দর্শকের ভালোবাসাকেই বড় করে দেখেছি: ববিতা
প্রকাশ : ৩০ মার্চ ২০১৮, ২১:৫৬
দর্শকের ভালোবাসাকেই বড় করে দেখেছি: ববিতা
অভি মঈনুদ্দীন
প্রিন্ট অ-অ+

যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি এখনো, তবে জানা গেছে যে এবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নায়িকা ববিতা। একইসঙ্গে একই সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন চিত্রনায়ক ফারুকও। ববিতার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরী করেছেন অভি মঈনুদ্দীন।


বিবার্তা : চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আজীবন সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন, বিষয়টা অনেকটাই নিশ্চিত। আপনার অনুভূতি কী?


ববিতা : আমি সবসময়ই দর্শকের ভালোবাসাকে বড় করে দেখেছি। দর্শকের জন্যই আমি সারাটা জীবন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। যে কারণে সবসময়ই আমি ভালো ভালো গল্পের চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছি। আমার চলার পথে সহশিল্পী হিসেবে আমার বিপরীতে নায়ক রাজ রাজ্জাক, ফারুক, আলমগীর, সোহেলরানা, উজ্জ্বল, ওয়াসীমসহ আরো অনেককেই পেয়েছি। সেইসাথে এদেশের কিংবদন্তী নির্মাতাদের নির্দেশনায়ও কাজ করেছি।


আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রেও কাজ করার। আমি দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেপরিচিত করে তোলার জন্য নিবেদিত হয়ে কাজ করেছি। সবই চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা থেকে করেছি। সেই চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য যদি আজীবন সম্মাননা পাই তবে সেটা নিশ্চয়ই হবে অনেক ভালোলাগার, আনন্দের।


বিবার্তা :ক্যারিয়ারের শুরুতেই আপনি একের পর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে শুরু করেছিলেন। কেমন ছিলো সেই সময়ের অনুভূতি?


ববিতা : আসলে সেই সময় পরপর তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করা একজন শিল্পীর জন্য ছিল অনেক গৌরবের এবং সম্মানের। সেই সম্মান ধরে রাখার জন্যই অনুপ্রাণিত হয়ে আমি পরবর্তী ছবিগুলোতেও কাজ করেছি আন্তরিকতা দিয়ে। যে কারণেই আসলে আমি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে সবসময়ই আমি মনেকরি একজন ববিতাকে ববিতায় পরিণত করেছেন এদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকেরা। তাদের ভালোবাসা ছাড়া সেই ববিতা হয়তো আজকের ববিতাতে পরিণত হতে পারতেন না।


বিবার্তা :অশনি সংকেতই মূলত আপনাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিলো, জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো। শুনতে চাই অশনি সংকেত এর গল্প..


ববিতা : সত্যি বলতে কী সত্যজিৎ রায় প্রথমে আমার অভিনয়ই দেখেননি। তিনি ছবি তোলার জন্য ভারতীয় আলোকচিত্রী নিমাই ঘোষকে পাঠালেন। ঢাকায় এসে তিনি আমার প্রায় আড়াই’শ ছবি তুললেন। কিছুদিন পর ভারতীয় হাইকমিশন থেকে অশনি সংকেত ছবিতে অভিনয়ের জন্য প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি পাই। তাতে লেখা ছিলো আমি যেন দ্রুত সত্যজিৎ রায়ের সাথে যোগাযোগ করি।


কিন্তু চিঠিটি পড়ে আমি হাসতে হাসতে ছিড়ে ফেলে দিই। কারণ আমি মনে করেছি কেউ আমার সাথে দুষ্টুমি করছে। পরে আবার ভারতীয় হাইকমিশন থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হলো। সুচন্দা আপা আমাকে বিষয়টি নিয়ে উৎসাহ দিলেন। আমি বিশ্বাস করলাম।


একদিন সত্যজিৎ রায়ের বাড়িত গেলাম। সাথে ছিলেন সুচন্দা আপা। অনেক কথা হলো সেদিন তার সাথে। কথা শেষে আমাকে একটি স্ক্রিপ্ট হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্ক্রিপ্টগুলো পড় কাল ইন্দ্রপুর স্টুডিওতে আসবে। সেখানে তোমার অভিনয় টেস্ট হবে।'


রাত জেগে জেগে সংলাপ মুখস্থ করলাম। পরদিন উপস্থিত হলাম। সত্যজিৎ রায় আমাকে দেখে বললেন, ‘কাল তো মেকাপ ছিল, আজ মেকাপ ছাড়াই তোমাকে অনেক ভালো লাগছে।'


তিনি আমাকে সিঁথিতে সিঁদুর দিয়ে একটি শাড়ি পড়িয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি অভিনয়ের চেষ্টা করছি। এটা সত্যজিৎ লক্ষ্য করলেন, আর বললেন, ‘আরে কালকের মেয়েটার সাথে তো এই মেয়ের কোনই মিল নেই।’


এভাবেই আমি সত্যজিৎ রায়ের ‘অনঙ্গ বউ’ হিসেবে মনোনীত হলাম আমি।


বিবার্তা :এদেশের চলচ্চিত্রে এখনো মেয়েদের নায়িকা হয়ে কাজ করতে এলে পারিবারিকভাবে বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?


ববিতা : এটা সত্য যে এখন সময় বদলেছে। সবকিছুর সাথে আমি নিজেও কিন্তু তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না। তারপরও যুগের চাহিদার সাথে কিছুটা হলেও তাল মেলাতে হয়। আমাদের চলচ্চিত্রের সোনালী দিন ছিল, এটা সত্য। এখন নেই সেটাও সত্য।


এই কথাটা যদি কখনো মিথ্যে হয় তাহলে হয়তো একজন চলচ্চিত্রের মানুষ হিসেবে শুনতে আমার ভালো লাগতো। কারণ নিজের পরিবারের মানুষ খারাপ থাক এটা কেউই কখনো চায় না। আমিও চাই না।


তবে এটা সত্য যে, এখন চলচ্চিত্রে শিল্পীর বড়ই অভাব। আমাদের সময়েই তো নায়িকা হবার ক্ষেত্রে অনেক বড় বাধা ছিল। আমার দাদা দাদী ছিলেন ভীষণ রক্ষণশীল। সবার ধারণা ছিল অভিনয়ে গেছি, তার মানে আমার আর ভালো থাকা হলো না।


কিন্তু আমার মা সংস্কৃতিমনা ছিলেন বিধায়ই তিনি আমাদেরকে সংস্কৃতির অঙ্গনে পা রাখতে ব্যাপকভাবে উৎসাহ যুগিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রে সত্যিই এখন শিল্পীর অভাব, আর এই অভাব দূর করতে হলে সময়ের স্মার্ট শিক্ষিত সমাজের ছেলে মেয়েদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। তারাই হয়তো চলচ্চিত্রের হাওয়া বদলে সহযাগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।


বিবার্তা :তাহলে একজন ভালো শিল্পী হবার জন্য স্মার্ট শিক্ষিত হওয়া উচিৎ বলেই আপনি মনে করছেন?


ববিতা : না, শুধু এই দুটো বিশেষ বৈশিষ্ট্যই যে থাকবে তা নয়। একজন শিল্পী হচ্ছেন সমাজের মানুষের আদর্শ। তাকে অনেকেই ফলো করেন। তাই স্মার্ট শিক্ষিত হবার পাশাপাশি তাকে যেমন যথেষ্ট বিনয়ী হতে হবে ঠিক তেমনি হতে হবে সিনিয়র শিল্পীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।


এটা সত্য যে অন্যকে সম্মান দিলেই নিজে সম্মানিত হওয়া যায়। তবে অধ্যাবসায়টাও একজন শিল্পীর জন্য অনেক জরুরি। শুধু অর্থের পেছনে ছুটলেই হবে না। অনেক সময় অর্থকে উপেক্ষা করে ভালো ভালো কাজও করতে হয় যাতে দর্শক যুগ যুগ তাকে মনে রাখে।


বিবার্তা :শেষ প্রশ্নে জানতে চাই আপনার বাকি জীবনের পরিকল্পনার কথা..


ববিতা : নাহ, সেভাবে কোনো পরিকল্পনা নেই বাকিটা জীবন নিয়ে। যশ খ্যাতি সবই তো পেলাম। বেঁচে আছি, বেশ ভালো আছি, মহান আল্লাহর দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া। চলচ্চিত্রে অনেকদিন কাজ করছি, আজীবন কাজ করে যেতে চাই। কারণ আমি চলচ্চিত্রকে ভালোবাসি। ভালোবাসি চলচ্চিত্র পরিবারের সবাইকে, ভালোবাসি এদেশের মানুষকে।


তবে এখন সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করে যেতে চাই। একটা কথা না বললেই নয়, এখন আর বিশেষ কোনো দিনে কোনো পার্টি করতে ইচ্ছে হয় না। মনটা ভীষণ টানে দুস্থ অসহায়দের জন্য। তাই তাদের জন্য আমি ডিসিআইআই’র হয়ে একজন গুডউইল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছি গত প্রায় টানা দশ বছর।


বিবার্তা/অভি/কামরুল

সর্বশেষ খবর
সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : বাণী ইয়াসমিন হাসি

৪৬, কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ

কারওয়ান বাজার (৬ষ্ঠ তলা), ঢাকা-১২১৫

ফোন : ০২-৮১৪৪৯৬০, মোবা. ০১৯৭২১৫১১১৫

Email: bbartanational@gmail.com, info@bbarta24.net

© 2016 all rights reserved to www.bbarta24.net Developed By: Orangebd.com