শিদের যাতায়াতও এক রকম বন্ধ হয়ে যায়।


বিবার্তা/শারমিন

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com