ভুল হলে গবেষণা করে প্রমাণ করুন: আ ব ম ফারুক
প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯, ১১:৪২
ভুল হলে গবেষণা করে প্রমাণ করুন: আ ব ম ফারুক
মহিউদ্দিন রাসেল
প্রিন্ট অ-অ+

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ গবেষণা করা। একজন গবেষক হিসেবে আমি দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধের মান নিয়ে গবেষণা করি। আর এ গবেষেণায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পেয়ে উদ্বিগ্ন হই। পরে জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে দ্রুত গবেষণার ফলাফল জনগণের সামনে নিয়ে আসি, যা নিয়ে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এরপর এ গবেষণার ফলাফল নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন। এমনকি আমার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়। তাতেও আমি বিচলিত হয়নি। তবে এই প্রেক্ষাপটে আমার নেতৃত্বে গবেষক দল দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষা করে। যার ফলাফল ছিল আগের চেয়েও ভয়াবহ। এবারের ১০ নমুনার ১০টিতেই অ্যান্টিবায়োটিক পেয়েছি আমরা। জনস্বাস্থ্য ও জনকল্যাণই ছিল আমাদের গবেষণার মূল লক্ষ্য।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মোকাররম ভবনের নিজ দফতরে বিবার্তার সাথে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন দুধ নিয়ে গবেষণায় আলোচিত গবেষক ঢাবির বায়োমেডিকেল রিসার্স সেন্টারের সদ্যসাবেক পরিচালক ও ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ব ম ফারুক।


তিনি আলোচিত দুধ গবেষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন। তার দীর্ঘ আলাপের বিশেষ অংশটুকু বিবার্তার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।


বিবার্তা : আপনার গবেষণার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাই।


আ ব ম ফারুক : গবেষক হিসেবে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পণ্যের মান দিয়ে গবেষণা করি। এবার আমরা গবেষণা করেছি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পাস্তুরিত দুধের মান নিয়ে। দুধ নিয়ে গবেষণা করার কারণ হলো- দুধ মানবদেহের জন্য এমন একটি পুষ্টি উপাদান, যা শিশু, বৃদ্ধ, রোগীসহ সবার জন্য অত্যন্ত উপকারী। উপকারী এ জিনিসটিতে বিষ ঢুকেছে কিনা খতিয়ে দেখতে আমরা পরীক্ষা চালাই। পরীক্ষার ফলাফলে যা পেলাম তার জন্য আমরা মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। দুই দফার পরীক্ষার দুটিতে অ্যান্টিবায়োটিক শনাক্ত করা গেছে। অ্যান্টিবায়োটিকের মোট সংখ্যা ছিল চারটি। এগুলো হচ্ছে- অক্সিটেট্রাসাইক্লিন, এনরোফ্লক্সাসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং লেভোফ্লক্সাসিন। জনস্বাস্থ্য জড়িত বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কাজ করি। যখন কোনো পণ্যের অবস্থা জনস্বার্থের ক্ষেত্রে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন সেটাকে আমরা জনগণের সামনে নিয়ে আসি। দুধের ব্যাপারটিও সে পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। তাই আমরা দুধ গবেষণার ফলাফলকে জাতির সামনে নিয়ে আসি।


বিবার্তা : আপনারা দুধ গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির প্রমাণ পেয়েছেন। দুধে এ অ্যান্টিবায়োটিকের উৎপত্তি হয় কীভাবে?


আ ব ম ফারুক : গরুকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হোক বা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেয়া হোক- তা শরীরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিক গরুর শরীরে জীবাণু খুঁজে মারতে গিয়ে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ফলে গরু যে দুধনিঃসরণ করছে, সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক থেকে যাচ্ছে। আবার এ ধরনের গরু জবাই করার পর সেই মাংস খেলে ওই অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে ঢুকে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তাছাড়া গরুকে ঘাস, লতা-পাতার পাশাপাশি যে ফিড বা দানাদার খাবার খাওয়ানো হয়, এ ফিড তৈরি করে বিভিন্ন কোম্পানি। কোম্পানিগুলো এ ফিডের সাথে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিকও মিশিয়ে দেয়। যা গরুর শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।


বিবার্তা : খামারি ও ফার্ম মালিকদের অ্যান্টিবায়োটিকের দিকে ঝুঁকে পড়তে দেখা যায়। তারা কেন ঝুঁকে পড়ছেন?


আ ব ম ফারুক : ফিড বা দানাদার খাবার উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো খামারি ও ডেইরি ফার্মগুলোর মালিকদের প্রলুব্ধ করে, তাদের তৈরি করা ফিড খাওয়ালে গরু আর রোগাক্রান্ত হবে না। আর এ কথায় আশ্বস্ত হয়ে খামারিরাও মনে করেন তাহলে তো ভালোই। গরু অসুস্থ না হলে তাদের চিকিৎসার খরচ বেঁচে যাবে। কিন্তু এ ফিডের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক আছে। এ কারণে দুধের মধ্যেও অ্যান্টিবায়োটিক যাচ্ছে।


বিবার্তা : অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধ করার কি কোনো উপায় আছে?


আ ব ম ফারুক : তিনটি ধাপে এটা বন্ধ করা যায়। জনগণকে এটির ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। বিএসটিআইকে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে এবং কোম্পানিকে জনস্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিক বন্ধে সরকারের কাজটা হলো, সরকারকে সিম্পলি ঘোষণা করতে হবে, খবরদার এখন থেকে কোনো রেডিমেট ফিডে অ্যান্টিবায়োটিক মেশাবেন না। যদি মেশান, আর আমরা যদি ল্যাবে টেস্ট করে প্রমাণ পাই তাহলে ‍দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হবে। এ শাস্তিটা হতে পারে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ফাঁসিসহ দৃষ্টান্তমূলক। আর এমন শাস্তি দিলে তখন অন্যরা ভয়ে আর অ্যান্টিবায়োটিক মেশাবেন না।



বিবার্তা : কিছু ল্যাবরেটরি আছে, যারা অর্থের লোভে কোম্পানির কাছে বিক্রি হয়ে যায়। এটা বন্ধে আপনার পরামর্শ কী?


আ ব ম ফারুক : এটি বন্ধ করার জন্য যে ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে, তা প্রকাশ করা যাবে না। দুটি ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে এক ল্যাব যাতে জানতে না পারে, সেটা অন্য আরেকটি ল্যাবে একই পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। গোপনে কাজটি করতে হবে। সরকার এ কাজটি করুক, তাহলে দুধের মধ্যে আর অ্যান্টিবায়োটিক থাকবে না। এভাবে করলে তিন মাসের মধ্যে সব অ্যান্টিবায়োটিক দূর হয়ে যাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।


বিবার্তা : আপনার দুই দফা গবেষণায় দুধে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেল। অথচ বিএসটিআই তাদের গবেষণায় তা পেল না। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?


আ ব ম ফারুক : বিএসটিআইয়ের নাকি অ্যান্টিবায়োটিক টেস্ট করার ক্ষমতা নেই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষেরও তা নেই বলে শুনলাম। তাহলে তারা অ্যান্টিবায়োটিক পাবেন কীভাবে? আর নিজেরা গবেষণা না করে আমাদের পরীক্ষাকে ভুল বলেন কি করে? এক গবেষণাকে ভুল বলতে হলে আরেক গবেষণা দিয়ে বলতে হয়।


বিবার্তা : পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য আপনার গবেষণাকে মিথ্যা বলেছেন। এরপর মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিনও আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। এসব বক্তব্যের ব্যাপারে আপনার প্রক্রিয়া জানতে চাই।


আ ব ম ফারুক : পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী কোন গবেষণার ভিত্তিতে আমার গবেষণাকে মিথ্যা বললেন? এক গবেষণা নিয়ে কথা বলতে হলে তো আরেকটি গবেষণা করতে হয়। সেই গবেষণা কোথায়? আর অতিরিক্ত সচিব আমার গবেষণা ইন্টারন্যাশনাল পিআর রিভিউ জার্নালে প্রকাশ না হওয়ার কথা বলে আমাকে হুমকি দিয়েছেন। ভাগ্যিস তিনি আমার গবেষণাকে মঙ্গলগ্রহের জার্নালে প্রকাশ করতে বলেননি। একটি গবেষণা সম্পর্কে ভালোভাবে না জেনে আরেকটি গবেষণা না করে খাপছাড়া মন্তব্য করা ঠিক নয়। আমার গবেষণায় যদি ভুল থাকে গবেষণা করে প্রমাণ করুন। আমি আপনাদের ওয়েলকাম জানাব। আর আমি আরেকটি কথা বলতে চাই, আমি ব্যক্তি স্বার্থে নয়, জনস্বার্থে গবেষণাটি করেছি। হুমকি-ধমকি দিয়ে আমাকে দমানো যাবে না।


বিবার্তা : আপনার গবেষণা জার্নালে প্রকাশ না হওয়ার ব্যাপারে কী বলবেন?


আ ব ম ফারুক : আমাদের গবেষণা পিআর রিভিউ জার্নালে ছাপা হতে গেলে অনেক সময় লাগত। আমার গবেষণাটি যেহেতু জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট, সেহেতু আমি কীভাবে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করে বসে থাকি? জনগণের কল্যাণে এটা। তাই জনগণকে তাৎক্ষণিক জানানো দরকার বলে গবেষক হিসেবে আমার মনে হয়েছে। আমরা ভালোভাবেই জানি কোনটা পিআর রিভিউতে দেয়া দরকার আর কোনটা দরকার নয়।


বিবার্তা : আপনাকে হুমকি ও গবেষণাকে অবমাননা করায় সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠল। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়, গৌরব’৭১-সহ সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আপনার পক্ষ হয়ে বিবৃতি দিয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?


আ ব ম ফারুক : আমি সারা দেশের মানুষের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি জনস্বার্থে গবেষণা করেছি। আর দেশের মানুষও আমাকে গ্রহণ করে পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা শুধু আমার পাশে দাঁড়ায়নি। বরং দাঁড়িয়েছে একটি সময়োপযোগী গবেষণার পাশে, সত্যের পাশে। জনগণের এই ইতিবাচক সাড়া আমাকে আগামীর গবেষণাগুলো করতে প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।


বিবার্তা : দেশ যেখানে আপনাকে নিয়ে সরব, সেখানে আপনার নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এখনো নীরব। এ ব্যাপারে কি আপনার কোনো আক্ষেপ হচ্ছে না?


আ ব ম ফারুক : দেখুন এ ব্যাপারে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। তারা কেন এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য দেননি, তা আমি জানি না। তবে আমি আশা করেছিলাম।


বিবার্তা : ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান আপনাদের গবেষণার দায় বিভাগের নয়, নিজেদের ব্যক্তিগত- বলে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন। এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?



আ ব ম ফারুক : আমার সাবেক ছাত্ররা আমার বিরুদ্ধে স্ট্রেটমেন্ট দেয়, লেখে। মনে হচ্ছে যেন, আমার একটি কোম্পানি আছে। মনে হচ্ছে যেন, আমার খুব লাভ হচ্ছে। আমার ছাত্ররা এখন কলিগ হয়েছে, তারা স্ট্রেটমেন্ট দেয় আমার কোনো ফ্রল্টের জন্য নয়, কিছুই না। আমি নাকি সুনাম কুড়ানোর জন্য এগুলো করছি। এগুলো কপালের লিখন। কী বলার আছে।


বিবার্তা : দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি আপনার মেসেজ কী?


আ ব ম ফারুক : আমি ব্যক্তি কোনো ব্যাপার না। আমার গবেষক দল কোনো ভুল করেনি। আমরা আমাদের গবেষণাকে বারবার রিচেক করেছি। কোনো ভুল আছে কিনা। কিন্তু তাতে ভুল পাইনি। এরপর আমরা নিশ্চিত হয়ে কথাগুলো বলেছি। আমাদের এ গবেষণা গবেষক দলের জন্য নয়, এটা জনগণের জন্য। আমরা আটটি পণ্যের ওপর বক্তব্য রেখেছি। কিন্তু একটি নিয়ে বেশি কথা বলেছি। সেটা হলো দুধ। কারণ সেটা বেশি জরুরি। আমরা জনগণের কথাগুলো বলেছি। জনগণকেও সরব হওয়া দরকার। জনগণ সরব না হলে আমাদের কোম্পানিগুলো বাধ্য হবে না। আরেকটি বিষয় জনগণকে জানাতে চাই, এ ধরনের দুধ ঢকঢক করে খাওয়া উচিত নয়, জ্বাল দিয়ে সিদ্ধ করে খেতে হবে।


বিবার্তা : এ বিষয়ে দেশের কোম্পানিগুলোর প্রতিক্রিয়া কেমন?


আ ব ম ফারুক : যে কাজটি আমাদের গবেষক দল করেছে, সেটা যদি বিদেশে হতো তাহলে সেখানকার কোম্পানিগুলো আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলত, আপনারা ভালো কাজ করেছেন। আমাদের ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন। আর আমাদের দেশের কোম্পানিগুলো তাদের কারেকশান না করে বড় বড় বিজ্ঞাপন দিতে ব্যস্ত। যদি কোম্পানিগুলো আমাদের গবেষণা মেনে নিয়ে নিজেদের কারেকশন করত, তাহলে তো এত কিছু হতো না। আমরা তো কারো শত্রু নই। গবেষণায় আমাদের কিছু অবদান আছে। আমরা আকাশ থেকে পড়িনি। কোম্পানিগুলো যদি বছরব্যাপী বিজ্ঞাপন দিয়ে বলে, আমাদের গবেষক দল বিদেশিদের দালাল। তাতেও কোনো লাভ হবে না। কারণ আমরা কেমন তা জনগণই ভালো জানে।


বিবার্তা : জনস্বাস্থ্যে আপনার গবেষণা চলমান থাকবে কিনা?


আ ব ম ফারুক : মানুষকে সচেতন করা আমাদের দায়িত্ব এবং সেটা আমরা করব। জনস্বাস্থ্যে আমাদের গবেষণা চলমান থাকবে।


বিবার্তা/রাসেল/উজ্জ্বল/রবি

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

ময়মনসিংহ রোড, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com