সংরক্ষিত ঘড়িয়ালদের বংশবিস্তার হবে এবার
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ১৩:৫৫
সংরক্ষিত ঘড়িয়ালদের বংশবিস্তার হবে এবার
রাজশাহী ব্যুরো
প্রিন্ট অ-অ+

দেশের চিড়িয়াখানায় এখন সংরক্ষিত ঘড়িয়ালের সংখ্যা ১১টি। এর মধ্যে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় দুটি, রংপুর চিড়িয়াখানায় চারটি, ঢাকা চিড়িয়াখানায় চারটি এবং বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে আছে একটি। কিন্তু এতো দিন কোনো চিড়িয়াখানায় শুধু মাদি এবং কোনোটিতে ছিল শুধু পুরুষ ঘড়িয়াল। এ কারণে প্রজনন হচ্ছিল না বিশ্বব্যাপি মহাবিপন্ন এই প্রাণিটির।


কিন্তু এবার সেই পরিস্থিতি কাটছে। নারী-পুরুষ ঘড়িয়াল স্থানান্তরিত করার মাধ্যমে প্রাণিটির প্রজননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রাজশাহীর একটি মাদি ঘড়িয়ালকে পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। আর ঢাকা থেকে রাজশাহী আনা হয়েছে একটি পুরুষ ঘড়িয়াল। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী বছরের আগস্টের দিকেই প্রজনন হবে সংরক্ষিত এই ঘড়িয়ালের।


পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) ও বন বিভাগ সম্প্রতি ‘ঘড়িয়ালস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণা চালায়। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণাটিতে চিড়িয়াখানায় ঘড়িয়ালের সংখ্যা সম্পর্কে তথ্য উঠে এসেছে।


তাদের গবেষণায় বলা হয়, এই মুহূর্তে রংপুরে চারটি স্ত্রী ঘড়িয়াল, ঢাকায় চারটি পুরুষ, রাজশাহীতে দুটি স্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে একটি পুরুষ ঘড়িয়াল রয়েছে। কিন্তু পুরুষের সঙ্গে নারী কিংবা নারীর সঙ্গে পুরুষ না থাকায় তাদের প্রজনন হচ্ছে না। ঘড়িয়ালদের এই বিরহ কাটাতে চিড়িয়াখানা ও বন বিভাগের সহযোগিতায় আইইউসিএন আন্তঃচিড়িয়াখানা ঘড়িয়াল বিনিময়ের উদ্যোগ গ্রহণ করে।


সরকারের উদ্যোগে গ্রহণ করা ‘ঘড়িয়াল কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যানের’ অংশ হিসেবে গত শুক্রবার রাজশাহী চিড়িয়াখানা থেকে একটি নারী ঘড়িয়াল ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা চিড়িয়াখানায়। ঢাকায় সেটি পুরুষদের সঙ্গে রাখা হয়। এরপর সেখান থেকে ট্রাকে করে রাজশাহী আনা হয় একটি পুরুষ ঘড়িয়াল। রবিবার সকালে সেটি চিড়িয়াখানায় ঘড়িয়ালের পুকুরে ছাড়া হয়।


চিড়িয়াখানার ভেতরে ঘড়িয়াল বিনিময়ে প্রাণিগুলোর বিরহ কিছুটা হলেও কাটল। এখন রাজশাহী চিড়িয়াখানায় একটি মাদি ও একটি পুরুষ এবং ঢাকা চিড়িয়াখানায় তিনটি পুরুষ ও একটি মাদি হলো। তবে রংপুরে এখনও চারটিই স্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে থাকা পুরুষ ঘড়িয়ালটি নিঃসঙ্গই থাকল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পর্যায়ক্রমে বিনিময়ের মাধ্যমে এই ঘড়িয়ালগুলোকেও সঙ্গী দেয়া হবে।


রাজশাহী চিড়িয়াখানার কিউরেটর ফরহাদ উদ্দিন জানান, এতোদিন রাজশাহীতে থাকা দুটি মাদি ঘড়িয়ালই পদ্মা নদীতে ধরা পড়েছিল। প্রায় ২৮ থেকে ৩১ বছর হবে ঘড়িয়াল দুটির বয়স। বহুদিন আগে দুটি ঘড়িয়ালই পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়েছিল। এরপর তাদের রাজশাহীতেই রাখা হয়েছিল। পরে শুক্রবার একটি মাদি ঘড়িয়ালকে ঢাকায় পাঠানো হয়। আর ঢাকা থেকে আনা হয় একটি পুরুষ ঘড়িয়াল। এটির বয়স প্রায় ৩১ বছর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



তিনি আরও জানান, এতোদিন রাজশাহীর নারী ঘড়িয়ালটির কোনো নাম ছিল না। ঢাকা থেকে পুরুষ আনার পর তারা সেগুলোর নাম রেখেছেন। নারীটির নাম রাখা হয়েছে ‘পদ্মা’। আর পুরুষটির নাম দেয়া হয়েছে ‘গড়াই’। একসঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করার মাধ্যমে শনিবার সকাল থেকেই পদ্মা-গড়াইয়ের সংসার শুরু হয়েছে।


চিড়িয়াখানা কিউরেটর জানান, ঘড়িয়ালরা সাধারণত ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মিলিত হয়। মার্চ-এপ্রিলে তারা ডিম পাড়ে। এর ৭০ থেকে ৯০ দিনের মাথায় ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। সে হিসেবে পদ্মা আগামি বছরের আগস্টের দিকে বাচ্চার মা হবে বলে আশা করছেন তারা। ঢাকায় পাঠানো মাদি ঘড়িয়ালটিরও একই সময় প্রজননের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে দিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো সংরক্ষিত ঘড়িয়ালের প্রজনন শুরু হবে।


ঘড়িয়ালরা সাধারণত মাছ খায়। তাই এটি মেছো কুমির নামেও পরিচিত। জলচর এই সরীসৃপ প্রাণি অত্যন্ত লাজুক ও শান্ত প্রকৃতির। ঘড়িয়ালের দেহের দৈর্ঘ্য হয় সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৭ মিটার। এরা সাধারণ ৫০ থেকে ৫৫ বছর বাঁচে। এক সময় পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রে এবং সেগুলোর শাখা-প্রশাখায় প্রচুর ঘড়িয়াল দেখা যেত। কিন্ত দেশে প্রজননসক্ষম ঘড়িয়াল এখন বিলুপ্তির পথে।


সাম্প্রতিক গণনায় চিড়িয়াখানায় ১১টি ছাড়াও দেশের বড় নদীগুলোতে ৫৮টি ঘড়িয়াল দেখতে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পদ্মায় ৩৯টি, যমুনায় ১৭টি এবং ব্রহ্মপুত্র ও মহানন্দায় একটি করে ঘড়িয়াল দেখা গেছে। বাংলাদেশে ঘড়িয়াল মহাবিপন্ন বন্য প্রাণী, যা বন্য প্রাণী (সংরণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ দ্বারা সংর।


আইইউসিএন বাংলাদেশের ঘড়িয়াল সংরণ প্রধান কর্মকর্তা এবিএম সারোয়ার আলম বলেন, এতোদিন বাংলাদেশের চারটি চিড়িয়াখানায় সংরক্ষিত ঘড়িয়ালগুলোর কোনো জোড়া ছিল না। বিনিময়ের মাধ্যমে দুটি চিড়িয়াখানার সেই পরিস্থিতি বদলালো। এখন প্রাণিগুলোর প্রজননের পরিস্থিতি তৈরি হলো।


প্রজননের মাধ্যমে বিপন্ন প্রজাতির এই প্রাণীটির আবার প্রাকৃতিক আবাসে ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখছেন বিভাগীয় বন সংরক্ষক এবিএম রুহুল আমিন । তিনি বলেন, পদ্মা ও যমুনা নদীতে বনবিভাগ ঘড়িয়ালের বসবাস উপযোগী চারটি এলাকা চিহ্নিত করেছে। দেশে ঘড়িয়ালের বংশবৃদ্ধির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে চিড়িয়াখানাগুলোতে প্রাণীটি বিনিময় করা হচ্ছে। বেশি পরিমাণে বংশবিস্তার হলে ঘড়িয়ালকে তার বসবাস উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশে ছাড়া হবে।


বিবার্তা/রিমন/জিয়া


সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (২য় তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com