বর্ণিল ঘুড়িদের দখলে পুরান ঢাকার আকাশ
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:১৬
বর্ণিল ঘুড়িদের দখলে পুরান ঢাকার আকাশ
সৌখিন আদনান, জবি প্রতিনিধি
প্রিন্ট অ-অ+

পুরান ঢাকার প্রাণের উৎসব সাকরাইনের কারণে রবিবারের আকাশ বরাবরের মতো রয়েছে ঘুড়িদের দখলে। আকাশ জুড়ে নানান রং আর বাহারি ঘুড়িদের আধিপত্য।


এক সপ্তাহ ধরে পুরান ঢাকার বাহান্ন রাস্তা আর তেপ্পান্ন গলির অধিকাংশ গলিতে ও খোলা ছাদে চলছে সুতা মাঞ্জা দেয়ার ধুম। রোদে সুতা শুকানোর কাজও চলছে পুরোদমে। তাই শীতের উদাস দুপুর আর নরম বিকালে আকাশে গোত্তা খাচ্ছে নানান রঙের ঘুড়ি। ঘুড়িতে ঘুড়িতে হৃদ্যতামূলক কাটা-কাটি খেলাও চলছে। অহরহ কাটাকাটি খেলায় হেরে যাওয়া অভিমানী ঘুড়ি সুতার বাঁধন ছিড়ে ভাকাট্টা হয়ে যাচ্ছে দূরে।


পৌষ মাসের শেষ দিনে পালন করা হয় পৌষ সংক্রান্তি উৎসব বা আদি ঢাকাইয়াদের ঐতিহ্যের সাকরাইন উৎসব। ভোরবেলায় কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। ছোট বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত প্রতিটি ছাদ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়বে উৎসবের জৌলুস। আর শীতের বিকেলে ঘুড়ির কাটাকাটি খেলায় উত্তাপ ছড়াবে সাকরাইন উৎসব।


এক দশক আগেও ছাদে ছাদে থাকতো মাইকের আধিপত্য। আজ মাইকের স্থান দখল করেছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। উৎসবের আমেজ থাকবে পুরান ঢাকার সর্বত্র। এ দিন পুরান ঢাকার দয়াগঞ্জ, মুরগীটোলা, কাগজিটোলা, গেন্ডারিয়া, বাংলাবাজার, ধূপখোলা মাঠ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাঁখারী বাজার, সদরঘাট, কোটকাচারী এলাকার অধিবাসীরা দিনব্যাপি রঙ বেরঙের ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতায় মেতে থাকবেন। আকাশে উড়বে ঘুড়ি আর বাতাসে দোলা জাগাবে গান। মাঝে মাঝে ঘুড়ি কেটে গেলে পরাজিত ঘুড়ির উদ্দেশে ধ্বনিত হবে ভাকাট্টা লোট শব্দ যুগল।


সন্ধ্যায় আগুন নিয়ে খেলা আর আতশবাজি তো থাকবেই। আতশবাজির বর্ণিল আভায় আলোকিত পুরান ঢাকাকে দেখতে চাইলে আপনিও হাজির হতে পারেন সেখানকার কোনো বাড়ির ছাদে বা রেস্তোরাঁয়।


ইতিহাস থেকে জানা যায়, পৌষ মাসের শেষ দিন সাকরাইনে নতুন ধানের চালের পিঠাপুলি খেয়ে, ঘুড়ি উড়িয়ে আনন্দ উৎসব করার রেওয়াজ বহু পুরনো। ঢাকায় এই উৎসব হচ্ছে প্রায় ৪০০ বছর ধরে।



সাকরাইন উৎসবের দিন সারাদিন আকাশে ওড়ানো হয় নানান রঙের, নানান আকারের বিচিত্রদর্শন সব ঘুড়ি। দেখতে যেমন তাদের নামও তেমন বাহারি- গাহেল, চোখদ্বার, মালাদ্বার, পঙ্খীরাজ, চশমাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চাপালিশ, চানদ্বার, নাকপান্দার, ভোয়াদার, কাউঠাদার, চিলা, চাপরাস, মাখখি আরও কত কি!


এমনকি জাতীয় পতাকার রঙেও তৈরি করা হয় ঘুড়ি। তবে ঘুড়ির চেয়েও সুন্দর হয় এর লেজ। লেজ অনেক আকৃতির ও রঙ বেরঙের হয়ে থাকে। ঘুড়ির সঙ্গে সঙ্গে নাটাইগুলোর নামও বেশ মজাদার। বাটিওয়ালা, মুখবান্ধা, মুখছাড়া ইত্যাদি।


সাকরাইন উৎসব নিয়ে কথা বলতে চাইলে শাখারী বাজারের প্রবীণ ব্যক্তি অমীয় সুর বলেন, এই সাকরাইন উৎসব আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই করে আসছি। তখন তো এখনকার মতো আর গান বাজনা ছিল না। তবে ছিল অকৃত্রিম আনন্দ আর ভাকাট্টা লোডের আকাশ স্পর্শী শব্দ। এখন আমর নাতি নাতনিরা এ উৎসবে অংশগ্রহণ করে। আগামীতে তাদের উত্তর প্রজন্ম এটা পালন করবে। আরেকটা জিনিস বেশি করতাম যা এখন কমে গেছে। তা হালো আত্মীয় স্বজনকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো। যা এখন আছে কিন্তু অনেকটাই কমে গেছে। এখন সবাই ব্যস্ত।


সময়ের সাথে সাথে সাকরাইন উৎসবেও এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এক সময়ের চকলেট, শলতা আর পাটকার আধিপত্য ছাপিয়ে এখন আতশবাজির জয়জয়কার! মাইকের জায়গা দখল করে নিয়েছে ডিজে।



সাকরাইন পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসব হলেও এই উৎসবটি আর আগের মত জানান দিতে পারছে না নতুন প্রজন্ম বিশেষ করে তরুণদের মনে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ছোবলে বাংলার প্রাচীন অনেক উৎসবের মতোই সাকরাইনও হারাতে বসেছে তার মাধুর্য্য। গুটিয়ে আসছে পরিধি। তবে উৎসবের অনুষঙ্গে পরিবর্তন এলেও আমেজ আর আবেগটা এখনও রয়ে গেছে আগের মতোই।


বিবার্তা/আদনান/কাফী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com