‘নতুন উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে বিডি ভেঞ্চার’
প্রকাশ : ১২ জুন ২০১৮, ১৫:৩১
‘নতুন উদ্যোগকে এগিয়ে নিচ্ছে বিডি ভেঞ্চার’
উজ্জ্বল এ গমেজ
প্রিন্ট অ-অ+

ব্যাংকে জামানত দেয়ার মতো সম্পদ নেই - এমন উদ্যোক্তাদের শিক্ষা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও কর্মোদ্যম কাজে লাগাতে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় হচ্ছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল। উদ্যোক্তাদের জ্ঞান ও ব্যতিক্রমী ধারণাই এক্ষেত্রে ঋণের জামানত হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে কয়েক বছর ধরে এদেশেও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সম্প্রসারণে কাজ করছে বিডি ভেঞ্চার লিমিটেড।


দেশে ১১‍টি নিবন্ধনপ্রাপ্ত ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান থাকলেও একমাত্র বিডি ভেঞ্চারের কার্যক্রমই চোখে পড়ার মতো। ইতোমধ্যেই বিডি ভেঞ্চারের মূলধন সহায়তায় গড়ে উঠেছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে চিকিৎসা খাতে স্বাস্থ্য-বিষয়ক উদ্যোগ ডকটোরোলা ও ইন্টারেক্টিভ আর্টিফ্যাক্ট লিমিটেড, শিক্ষা খাতে এসো শিখি ডটকম, প্রযুক্তি খাতে ব্রেইন স্টেশন ২৩, হিমায়িত খাদ্য খাতে ইয়ন ফুডস এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সাসটেইনেবল পাওয়ার লিমিটেড।


সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে বিডি ভেঞ্চার লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে বিবার্তার মুখোমুখি হন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত হোসেন। একান্ত আলাপে জানান প্রতিষ্ঠানটির শুরু থেকে বর্তমান হালচাল এবং দেশের বিডি ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান সম্পর্কে। সাক্ষাৎকারটির বিশেষ কিছু অংশ বিবার্তার পাঠকদের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো।



বিবার্তা : বিডি ভেঞ্চার লিমিটেডের শুরুটা কীভাবে?


শওকত হোসেন : বিডি ভেঞ্চার লিমিটেড একটা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কম্পানি। ব্যক্তিমালিকানায় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে যাত্রা শুরু করে এটি। এর উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা। নতুন অভিনব পরিকল্পনাকে এগিয়ে নেয়া। নতুন করে কেউ যখন কাজ শুরু করে, তখন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থায়নে আগ্রহী হয় না। এ অবস্থাতেই এগিয়ে আসে ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান। অর্থায়ন করে ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ধারণ করে, প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ও লোকসানের ভাগীদার হয়। আবার প্রতিষ্ঠান ভালো পর্যায়ে পৌঁছে গেলে শেয়ার বিক্রি করে দেবে। সারা বিশ্বে এভাবেই নতুন উদ্যোগকে সহায়তা করে ভেঞ্চার প্রতিষ্ঠান। ঝুঁকিপূর্ণ ও উচ্চ প্রবৃদ্ধি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এমন খাতে বিনিয়োগ করতেই গড়ে ওঠে বিডি ভেঞ্চার। এর ৮০ শতাংশ শেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ও ২০ শতাংশ ব্যক্তিগত। গত পাঁচ বছরে ছয়টি প্রকল্পে মূলধন দিয়েছে বিডি ভেঞ্চার। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এসব প্রকল্প নতুন মাত্রা যোগ করতে পেরেছে; যা এত দিন মূলধনের অভাবে বিকশিত হয়নি।


বিবার্তা : আরো একটু বিস্তারিত করে বলুন।


শওকত হোসেন : আমাদের প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কাজ হলো- যারা ইনোভেটিভ কিছু করতে চায় এমন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সহায়তা দেয়া। এ সহায়তায় দেশে প্রচলিত যে পদ্ধতি রয়েছে সেটা হলো ঋণমাধ্যম। আমরা তাদের ঋণ দেই না, দেই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ইক্যুটি। এর মানে হলো একটা কম্পানিকে শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ইনভেস্ট করে তাদের অংশীদার হই। এর ফলে যেটা হয়, ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে সুদ জমতে থাকে এবং মাসিক ও ত্রৈমাসিক কিস্তি দিতে হয়, তখন এ চাপটা থাকে না। এ সুবিধাটা সাধারণত আমরা ৩-৫ বছর মেয়াদে দিয়ে থাকি। এ সময়টা তারা পায় প্রতিষ্ঠানটাকে একটা প্লাটফর্মে দাঁড় করানোর জন্য।



বিবার্তা : এ আর্থিক সুবিধা পাওয়ার পূর্বশর্তগুলো কী?


শওকত হোসেন : আমাদের প্রতিষ্ঠানের পলিসি অনুসারে নির্দিষ্ট কিছু সেক্টর ছাড়া আমরা অন্য কোথাও ইনভেস্ট করি না। যেমন- আইটি, আইটিএস, অ্যাভ্রোপ্রসের্সিং, রিনিউবেলএনার্জি, হেলথটেক, এডুকেশন এ ধরনের পাঁচ-ছয়টা সেক্টর আছে এগুলোর মধ্যে যদি কো্নো এন্টারপ্রাইজ হয় তাহলে সেখানে আমরা অর্থায়ন করি। আর যে প্রতিষ্ঠানই আসুক না কেন, আগে আমরা দেখি এটা ইনোভেটিভ উদ্যোগ কিনা। এটা ম্যানেজমেন্ট ইনোভেশন হতে পারে, টেকনোলজিক্যাল ইনোভেশন হতে পারে, এডুকেশন ইনোভেশন হতে পারে। আমরা একবারে প্রাথমিক লেভেলের প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করি না। উদ্যোগটা ভালো, মার্কেট ভ্যালু রয়েছে, কিছুটা সুনাম অর্জন করেছে, এর ভালো সম্ভাবনা রয়েছে - এমন সব প্রতিষ্ঠানকে আমরা অর্থায়ন করি।


বিবার্তা : কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সম্ভাবনা কেমন?


শওকত হোসেন : কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশ্বব্যাপী ভেঞ্চার ক্যাপিটালের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইসরায়েল, কানাডা, চীন ও ভারতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের জন্য উন্নত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০১৩ সালেই সারা বিশ্বে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বাজার ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারই ছিল ৩৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের। ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে ১১,৬৮৬টি কম্পানিকে মূলধন জোগান দেয়া হয়েছে। চীন ও ভারতে এ পন্থা দ্রুত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বাংলাদেশেও এসএমই ও পরিবেশবান্ধব ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আর আমাদের উদ্যোক্তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে তাদের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হয়। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং বেকারত্বের অভিশাপ থেকে শিক্ষিত তরুণরা মুক্তি পাবে।



বিবার্তা : ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা কেমন?


শওকত হোসেন : দেশে এখন পর্যন্ত ১১টি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিবন্ধিত কম্পানিগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো কার্যক্রম নেই। বাংলাদেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে মূলধন জোগানো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সফল মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল প্রতিষ্ঠান ‘বিকাশ’ ও অনলাইনের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘ডক্টোরোলা ডটকম’। এর মধ্যে ‘ডক্টোরোলা ডটকম’ বিডি ভেঞ্চার লিমিটেডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত এ দুটি প্রতিষ্ঠান সফলতার শিখরে পৌঁছেছে।


বিবার্তা : দেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রসারে সমন্বিত নীতিমালা কেন প্রয়োজন?


শওকত হোসেন : কয়েক বছর ধরেই নতুন উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে একটি আইনও সরকার অনুমোদন দিয়েছে। তবে সমন্বয়হীনতার কারণে নতুন উদ্যোগের বিকল্প অর্থায়নের এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রসারে সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োজন, যা আগামী দিনে মধ্য আয়ের বেকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে।


বিবার্তা : ভেঞ্চার ক্যাপিটাল মার্কেটের উন্নয়নে করণীয় কী?


শওকত হোসেন : ভেঞ্চার ক্যাপিটাল মার্কেটের উন্নয়নে কিছু বাধা রয়েছে। এসব বাধা অতিক্রম করতে হলে অনভিজ্ঞদের অভিজ্ঞ করে তুলতে হবে। তা না হলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হবে না। এ খাতের উচ্চ ঝুঁকির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। তবে এসডিজি অর্জনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বড় ভূমিকা রাখবে। কারণ নতুন উদ্যোক্তাদের জামানত দেয়ার ক্ষমতা নেই। কিন্তু আইটি এবং পর্যটন খাতে এসব উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে যাতে তাদের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হয়। এক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখতে পারবে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল। তবে কিছু ক্ষেত্রে এসব বাধা কমিয়ে আনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিডা এবং বিএসইসি কাজ করছে। একইসাথে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিলের সঙ্গে জড়িতদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।


বিবার্তা : নতুন উদ্যোগকে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড দেয়ার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জকে কীভাবে দেখছেন?


শওকত হোসেন : যে কোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকবেই। নতুন উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দেয়ার কাজটা তো আরো বেশি চ্যালেঞ্জের। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অনুসারে সব নিয়ম মেনে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর পোর্টফোলিও দেখে যাচাইবাছাই করে আর্থিক সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। প্রতিষ্ঠানটির বয়স পাঁচ বছর হলেও ব্যাংকগুলো থেকে নিয়মিত তহবিল পাচ্ছে না। ফলে সুযোগ থাকলেও চাহিদামতো বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না। দেশের উদ্যোক্তা উন্নয়নে ব্যাংকগুলোকে উদার মানসিকতার পরিচয় দিতে হবে। তাহলেই দেশের নতুন নতুন উদ্যোগ আলোর মুখ দেখবে। এছাড়াও আমাদের দেশে মানসম্মত অডিট রিপোর্ট পাওয়া যায় না, যা এ সেক্টরকে প্রভাবিত করতে পারে।


বিবার্তা/উজ্জ্বল/হুমায়ুন/মৌসুমী

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com