প্রধান বিচারপতির প্রতি ‘বাংলাদেশ আইন সমিতি’র উদাত্ত আহবান
প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২০, ১৪:২৬
প্রধান বিচারপতির প্রতি ‘বাংলাদেশ আইন সমিতি’র উদাত্ত আহবান
বিবার্তা ডেস্ক
প্রিন্ট অ-অ+

নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাব রোধে ব্যাপক জনসমাগম এড়ানোর লক্ষ্যে অধস্তন আদালতসমূহের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চলমান রেখে অবশিষ্ট সকল কার্যক্রম মুলতুবি করার জন্য বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতির প্রতি ‘উদাত্ত আহবান’ জানিয়েছে ‘বাংলাদেশ আইন সমিতি’।


মাননীয় প্রধান বিচারপতির প্রতি বাংলাদেশ আইন সমিতির উদাত্ত আহবানটি ‘বিবার্তা২৪ ডট নেট’ এর পাঠকদের জন্য হুবহু তুলো ধরা হলো


মাননীয় প্রধান বিচারপতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক বৈশ্বিক মহামারী হিসাবে স্বীকৃত নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণ এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসাবে আপনার সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলস্বরূপ গত ১৯ মার্চ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা (প্রশাসন শাখা) কর্তৃক প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিমূলে দেশের অধস্তন আদালতসমূহে আসামিদের জামিন শুনানিকালে এবং মামলার অন্যান্য কার্যক্রমে কারাবন্দি-আসামিদের আদালতে হাজির না করা এবং এরূপ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মামলার কার্যক্রম মুলতবি করার নির্দেশ প্রদানের জন্য বাংলাদেশ আইন সমিতির পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।


মাননীয় প্রধান বিচারপতি
আপনি নিশ্চিয়ই অবগত আছেন যে, গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে চীনের উহান প্রদেশে প্রাদুর্ভূত নভেল করোনাভাইরাসে সারা বিশ্বে এই পর্যন্ত ১৮২টি দেশের প্রায় আড়াই লাখ লোক আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে দশ হাজারের বেশি লোকের প্রাণহানি হয়েছে এবং প্রতিদিনই এই আক্রান্ত ও প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এমনই এক আতঙ্কজনক অবস্থায় গতকাল ২০ মার্চ জাতিসংঘ ঘোষিত এক সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে সারা বিশ্বে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হবে। এর আগে গত ১৭ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্ভাবনা আশঙ্কা করে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে এক কঠিন সর্তকবার্তায় বাংলাদেশ-সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানানো হয়েছে। উক্ত প্রতিবেদনে সামাজিকভাবে মানুষ থেকে দূরে থাকা তথা জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া নানা বিশেষজ্ঞ মহল থেকে সামনের দুই বা তিন সপ্তাহকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে সতর্কবার্তা প্রদান করা হচ্ছে।


মাননীয় প্রধান বিচারপতি
আপনি এও অবগত আছেন যে, জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এরূপ সতর্কবার্তা এবং বাংলাদেশে এ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ২০ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত-সহ এক জনের মৃত্যুর ঘটনার পর এই দেশে ব্যাপক হারে এই ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং জনমনে ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্যাপক জনসমাগম এড়ানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে সারাদেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে; সব ধরনের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং সকল বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ ঘোষণা করেছে। তাছাড়া মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা ‘লকডাউন’ ঘোষণা করা হয়েছে। পুরো মাদারীপুর ও ফরিদপুর জেলা-সহ প্রয়োজনে আরো এলাকা ‘লকডাউন’ করা হতে পারে মর্মে সরকারের পক্ষ থেকে আগাম ঘোষণা করা হয়েছে। কিছু কিছু জেলা থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এরূপে একের পর এক ঘোষণা বা কার্যক্রমের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে মূলত করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবরোধে বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম এড়ানোর প্রচেষ্টাই করা হচ্ছে।


মাননীয় প্রধান বিচারপতি
আপনার সময়োচিত পদক্ষেপের ফলে গত ১৯ মার্চ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ, ঢাকা (প্রশাসন শাখা) কর্তৃক প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিমূলে জারিকৃত নির্দেশও নিশ্চয়ই জনসমাগম এড়ানোর লক্ষ্যেই করা হয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু দেশের অধস্তন আদালতসমূহে প্রতিদিন যে সংখ্যক কারাবন্দি-আসামিদের কারগার থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হয় তা তুল্যবিচারে খুবই নগন্য। বরঞ্চ উক্ত আদালতসমূহে প্রতিদিন যে বিপুলসংখ্যক বিচারপ্রার্থী-জনগণ ও আইনজীবী-সহ সংশ্লিষ্টদের জনসমাগম হয় তার সংখ্যা কারাবন্দি-আসামিদের তুলনায় কয়েক’শ গুণ বেশি। আর ঢাকা ও চট্টগ্রামের অধস্তন আদালতসমূহে তো প্রতিদিন লক্ষাধিক লোকের জনসমাগম হয়, যা এই মুহূর্তে আদালতসংশ্লিষ্ট সকলের জন্যই বড়ো একটা উদ্বেগের বিষয়।


মাননীয় প্রধান বিচারপতি
এই নজিরবিহীন সংকটাপন্ন মুহুূর্তে কেবলমাত্র কিছুসংখ্যক কারাবন্দি-আসামিদের আদালতে উপস্থাপন না করার নির্দেশনা-ই অধস্তন আদালতসমূহে ব্যাপক জনসমাগম এড়ানোর একমাত্র মোক্ষম পদক্ষেপ হতে পারে না; বরঞ্চ অবিলম্বে আপাতত কমপক্ষে পরবর্তী দুই সপ্তাহের জন্য কেবলমাত্র ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমুহে জামিন ও রিমান্ড শুনানির মতো অপরিহার্য বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে অধস্তন আদালতসমূহের কার্যক্রম চলমান রেখে অবশিষ্ট সকল কার্যক্রম মুলতুবি করার পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই অধস্তন আদালতসমূহে ব্যাপক জনসমাগম এড়ানো যেতে পারে- যা করোনাভাইরাসের গোষ্ঠীগত সংক্রমণ রোধে এই মুহূর্তে বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে একটা জুতসই ও যথোপযুক্ত পদক্ষেপ হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।


মাননীয় প্রধান বিচারপতি
সমগ্র বিশ্ব-সহ বাংলাদেশের মানুষ আজ এক ভয়াবহ বৈশ্বিক মহামারীর সম্মুখীন। এমতাবস্থায় কোনোভাবেই এরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে বিন্দুমাত্রও বিলম্বের অবকাশ নেই। নচেৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যে গোষ্ঠী-সংক্রমণের মাধ্যমে এই ভাইরাসের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধের আর কোনো সুযোগ থাকবে না বাংলাদেশে; আর তাতে অনিবার্যরূপে আমরা ইতালি, স্পেন বা আমেরিকার চেয়েও ভয়ানক সংকটাপন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবো শীঘ্রই।


এমতাবস্থায় মাননীয় প্রধান বিচারপতি আমরা বাংলাদেশ আইন সমিতির পক্ষ থেকে এই মুহূর্তে কমপক্ষে পরবর্তী দুই সপ্তাহের জন্য কেবলমাত্র ম্যাজিস্ট্রেট আদালতসমূহে জামিন ও রিমান্ড শুনানির মতো অপরিহার্য বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে অধস্তন আদালতসমূহের কার্যক্রম চলমান রেখে অবশিষ্ট সকল কার্যক্রম মুলতুবি রাখার নির্দেশনা প্রদানের জন্য আপনাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ ও উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি।


বাংলাদেশ আইন সমিতির পক্ষে,


ব্যারিস্টার সাজ্জাদ হোসেন (সভাপতি), কেশব রায় চৌধুরী (সাধারণ সম্পাদক)


বিবার্তা/এনকে

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanews24@gmail.com ​, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com