রাজধানীর ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে নৈরাজ্য
প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:৪৫
রাজধানীর ৮৭ শতাংশ বাস-মিনিবাসে নৈরাজ্য
ফাইল ছবি
বিবার্তা প্রতিবেদক
প্রিন্ট অ-অ+

রাজধানী ঢাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলের একমাত্র বাহন বাস-মিনিবাস। বাস আর বাসের চালক ও চলাচলের ব্যবস্থাপনা এগুলোর কোনোটিই ঠিক নেই। অপরিকল্পিতভাবে সড়কে বাস নামানোর অনুমতি দেয়া হচ্ছে কোনো রকম সমীক্ষা ছাড়াই। চালকেরা অদক্ষ, মাদকাসক্ত ও বেপরোয়া। আর বাস-মিনিবাসের বেশির ভাগই চলাচলের উপযোগিতাহীন (ফিটনেসবিহীন)।


এছাড়াও মাঝে মাঝেই হয়রানির শিকার হচ্ছে চলাচলরত নারীরা। আর সড়ক দুর্ঘটনা তো আছেই। জীবনের মূল্য যে কি তাই ভুলে যায় অনেকে।


বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে নগরে গণপরিবহনব্যবস্থায় চলছে চরম অসুস্থ প্রতিযোগিতা।


গতকাল শুক্রবার রাত ৯টার দিকে বনানীতে বিআরটিসির একটি বাসের ধাক্কায় পা হারাতে বসেছে রোজিনা আক্তার (১৭) নামে এক কিশোরী গৃহকর্মী। রোজিনাকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার ডান পায়ের অবস্থা গুরুতর।



শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ধানমন্ডি শেখ জামাল মাঠের সামনে দ্রুতগামী ট্রাকের ধাক্কায় এক রিকশাযাত্রী নিহত হয়েছেন। নিহতের নাম মাসুদা আক্তার (৩৫)। তিনি মগবাজারের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে নার্সের চাকরি করতেন।


গত ৩ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে সার্ক ফোয়ারার সামনে দুই বাসের চাপায় তিতুমীর কলেজের ছাত্র রাজীব হোসেনের (২২) হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ১৬ এপ্রিল সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।


এছাড়াও গত ১১ এপ্রিল বুধবার সকাল ৯টার দিকে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে নিউভিশন পরিবহনের একটি বাস সড়ক বিভাজক ঘেঁষে এগিয়ে আসে। বিভাজক ও বাসের মাঝে এক নারীর ডান পা চাপা খায়। এতে তার ডান পায়ের হাঁটু ও নিচের অংশ থেঁতলে যায়।


আর বর্তমানে এমনভাবে যানজট বেড়েছে যে ঢাকায় এখন যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটার। গত বছর বিশ্বব্যাংকের হিসেবে তা ছিল ঘণ্টায় সাত কিলোমিটার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কম গতির শহরে এত প্রাণহানির পেছনে দায়ী চালকের বেপরোয়া মনোভাব, সড়কে পাল্লাপাল্লি এবং পরিবহন চলাচলের অনুমোদন পদ্ধতির বড় রকমের গলদ।


বেপরোয়া চালক আর অসতর্ক পথচারীর যত্রতত্র পারাপার সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বাস মালিকরা অর্থবিত্তে বলীয়ান, রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতাপশালী হওয়ার কারণে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার মামলা হলেও সুষ্ঠবিচার পায় না ভুক্তভুগীরা। অনেকেই আবার মামলা করেন না।



অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় রুট এবং অসংখ্য মালিক থাকার কারণে বাসগুলো পাল্লাপাল্লিতে নামছে। যাত্রী তোলা ও বাস থামার ঠিক-ঠিকানা নেই। একই কোম্পানির ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির বাস থাকায় ওই কোম্পানির বাসগুলোও রাস্তায় কার আগে কে যাত্রী তুলবে, সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। অন্য গাড়ির পথ আটকে দেয়া বা লুকিং গ্লাস ভেঙে দেয়ার ঘটনা এখন সাধারণ বলে গণ্য করা হচ্ছে।


বেশির ভাগ বাসেরই রং-বাকল ঠিক নেই। নেই বাসে ভাড়ার তালিকাও। বাসের ভেতরে বসার সিটগুলো ছেঁড়া, নষ্ট ও নোংরা, আর বসার জায়গা তো একেবারেই ছোট।


আইন অনুযায়ী, মিনিবাসে ৩১ ও বড় বাসে ৫১ আসন থাকার কথা। কিন্তু বাড়তি আয়ের আশায় ৭ থেকে ১২টি আসন বাড়িয়ে নিচ্ছেন মালিক-শ্রমিকেরা। ৩ জনের জায়গায় বসানো হচ্ছে ৫ জনকে। বসতে কষ্ট হলেই যাত্রী উঠছে বাসে। চলছে এভাবেই নিয়ম না মেনে।


রাজধানীতে ৩৫৯টি রুটে বাস-মিনিবাস চলে সাড়ে ৭ হাজার। এর মধ্যে সাড়ে চার হাজার বাসের ফিটনেস সনদ হালনাগাদ আছে। এগুলোরও অধিকাংশই সনদ পাওয়ার অযোগ্য।


এ হিসেবে রাজধানীর রাজপথ দাপিয়ে বেড়ানো বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন। পুলিশ ও বিআরটিএ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করেই এসব বাস চলছে বলে জানিয়েছে চালকরা।



সব ধরণের যানবাহনের ফিটনেস সনদ দেয় বাংলাদেশ রোড টান্সপোর্ট অথরিটি বিআরটিএ। সংস্থাটির মিরপুর, দিয়াবাড়ি ও ইকুরিয়া সার্কেলে দিনে গড়ে অন্তত একশ বাস-মিনিবাসের ফিটনেস সনদ দেয়া হয়। মিরপুর বিআরটিএ অফিসে মাঝে মাঝেই দিনভর অপেক্ষা করেও ফিটনেস সনদ নিতে আসা কোন বাসের দেখা মেলে না। তাহলে কিভাবে ফিটনেস সনদ পাচ্ছে বাস মালিকরা। আর কিভাবেই লক্কর ঝক্কর বাস চলছে বাস্তায়।


চাঁদা ছাড়া চলে না বাসের চাকা। তাই ফিটনেস হালনাগাদের চেয়ে ম্যানেজ করে চালাতেই আগ্রহী মালিকরা।


২০০০ সাল থেকে রাজধানীতে নির্ধারিত রুটের জন্য বাস-মিনিবাসের পারমিট দিচ্ছে বিআরটিএ। এখন পর্যন্ত ৩৫৯টি রুটের বিপরীতে প্রায় ৫ হাজার ২৪৭টি বাস ও ২ হাজার ৩৫২টি মিনিবাসের পারমিট দেয়া হয়েছে। নিয়ম মানলে এর বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসই রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না।


সড়কে দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড


এদিকে সড়কে দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। রাজধানীর ৮৭ ভাগ বাস-মিনিবাস সড়কে নৈরাজ্য চালাচ্ছে বলে অভিযোগ সংগঠনটির।


শনিবার দুপুরে রাজধানীর প্রেসক্লাবে ‘সড়কে নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব তথ্য উঠে আসে।


আলোচনা সভায় বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ জন মানুষ নিহত হচ্ছেন।


বক্তারা বলেন, সড়কে অব্যবস্থাপনার পেছনে প্রধান কারণ মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম। রেল ও নৌপথে বিনিয়োগ না হওয়া এবং দাতাগোষ্ঠীর আগ্রহ কম হওয়ায় সড়কে চাপ বাড়ছে।


এছাড়া চালকদের কর্মঘণ্টার নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকা দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ বলে উল্লেখ করেন তারা।


বিবার্তা/শারমিন/জাকিয়া

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com